তখনও তিনি এভাবে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহর জিকির করতে করতে বলছিলেন-সমরকন্দের জমিন গোনাহগারদের বোঝা আর সহ্য করতে পারছে না। সব ভেঙে যাবে, ধুলোয় মিশে যাবে। কিন্তু তখন তার কথা কেউ বুঝতে পারেনি। দু’দিন পর বাবাজী শহর থেকে উধাও হয়ে গেলেন। তার উধাও হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে প্রচণ্ড ভূমিকম্পে গোটা সমরকন্দ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছিলো। শহরের সকল সরাইখানা ও পানশালা মাটির সাথে মিশে গিয়েছিল।”
দুজনের আরেকজন বললো, পনেরো বছর পর হঠাৎ আজ এখানে তাকে দেখা যাচ্ছে। এখন তিনি সেই দিনের মতোই জিকির ও ভবিষ্যদ্বাণী করছেন। আল্লাহ মালুম, তিনি যা বলছেন তা হবেই হবে। জানা নেই, কোন পাহাড় ভেঙে পড়ে কিংবা কোন জায়গায় আকাশ থেকে আগুন ঝরে। কিন্তু এটা ঠিক বিপর্যয় একটা ধেয়ে আসছে, বিপদ একটা না একটা ঘটবেই। এই দরবেশ বাবার কথা মিথ্যা হবার নয়।”
একথা শোনামাত্র উপস্থিত সৈন্যদের চেহারা ভয়ে-আতঙ্কে বিবর্ণ হয়ে গেল। তাদের একজন সাহস করে বললো, “এই দরবেশের কাছ থেকে কি জানার কোন উপায় নেই, বিপদ কোন দিক থেকে আসবে এবং কেন আসবে? এই বিপদ ঠেকানোর কোন পথ আছে কি না?”
আতঙ্কগ্রস্ত সৈন্যরা ভয়াবহ বিপদের কথা শুনে একে অন্যের দিকে তাকিয়ে পরস্পর অবস্থার ভয়াবহতা আরো ছড়িয়ে দিল এবং কোন বাক্য ব্যয় না করেই নিজ নিজ ব্যারাকে ফিরে এলো। কিছুক্ষণের মধ্যে বাতাসের সাথে এই খবর গোটা সেনা শিবিরে ছড়িয়ে পড়ল। এক দরবেশ পনেরো বছর আগের সমরকন্দের মতো ভয়াবহ বিপর্যয় ও ধ্বংসের ভবিষ্যদ্বাণী করে এলাকায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। মুখে মুখে এই দুর্যোগের খবর আরো ভয়ঙ্কর ও ভীতিপ্রদ হয়ে গোটা শিবিরে ছড়িয়ে পড়লো । শিবির জুড়ে এই ফকিরের ভবিষদ্বাণীই হয়ে উঠলো আলোচনার একমাত্র বিষয়। প্রত্যেকের মুখেই একই কথা, এই ফকীরের কাছ থেকে এই বিপদ থেকে মুক্তির বিষয়টি কিভাবে জানা যায়? কেন, কোনদিক থেকে আসবে এই বিপদ?
পরদিন সেনা শিবিরে এ খবর ছড়িয়ে পড়লো, গতকালের ভবিষ্যদ্বাণী করা দরবেশকে আজকে সমুদ্রতীরের একটি জায়গায় তাঁবু খাঁটিয়ে অবস্থান করতে দেখা গেছে। খবর শোনামাত্র কয়েকজন উৎসাহী সৈনিক সমুদ্র তীরের দিকে রওনা হলো। সৈন্যরা সাগর তীরে গিয়ে দেখতে পেলো, সেখানে একটি ছোট্ট তাঁবু খাটানো রয়েছে। তাঁবুর পাশেই তিন-চারজন লোক বসে আছে। সৈন্যরা সেখানে গিয়ে শুনতে পেল, তাঁবুর ভেতর থেকে ভেসে আসছে দরবেশের ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ জিকিরের আওয়াজ।
সেই সাথে তারা শুনতে পেলো, রক্তের বন্যা… থামিয়ে দাও, থামিয়ে দাও।
তাঁবুর বাইরে বসে থাকা লোকেরা সৈন্যদের জানালো, তারা সারা রাত এখানেই কাটিয়েছে। দরবেশ রাতভর বিরতিহীনভাবে এই জিকির চালিয়েছেন এবং মাঝে মধ্যেই তার লাঠি সাগরের পানিতে ডুবিয়ে এখানকার পানির গভীরতা পরিমাপ করেছেন।
তারা আরো জানালো, দরবেশের পা ধরে তারা মিনতি করে জানতে চাচ্ছিলো আসলে বিপদ কি ধরনের হতে পারে। তাদের অনুরোধে দরবেশ তাদের আসমানের প্রতি তাকাতে বললেন। তারা দিব্যচোখে দেখেছে, আসমানের তিনটি তারা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গোটা আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং তারার টুকরোগুলো দূর-দূরান্তে গিয়ে মাটিতে আঁছড়ে পড়েছে। এরপর দরবেশ আসমানের দিকে তাকিয়ে বললেন, এখনো সময় আছে, ফিরে এসো, আসমানের এই গজবকে থামিয়ে দাও।
তারা সৈন্যদের আরো জানালো, আমরা দরবেশ বাবার সেবা করার জন্য এখানে এসেছি। কিন্তু তিনি আমাদের দিকে তাকিয়েও দেখছেন না। সৈন্যরা তাঁবুর বাইরে দাঁড়িয়ে দরবেশের তীব্র চিৎকারের জিকির শুনছিলো এবং তাঁবুর বাইরে অপেক্ষমাণ লোকদের মুখে দরবেশ সম্পর্কে নানা তথ্য অবহিত হচ্ছিল। বাইরে অপেক্ষমাণ লোকদের বক্তব্যও দরবেশের তীব্র জিকির শুনে সৈন্যরা দরবেশকে আল্লাহর জীবন্ত পয়গামবাহী দূত ভাবতে শুরু করল।
এই সৈন্যরা ব্যারাকে ফিরে গিয়ে গতকালের অনেকের দেখা দরবেশকে আরো রহস্য পুরুষে পরিণত করল।
পরদিন ব্যারাকের আরো সৈন্য আর শহরের বহু লোক দরবেশকে দেখার জন্য সমুদ্র তীরবর্তী তাঁবুর পাশে জমায়েত হলো। দেখতে দেখতে তাঁবুর জায়গাটি সৈনিক এবং শহরের লোকদের জন্য তীর্থস্থানে পরিণত হলো।
লোকজন সমুদ্রতীরে গিয়ে তাঁবুর বাইরে দাঁড়াতো। তাঁবুর ভেতরে দরবেশের উচ্চ আওয়াজে জিকির শুনতে পেতো, সেই সাথে দরবেশ তিলাওয়াত করতো কেয়ামত দিবস সম্পর্কীয় আয়াতসমূহ। থেকে থেকে দরবেশ বলছিল, “রক্তের প্লাবন ধেয়ে আসছে, মানুষ মানুষকে হত্যা করবে।… দেশের বাদশা নারীর গোলামে পরিণত হবে।”
***
সুলতান মাহমুদের দুই গোয়েন্দা কর্মকর্তা বিয়ে অনুষ্ঠান থেকে ফিরে এসে সুলতানকে জানালো, তারা বিয়ে অনুষ্ঠানে বুখারার গভর্নর আলাফতোগীন, সেনাপতি আবু ইসহাক ও সেনাপতি খমরতাশ এর কথাবার্তা শুনেছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা সুলতানকে জানালো, আবুল আব্বাসকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য এ তিন ক্ষমতাধর ব্যক্তি চক্রান্ত করছে। অচিরেই তারা একটা কিছু ঘটাবে।”
সুলতান তাদের কথা শুনে পরামর্শ দিলেন, তোমরা আবুল আব্বাসের রাজমহল জুরজানিয়া এবং বুখারায় তোমাদের কয়েকজন গোয়েন্দাকে নিয়োগ করো, যাতে তারা ওদের চক্রান্তের খবর সময়মতো আমাদের অবহিত করতে পারে।”
