“ওরা যা বলছে, তা ঠিকই আছে চম্পা।” এতোদিন আমি তোমার কাছেও আমার প্রকৃত পরিচয় গোপন করেছিলাম। আমি মুসলমান। আমার নাম আমীর বিন তাশকীন। এ কথা শোনার পরও কি তুমি আমার সাথে যাবে? ইসলাম গ্রহণ করে মুসলমান হয়ে যাবে?”
“আমি তোমাকে নিয়ে পালিয়ে যেতে এবং তোমার সাথেই মরতে এসেছি। ধর্ম আমার কাছে বড় বিবেচ্য বিষয় নয়। এখন তুমিই আমার সব। তুমি যা বিশ্বাস কর আমিও তাই করি। আর দেরী নয়, জলদি কর, আমাকে চাদরটা দাও।
তাশকীন একটি চাদর চম্পার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে কোমরে তরবারী ঝুলিয়ে দিল এবং তার বিশেষ খঞ্জরটিও কোমরে খুঁজে নিল। এরপর চম্পাকে নিয়ে আস্তাবলের দিকে অগ্রসর হলো।
এদিকে মহারাজা ক্ষুব্ধকণ্ঠে তার দ্বাররক্ষীদের নির্দেশ দিলেন, এক্ষুনি চম্পা ও তার একান্ত নিরাপত্তারক্ষী জগন্নাথকে হাজির করা হোক।
তাশকীন একটি অন্ধকার জায়গায় চম্পাকে দাঁড় করিয়ে রেখে যেখানে সামরিক ঘোড়া বাঁধা থাকে, সেদিকে অগ্রসর হলো। সেনাদের মধ্যে জগন্নাথরূপী তাশকীনের মর্যাদা এমন ছিল যে, তার নির্দেশ কোন প্রকার জিজ্ঞাসাবাদ ছাড়াই সবাই মানতে বাধ্য ছিল। এই অবস্থান সে অনেকটা নিজের আচরণ, বুদ্ধিমত্তা এবং পদবী দিয়ে তৈরী করে নিয়েছিল।
সে ঘোড়ার সহিসকে বললে খুব তাড়াতাড়ি তুমি ঘোড়াটিকে জীন বেধে দাও।
এদিকে রাজমহল তল্লাশি করে মহারাজাকে জানানো হলো, চম্পা রাণীকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কেউ বলতে পারছে না তিনি কোথায় আছেন।
মহারাজা নির্দেশ দিলেন, জগন্নাথ ও চম্পারাণীকে দ্রুত খুঁজে বের করো। ওরা যদি পালাতে চেষ্টা করে, তবে যেখানেই পাবে সেখানেই ওদের খতম করে দেবে।
মহারাজার নির্দেশ পেয়ে তার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা দশবারজন সৈনিক দৌড়াল । তখন রাত অন্ধকার হয়ে গেছে। একটি জ্বলন্ত মশাল থেকে তারা আরো তিন-চারটি মশাল জ্বালিয়ে নিল।
এদিকে তাশকীনের ঘোড়ায় তখন জীন বাঁধা হয়ে গেছে। সে দ্রুত ঘোড়াটিকে নিয়ে চম্পাকে যেখানে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল, ওখানে পৌঁছল। সে চম্পাকে তার পেছনে আরোহণ করিয়ে যেই পালানোর জন্য ঘোড়াকে ঘুরালো, তখন দেখতে পেল চার-পাঁচটি মশাল জ্বালিয়ে একদল অশ্বারোহী দৌড়ে এদিকে আসছে।
শহরের প্রধান গেট খোলা ছিল বটে; কিন্তু এ মুহূর্তে প্রধান গেট দিয়ে তাদের বেরিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিলো না। তাশকীন আবার ঘোড়া ঘুরিয়ে ছুটতে শুরু করলেই রাজার নিরাপত্তা রক্ষীরা তাকে হুমকি দিল।
দাঁড়িয়ে যাও, নয়তো এক্ষুনি তীর ছোঁড়া হবে। কিন্তু তাশকীন দাঁড়াবার পাত্র নয় । সে থামল না, ঘোড়া ছুটিয়ে দিল। একটু এগুতেই চম্পা আর্তচিৎকার দিয়ে উঠলো। চিৎকার দিয়ে চম্পা বললো, আমার পিঠে দুটি তীর বিদ্ধ হয়েছে। বলেই সে ঘোড়া থেকে গড়িয়ে পড়ে গেল।
আরো একটু এগুতেই তাশকীনের ঘোড়া হ্রেষাব করে উঠলো এবং তার গতি শ্লথ হয়ে গেল। তাশকীন বুঝতে পারল ঘোড়াও তীরবিদ্ধ হয়েছে। ঘোড়া যখন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলল তখন ছুটন্ত ঘোড়া থেকে লাফিয়ে পড়ল তাশকীন। তার দু’পাশ দিয়ে শোঁ শোঁ করে দুটি তীর ছুটে গেল। ভাগ্যগুণে তার মাথা অক্ষত রয়ে গেল।
এরপর একটি সংকীর্ণ গলিতে ঢুকে পড়ল তাশকীন এবং পশ্চাদ্ধাবনকারীদের আগেই গলির দু-তিনটি মোড় পেরিয়ে গেল। এ সময়ে চম্পার কথা তার ভাবার অবকাশ ছিল না। কারণ, বিষাক্ত তীরের আঘাতে তততক্ষণে বেচারী হয়তো মরে গেছে। চম্পার খুনের বদলা নেয়ারও তার পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না। কারণ, সে এসেছিল আরো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে, এজন্য নিজেকে রক্ষা করে যে করেই হোক গযনী পৌঁছাই ছিল তার প্রধান লক্ষ্য।
তাশকীন জানতো, শহরের সীমানা প্রাচীরের একটি অংশ একেবারে নদীর তীর ঘেঁষে রয়েছে। তখন বর্ষাকাল, এমনিতেই নদীতে পানি ছিল বেশী। তদুপরি পূর্বরাতের প্রবল বর্ষণে নদীর পানি সীমানা ছুঁই ছুঁই করছিল। তাশকীনকে পশ্চাদ্ধাবনকারীরা ধর ধর, গেল গেল, ওই দিকে, এ দিকে, ইত্যাকার চিৎকার ও চেঁচামেচি করে আসছিল।
তাশকীন ইতোমধ্যে একটি দালানের উপরে উঠে গেল, যে দালানের ছাদ সীমানা প্রাচীরের বরাবর যুক্ত ছিল। নীচে নিরাপত্তা রক্ষীদের হৈ চৈ শুনে সীমানা প্রাচীরের উপরে অবস্থানরত দুই প্রহরী তাশকীনের পথ আগলে দাঁড়াল। তাশকীন এক প্রহরীর কাছে গিয়ে তরবারী ওর পেটে ঢুকিয়ে দিলে অপর প্রহরী দৌড়ে পালাল।
এদিকে মশালধারী সৈন্যরা সীমানা প্রাচীরের কাছে চলে এলো। তাশকীন দেয়ালে উঠে নদীর দিকে অগ্রসর হলো এবং যেখানে দেয়াল একেবারে নদীর তীর ঘেঁষে সেখানে পৌঁছে, সে সীমানা প্রাচীরের উপর থেকে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। পশ্চাদ্বাবনকারীরা আর তার নাগাল পেল না।
মাধুরা থেকে গযনীর দূরত্ব প্রায় সাত মাইল। পথিমধ্যে অন্তত সাতটি বড় নদী রয়েছে। তাছাড়া বেশীর ভাগ পই ছিল পাহাড়ী। তৎকালীন ঐতিহাসিকদের মতে একজন সক্ষম মানুষের এ প পাড়ি দিতে অন্তত তিনমাস সময়ের প্রয়োজন ছিল।
***
সুলতান মাহমূদ গযনবী এর আগেই খাওয়ারিজমকে গযনী সালতানাতের অন্তর্ভুক্ত করে নেন। খাওয়ারিজমের অনুগত সৈন্যদেরকে তিনি গযনী সৈন্যদের অন্তর্ভুক্ত করেন। তাছাড়া খাওয়ারিজম যুদ্ধে লোকবলের ঘাটতি পূরণে তিনি সেনাবাহিনীতে ভর্তির বিষয়টিতে জোর দেন।
