ইউরোপীয় ঐতিহাসিক স্যার আর্লস্টেন লিখেছেন, “সুলতান মাহমূদ গযনী থেকে মাথুরা পর্যন্ত প্রাবনের মতো একটির পর একটি দুর্গ জয় করে এগিয়ে এলেন এবং শেষ পর্যন্ত কনৌজের মাথুরাকে ধ্বংসস্তুতে পরিণত করলেন।”
তৎকালীন ঐতিহাসিকদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, তার এই অবিস্মরণীয় সাফল্য ও বিজয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল তার গোয়েন্দা বাহিনীর। তিনি ভারতের রাজা মহারাজাদের সমর প্রস্তুতির পূর্ণ খবর জায়গায় বসেই পেয়ে যেতেন। যার ফলে তিনি বিদ্যুদ্বেগে অগ্রাভিযান চালাতেন এবং প্রতিপক্ষকে অপ্রস্তুত অবস্থায় এসে চেপে ধরতেন।
* * *
লাহোরের মহারাজা ভীমপাল এবং কালাঞ্জর (কোটলী কাশ্মীর) এর রাজা জানকি বাহ্মী সুলতান মাহমূদের বশ্যতা স্বীকার করে নিয়েছিল। তাদের মধ্যে চুক্তি হয়েছিল যে, ভীমপাল গযনীর বিরুদ্ধে কোন প্রকার সামরিক তৎপরতা চালাবে না। হিন্দুস্তানে গযনী সৈন্যদের যতো ধরনের সহযোগিতার প্রয়োজন হবে সেই সহযোগিতা দিতে বাধ্য থাকবে। কোটলী কাশ্মীরের রাজারও সুলতানের সাথে একই ধরনের চুক্তি হয়েছিল।
১০১৭ সালের বর্ষা মওসুমের পূজা উৎসবে হিন্দুস্তানের অন্যান্য রাজাদের মতো এই দুই রাজাও মাথুরার প্রধান মন্দিরে বসে গযনী বাহিনীকে পরাজিত করে গযনীকে ধ্বংস করার নীলনক্সা প্রণয়নে শামিল ছিল।
রাজা ভীমপাল সেই রাজাদের বৈঠকে পরিস্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি প্রকাশ্যে থাকবেন না, কিন্তু অন্তরালে সবধরনের সহযোগিতা করবেন। কারণ হিসেবে তিনি বলেন, তিনি ও তার খান্দান এ পর্যন্ত সুলতান মাহমুদের বিরুদ্ধে তিনবার লড়াই করেছে, আর কেউ তা করেনি।
এসব যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতির সবই তার নিজস্ব তহবিল থেকে নির্বাহ করতে হয়েছে। ফলে বাধ্য হয়েই তাকে সুলতান মাহমুদের সাথে অধীনতামূলক চুক্তি করতে হয়েছে।
এই মহাপরিকল্পনার শীর্ষ দায়িত্ব দেয়া হলো কনৌজের মহারাজার উপর। ঐতিহাসিকগণ লিখেছেন, এই মহাপরিকল্পনার দায়িত্ব পালনের সবচেয়ে উপযুক্ত ছিলেন কনৌজের মহারাজা রাজ্যপাল।
তিনি ছিলেন দক্ষ সমরবিশারদ। তার সামরিক শক্তিও ছিলো অন্যদের চেয়ে বেশী। উত্তর ভারতে কনৌজের মহারাজাকে সম্মানের চোখে দেখা হতো। বস্তুত তাই সম্মিলিত বাহিনীর কমান্ডারের দায়িত্ব অর্পণ করা হলো কনৌজের মহারাজার উপর।
মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে প্রত্যেক রাজা-মহারাজা তাদের অর্ধেক সৈন্য সম্মিলিত বাহিনীতে দেবে আর বাকী অর্ধেক সৈন্য নিজেদের হাতে বিভিন্ন দুর্গের সুরক্ষা এবং সুলতান মাহমুদের জবাবী আক্রমণ প্রতিহত করার কাজে নিয়োজিত থাকবে।
সম্মিলিত বাহিনী পেশোয়ারের দিকে অগ্রাভিযান চালাবে এবং সুলতান মাহমুদকে খায়বর দুর্গের পার্শবর্তী ময়দানে মুখোমুখি হতে বাধ্য করা হবে। এর আগে সৈন্যদের কিছু অংশ বিভিন্ন পাহাড়ী গিরিপথে নিয়োগ করা হবে। যাতে সুলতান মাহমুদের বাহিনীকে আগমন পথেই চোরাগুপ্তা আক্রমণ করে দুর্বল করে দেয়া হবে।
এই পরিকল্পনায় সবাই ঐক্যমত্য পোষণ করে। সব রাজা-মহারাজা কৃষ্ণ ও বাসুদেব মূর্তির সামনে দাঁড়িয়ে অঙ্গীকার করে পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রত্যেকেই নিজেদের জীবনও সম্পদ অকাতরে ব্যয় করবে।
আমীর বিন তাশকীন কনৌজের মহারাজার একান্ত নিরাপত্তা রক্ষী হিসেবে বৈঠকে হাজির ছিল। শুধু কনৌজের মহারাজা নয়, আরো কয়েকজন রাজা মহারাজার ব্যক্তিগত নিরাপত্তা রক্ষীও নির্বিকার মূর্তির মতো নিজ নিজ রাজাদের পেছনে দণ্ডায়মান ছিল।
মাথুরা থেকে প্রায় একশ মাইল দূরে পূর্ব-উত্তরে রামগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত বুলন্দশহর। তখন এটি ছিল একটি রাজ্যের রাজধানী। বল শহরের রাজা হরিদত্ত এই মহাবৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের এক পর্যায়ে রাজা হরিদত্ত বললেন, মুসলমানরা কেন প্রতিবারই সাফল্য পায়, প্রতিক্ষেত্রেই তাদেরই কেন জয় হয়।
আমাদেরকে ভাবতে হবে কোন জাদু বলে মুসলমানরা জয়লাভ করে, আর আমাদের মধ্যে কী ঘাটতি রয়েছে….। আজ আমি আপনাদেরকে তাদের একটি গুণ সম্পর্কে অবহিত করতে চাই। গযনীর গোয়েন্দাব্যবস্থা খুবই জোরদার। গোয়েন্দারাই গযনী বাহিনীর সবচেয়ে বড় শক্তি।
আমি আপনাদের একথাও বলে দিতে পারি, এখানেও গযনীর গোয়েন্দা রয়েছে এবং আমাদের সব কথাই সে শুনছে। গতরাতের ঝড়ে বেশ কিছু মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে, জানা গেছে, আজ একজন গযনী গোয়েন্দাকে তার সহকর্মীরাই হত্যা করেছে।
আমার এক সেনাকর্মকর্তা ঘটনাক্রমে এক গযনীর গোয়েন্দার আসল রূপ জানতে পেরেছিল। সেই গোয়েন্দা তার তিন সহকর্মীকে ধরিয়ে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করে এক খঞ্জরের আঘাতে সে মারা যায়। হত্যাকারীকে ধরা কারো পক্ষে সম্ভব হয়নি।
তা থেকেই আপনারা বুঝতে পারেন মুসলমানদের গোয়েন্দাব্যবস্থা এবং তাদের শক্তি কত। রাজা হরিদত্ত ঊষার বাবার কাছে শোনা কায়েসের ঘটনা সবিস্তারে ব্যক্ত করলেন এবং উষা ও কায়েসের মধ্যে ঘটে যাওয়া আকষ্মিক আকর্ষণ, উদ্ধার ও একজন অপরজনকে পাওয়ার জন্য ব্যাকুলতার কথাও সবিস্তারে বর্ণনা করলেন। অবশেষে রাজা হরিদত্ত বললেন, মৃত গোয়েন্দা এমন এক গযনী গোয়েন্দার কথা জানিয়েছে, যার নাম উল্লেখ করা এই মুহূর্তে সম্ভব নয়। কারণ, সেই গোয়েন্দা এমন মর্যাদায় অধিষ্ঠিত, যদি অভিযোগ সত্য না হয়, তাহলে আমাদের মধ্যে শত্রুতা, ভুল বোঝাবুঝি ও অনৈক্য সৃষ্টির আশঙ্কা রয়েছে।
