সিসের ওজন আস্তে আস্তে গোলক টেনে নামিয়েছিল কাদার ওপর। চারপাশে ঘন সাদা কুয়াশা। কয়েক গজের বেশি এগচ্ছে না বিদ্যুৎ বাতির আলো। বেশ কয়েক মিনিট পর থিতিয়ে গিয়েছিল ঘুলিয়ে-যাওয়া তলানি। বিদ্যুৎ বাতির আর দূরের স্বচ্ছ প্রভাময় মাছের ঝাঁকের আলোয় দেখা গিয়েছিল ধূসর-সাদাটে তলানির ওপর দুলে দুলে সরে যাচ্ছে ঘন কালো সীমাহীন জলরাশি। মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে সামুদ্রিক লিলি ফুলের জটলা। ক্ষুধিত শুড় নাড়ছে শূন্যে।
দূরে দেখা যাচ্ছে দানবিক স্পঞ্জের জটলা। অর্ধস্বচ্ছ বহিঃরেখাই কেবল চোখে পড়ছে। মেঝেময় ছড়িয়ে গাঢ় বেগুনি আর কালো রঙের গুচ্ছ গুচ্ছ চকচকে চ্যাটালো বিস্তর বস্তু। নিশ্চয় কাঁটাওয়ালা সামুদ্রিক প্রাণী। এ ছাড়াও দেখা যাচ্ছে ছোট ছোট বিশালচক্ষু অথবা চক্ষুহীন অদ্ভুত আকারের জিনিস। কাউকে দেখতে কেঠোপোকার মতো, কাউকে গলদাচিংড়ির মতো। আলোকরশ্মির সামনে দিয়ে চলেছে মন্থরগতিতে–অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে অন্ধকারে–পেছনে রেখে যাচ্ছে ফুটকি ফুটকি রেখা।
আচমকা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছিল খুদে মাছের ঝাঁক–গোলকের দিকে ধেয়ে এসেছিল হরবোলা পাখির ঝাঁকের মতো। প্রভাময় তুষারের মতো উড়ে গিয়েছিল গোলকের ওপর দিয়ে। পলাতকদের পেছনে দেখা গিয়েছিল আরও বড় প্রাণী। সংখ্যায় অনেক। আসছে গোলকের দিকেই।
প্রথমে দেখা গিয়েছিল অস্পষ্ট দেহরেখা। চলমান আকৃতি। ঠিক যেন মানুষের মূর্তি। তারপরেই আলোকরশ্মির আওতায় এসে গিয়েছিল চলমান বিস্ময়রা। হতভম্ব হয়ে চোখ বুজে ফেলেছিল এলসটিড। পরক্ষণেই চোখ খুলে চেয়েছিল ফ্যালফ্যাল করে। মেরুদণ্ডী প্রাণী নিঃসন্দেহে। অতিশয় বিদঘুটে। গাঢ় বেগুনি রঙের মাথার সঙ্গে বহুরূপী গিরগিটির মাথার কোথায় যেন একটা সাদৃশ্য আছে। কিন্তু অত উঁচু কপাল আর বিরাট করোটি আজ পর্যন্ত কোনও সরীসৃপের ক্ষেত্রে দেখা যায়নি। মুখের খাড়াই দিকটার সঙ্গে অস্বাভাবিক মিল রয়েছে মানুষের মুখের।
বহুরূপী গিরগিটির চোখের মতোই দুটো বিরাট চোখ ঠেলে বেরিয়ে এসেছে কোটর থেকে। রয়েছে ডাঁটির ডগায়। মুখবিবর সরীসৃপ-মুখবিবরের মতো চওড়া। ছোট্ট নাসিকাগহ্বরের নিচে আঁশযুক্ত ঠোঁট। কানের জায়গায় দুটো বিরাট কানকো-ঢাকনি। ঢাকনি থেকে বেরিয়ে রয়েছে সরু সরু সুতোর মতো প্রবালময় তন্তু। গাছের মতো কানকো বললেও চলে। খুব বাচ্চা রে মাছ আর হাঙর মাছেদের ক্ষেত্রে দেখা যায়। শুধু মুখখানাই মানুষের মতো বলেই যে এদের মানুষের মতো আকৃতি, তা নয়। এর চাইতেও বড় মিল রয়েছে অন্যান্য প্রত্যঙ্গে। অসাধারণ মিল। অত্যন্ত অসাধারণ। প্রতিটি প্রাণীই দুপেয়ে। খাড়া রয়েছে অবশ্য তিনটে প্রত্যঙ্গের ওপর। একটা লেজ আর দুখানা পায়ের ওপর ঠিক যেন পেটমোটা ব্যাঙের পা। এদের দেহও প্রায় গোলাকার। ব্যাঙের সামনের দুটি প্রত্যঙ্গের মতোই দুখানা প্রত্যঙ্গও রয়েছে সামনে। বিদঘুটে গড়ন। মানুষের অতি বিতিকিচ্ছিরি হাত যেন। দুহাতে ধরে রয়েছে একটা লম্বা হাড়। হাড়ের ডগায় তামার ফলা। গায়ের রং এক-এক জায়গায় এক-একরকম। মাথা, হাত আর পা বেগুনি রঙের। চামড়া আলোকময় ধূসর রঙের। জামাকাপড়ের মতোই ঢিলেভাবে চামড়া ঝুলে রয়েছে সারা গায়ে। প্রখর আলোয় ধাঁধিয়ে যাওয়ায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে গোলকের সামনে।
হঠাৎ জোরালো আলোয় ড্যাবডেবে চোখ বন্ধ করে ফেলেছিল বটে, খুলেছিল পরক্ষণেই। ঘন ঘন চোখের পাতা ফেলে আলো সইয়ে নিয়েছিল এক হাত দিয়ে চোখ আড়াল করে। তারপরেই মুখ হাঁ করে বিকট চিৎকার। নিছক আওয়াজ নয়–চিৎকারই বলা উচিত। যেভাবে কথা উচ্চারণ করা হয় মুখ নেড়ে–ঠিক সেইভাবে। স্টিলের আবরণ ভেদ করে চিৎকার পৌঁছেছিল গদি গোলকের ভেতরে। ফুসফুস ছাড়া চেঁচানি সম্ভব হয় কী করে, এলসটিডের মাথায় তা ঢোকেনি। চেঁচিয়ে উঠেই আলোকরশ্মির দুপাশের অন্ধকারে সরে গিয়েছিল কিম্ভুতকিমাকার মূর্তিবাহিনী। চোখ দিয়ে দেখতে না পেলেও এলসটিডের মনে হয়েছে, নিশার দুঃস্বপ্নরা এগিয়ে আসছে গোলকের দিকেই। আলো নিবিয়ে বিদ্যুৎপ্রবাহ বন্ধ করে দিয়েছিল এসটিড। আলো দেখে যদি ছুটে এসে থাকে, অন্ধকারে সরে পড়বে নিশ্চয়। কিন্তু তা হয়নি, আলো নিবে যেতেই আচমকা নরমমতো ধাক্কা লেগেছিল গোলকে। দুলে উঠেছিল গোলক।
আবার শোনা গিয়েছিল বিষম চিৎকার। প্রতিধ্বনি ভেসে এসেছিল যেন অনেক দূর থেকে। প্রতিধ্বনি না বলে তাকে প্রত্যুত্তরই বলা যায়–অন্তত এসটিডের মনে হয়েছিল। তা-ই। আবার থপথপ করে ধাক্কা পড়েছিল গোলকে। দুলে উঠে গোলক, ঘষটে গিয়েছিল তলায় তার জড়ানো কাটিমের ওপর দিয়ে। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে চোখ পাকিয়ে এসটিড চেয়ে ছিল চিরন্তন রাত্রির দিকে। ধু ধু বিস্তৃত অন্ধকারের মধ্যে বহু দূরে দেখেছিল খুব আবছা কয়েকটা দ্যুতিময় অর্ধনর আকৃতি। দ্রুতচরণে আসছে তার দিকেই।
বাইরের জোরালো আলো জ্বালানোর জন্যে তাড়াতাড়ি যেতে গিয়ে এসটিড হুমড়ি খেয়ে পড়েছিল ভেতরকার লণ্ঠনের সুইচের ওপর। আছড়ে পড়েছিল গদি-মোড়া মেঝের ওপর। দুলে উঠেছিল গোলক। জ্বলে উঠেছিল আলো। কানে ভেসে এসেছিল বিস্ময়ধ্বনি। অপার্থিব সেই চিৎকার। যেন অবাক হয়ে গেছে। তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়িয়েই দেখেছিল, নিচের জানলায় চেপে বসেছে দুজোড়া ডাঁটি-চোখ। ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রয়েছে তার দিকে।
