লড়াই মানে সারা গায়ে উঠে পড়েছিল, এই তো?… বলেছিলেন হলরয়েড।
কামড়ে পাগল করে দিয়েছিল। চেঁচাতে চেঁচাতে ছুটে গিয়ে নদীর জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে পিঁপড়েদের ডুবিয়ে মেরেছিল। নিজেও কিন্তু মারা গিয়েছিল সেই রাতেই–ঠিক যেন সাপের কামড়ে বিষ ছড়িয়ে পড়েছিল রক্তের মধ্যে?
বলেন কী! পিঁপড়ে বিষ ঢালতে পারে?
ঈশ্বর জানেন। হয়তো খুব বেশি কামড়েছিল। তবে কী জানেন, লড়াই বিদ্যেটা শিখেছি মানুষ মারার জন্যে, পিঁপড়ে মারার জন্যে নয়।
এরপর থেকে প্রায় পিঁপড়ে-পুরাণ নিয়ে আলোচনা হত দুজনের মধ্যে। স্থানীয় বাসিন্দারা নাকি এই বিশেষ পিঁপড়েদের নাম দিয়েছে সৌবা। বিশাল এই অরণ্যকে পদানত করতে চলেছে সৌবারা!
পিঁপড়েদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা ছেড়ে দিয়েছেন ক্যাপটেন গেরিলো। পিঁপড়ে জাতটা সম্বন্ধে বিলক্ষণ ওয়াকিবহাল তিনি। যে পিঁপড়েরা শুধু গাছের পাতা কাটে, তাদের খবর জেনেই এতদিন অনেক বড়াই করেছেন। কর্মীরা আকারে ছোট, পিলপিল করে ছড়িয়ে পড়ে, প্রাণ দিয়ে লড়ে যায়। বড় সাইজের কর্মীরা হুকুম দেয়, শাসন করে, তবে এই শেষোক্ত পিঁপড়েরা যদি চড়াও হয় কারও ওপর, তাহলে গুটিগুটি সটান উঠে যায় ঘাড়ে আর কোথাও নয়–কামড়ে রক্ত টেনে নেয়। পাতা কেটে শেওলার বিছানা বানিয়ে নেয় এই শ্রেণির পিঁপড়েরা। কয়েকশো গজ পর্যন্ত লম্বা হতে দেখা গেছে এদের বাসাবাড়ি।
পিঁপড়েদের চোখ আছে কি না, এই নিয়ে পুরো দুটো দিন দারুণ কথা কাটাকাটি হয়ে গেল দুজনের মধ্যে। দ্বিতীয় দিনে হাতাহাতি হওয়ার উপক্রম হতে হলরয়েড তীরে নেমে গিয়ে বেশ কিছু পিঁপড়ে পাকড়াও করে এনে দেখালেন, কিছু পিঁপড়ের চোখ আছে, কারও কারও নেই।
তারপরেই ঝগড়া লাগল নতুন বিষয় নিয়ে। পিঁপড়েরা কামড়ায়, না হুল ফোঁটায়?
গোরু-মোষ চরানোর একটা বিস্তীর্ণ জমিতে নেমে এ বিষয়ে কৌতূহলোদ্দীপক তথ্য সংগ্রহ করে এনেছিলেন গেরিলো।
বললেন, বিশেষ এই পিঁপড়েদের নাকি ড্যাবডেবে চোখ আছে। অন্য পিঁপড়েদের মতো অন্ধ নয়–সেইভাবে চলাফেরাও করে না। আড়ালে-আবডালে ড্যাবডেবে চোখ মেলে ওৎ পেতে বসে থাকে।
হুল ফোঁটায় নিশ্চয়?
হ্যাঁ, ফোঁটায়। বিষ আছে ওই হুলেই।
অন্য পিঁপড়েদের মতো চড়াও হওয়ার পর চলে যায় না–ঘাঁটি আগলে থেকে যায়।
তা ঠিক।
তামান্দু পেরিয়ে আসার পর প্রায় আশি মাইল পর্যন্ত তীরভূমিতে মানুষের বসতি একেবারেই নেই। তারপরেই নদী আর ততটা চওড়া নয়, দুপাশের জঙ্গল ক্রমশ কাছে এগিয়ে এসেছে। সেই রাতে একটা ঝুপসি গাছের গাঢ় ছায়ায় নোঙর ফেলল বেঞ্জামিন কনস্ট্যান্ট। অনেকদিন পরে শীতল বাতাসে শরীর জুড়িয়ে গেল প্রত্যেকেরই। পরমানন্দে ডেকে বসে চুরুট খেয়ে গেলেন গেরিলো আর হলরয়েড।
গেরিলোর মাথার মধ্যে কিন্তু ঘুরছে আজব এই পিঁপড়েদের কথা। আতঙ্ক ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে, শেষ পর্যন্ত বেটাচ্ছেলেরা কী করে বসবে, তা-ও তো আঁচ করা যাচ্ছে না। ভাবতে ভাবতে হাল ছেড়ে দিয়ে মাদর পেতে ঘুমিয়ে পড়লেন ডেকের ওপরেই।
মশার কামড়ে ফুলে-ওঠা কবজি রগড়াতে রগড়াতে বসে রইলেন হলরয়েড। তাঁর মাথাতেও হাজারো চিন্তার জট। বনের বিশালতা এই কদিনেই আচ্ছন্ন করে ফেলেছে তাঁকে। নির্নিমেষে চেয়ে রইলেন রহস্যময় জঙ্গলের দিকে। মাঝে মাঝে জোনাকির আলোয় আলোকিত নিবিড় তমিস্রার মধ্যে শোনা যাচ্ছে যেন ভিনগ্রহীদের গুঞ্জন রহস্যনিবিড় তৎপরতায় চঞ্চল যেন অন্ধকারের দেশ!
বনভূমির এই অমানবিক বিশালতায় তিনি যুগপৎ বিস্মিত এবং বিমর্ষ। হলরয়েড জানেন, আকাশে মানুষ নেই, অবিশ্বাস্য প্রকাণ্ড মহাশূন্যে ধূলিকণার মতো ছড়িয়ে রয়েছে অগণিত নক্ষত্র; তিনি জানেন, মহাসমুদ্রের বিশালতায় মানুষ বিমূঢ় এবং পরাভূত। সমুদ্র শাসন করতে না পারলেও স্থলভূমিকে কবজায় এনেছে ভালোভাবেই। শুধু ইংল্যান্ড কেন, পৃথিবীর যেখানে যত ডাঙা আছে, মানুষের বিজয়কেতন উড়ছে সর্বত্র। এই বিশ্বাস ছিল ইংল্যান্ড ছেড়ে আসার আগে।
কিন্তু রহস্য থমথমে এই বনানী তাঁর ভুল ভাঙিয়ে দিয়েছে। এখানে মানুষ পরাজয় স্বীকার করেছে। এখানে তার বিজয়কেতন ওড়েনি। এখানকার মাইলের পর মাইল বিস্তীর্ণ বনভূমিতে বীরদর্পে বিচরণ করে বেড়াচ্ছে পোকামাকড়, কচ্ছপ, কুমির, পক্ষী, বিশাল মহীরুহ আর অজগরসম লতার জটাজালের মধ্যে–নেই শুধু মানুষ। দু-একজন চেষ্টা চালিয়ে হার মেনেছে। সাপ, পোকা, পশু আর জ্বরের খপ্পরে প্রাণ দিয়েছে। তাই মাঝে মাঝে গভীর জঙ্গলে দেখা গেছে পরিত্যক্ত গ্রাম, ভেঙেপড়া সাদা দেওয়াল, মিনারের ভগ্নস্তূপ। পুমা আর জাগুয়ারই এই মহাবনের প্রভু–মানুষ নয়।
কিন্তু প্রকৃত প্রভু কে?
পৃথিবীতে যত সংখ্যক মানুষ আছে, তার চাইতেও বেশি সংখ্যক পিঁপড়ে আছে এই জঙ্গলের মাত্র কয়েক মাইলের মধ্যে! চিন্তাটা মাথার মধ্যে আসতেই অন্য চিন্তায় পেয়ে বসে হলরয়েডকে। বর্বর মানুষ কয়েক হাজার বছরের চেষ্টায় সভ্য হয়েছে। পিঁপড়েদের ক্ষেত্রেও যে এই ধরনের ক্রমবিবর্তন আসবে না, তা কি কেউ গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারে? হাজার হাজার দলবদ্ধ পিঁপড়ে বৃহত্তর বহির্জগৎ নিয়ে এতাবস্কাল মাথা ঘামায়নি ঠিকই। কিন্তু মাথা ঘামানোর মতো বুদ্ধিমত্তা তাদের আছে, আছে নিজস্ব ভাষা! বর্বর মানুষ আদিম অবস্থা কাটিয়ে উঠতে পারে, পিঁপড়েরাই বা তা পারবে না কেন? মানুষ যেমন পুঁথি আর নথির মধ্যে জ্ঞান সংগ্রহ করে বানিয়েছে হাতিয়ার, গড়েছে বিশাল সাম্রাজ্য, ঘটিয়েছে পরিকল্পনামাফিক সংগঠিত যুদ্ধ–পিঁপড়েরাই বা তা পারবে না কেন?
