মরিয়া হয়ে একটা এক্সপেরিমেন্ট করব ঠিক করেছি। মরবার আগে বসেছি সব কথা লিখে রাখার জন্যে। আজ সকালে প্রাতরাশের টেবিল থেকে একটা ছুরি দিয়ে অভিশপ্ত এই টেবিলের একটা গুপ্ত ড্রয়ার ভেঙে ফেলেছি। গুপ্ত ড্রয়ার নামেই–চোখের সামনে রেখে যেন। গুপ্ত করা হয়েছে। ভেতরে পেয়েছি একটা ছোট্ট সবুজ শিশি–আর কিছু না। শিশির মধ্যে রয়েছে খানিকটা সাদা গুঁড়ো। লেবেলে লেখা একটাই শব্দ–মুক্তি। নিঃসন্দেহে বিষ। এলভেসহ্যামই রেখেছে আমার নাগালের মধ্যে লুকিয়ে রাখার অছিলায়–যাতে খেয়ে মরি এবং তার অপকর্মের একমাত্র সাক্ষীটি ইহলোক থেকে বিদায় নেয়। লোকটা যত দুরাত্মাই হোক, অমর হওয়ার পথ যে আবিষ্কার করেছে, তাতে কোনও সন্দেহই নেই। দুর্ঘটনা না ঘটলে, আমার শরীর নিয়ে বাঁচবে বৃদ্ধ বয়স পর্যন্ত। তারপর সুযোগ বুঝে জীর্ণ দেহ ত্যাগ করে প্রবেশ করবে আবার কোনও হতভাগ্য তরুণের দেহে। চুরি করবে তার জীবন, যৌবন, ভবিষ্যৎ। হৃদয়হীন সন্দেহ নেই… কিন্তু আমি ভাবছি, এইভাবে জ্ঞান আর অভিজ্ঞতা বাড়তে বাড়তে গিয়ে ঠেকবে কোথায়… ভাবছি, কতকাল ধরে এইভাবে দেহ থেকে দেহান্তরে লাফ দিয়ে দিয়ে চলেছে বৃদ্ধ… কিন্তু আর পারছি না। ক্লান্তি বোধ করছি। সাদা গুড়ো জলে গুলে যায় দেখেছি। খেতেও খারাপ নয়।
.
মি. এলভেসহ্যামের টেবিলে পড়ে-থাকা লেখাটার শেষ এইখানেই। মৃতদেহটা পড়ে ছিল চেয়ার আর টেবিলের মাঝখানে। শেষ মুহূর্তে খিচুনির সময়ে সম্ভবত চেয়ার ঠেলে সরিয়ে দিয়েছিল পেছনে। গল্পটা পেনসিলে লেখা, হাতের লেখাও মি. এলভেসহ্যামের সুন্দর হস্তাক্ষরের মতো নয়। দুটো অদ্ভুত ঘটনা নথিভুক্ত করেই ইতি টানা যাক উপাখ্যানে। ইডেন আর এলভেসহ্যামের মধ্যে যে একটা সম্পর্ক ছিল, সে বিষয়ে বিতর্কের কোনও অবকাশই নেই। কেননা এলভেসহ্যামের যাবতীয় সম্পত্তির উত্তরাধিকারী করা হয়েছে ইডেনকে। ইডেন কিন্তু উত্তরাধিকারী হয়েও হতে পারেনি। মারা গিয়েছিল এলভেসহ্যাম আত্মহত্যা করার চব্বিশ ঘণ্টা আগে–জনবহুল চৌমাথায় গাড়িচাপা পড়ে। অত্যাশ্চর্য এই কাহিনিতে আলোকসম্পাত করতে পারত একমাত্র যে ব্যক্তি, এখন সে জেরার বাইরে।
নিতল নগরী
নিতল নগরী ( In the Abyss )
[‘In the Abyss’ প্রথম প্রকাশিত হয় ‘Pearsons Magazine’ পত্রিকায় আগস্ট ১৮৯৬ সালে। ১৮৯৭ সালে লন্ডনের ‘Methuen & Co.’ থেকে প্রকাশিত ওয়েলসের ছোটগল্পের সংকলন ‘The Plattner Story and Others’ বইটিতে গল্পটি স্থান পায়। সেপ্টেম্বর ১৯২৬ সালে গল্পটি পুনঃপ্রকাশিত হয় ‘Amazing Stories’ পত্রিকায়।]
ইস্পাত গোলকটার সামনে দাঁড়িয়ে পাইন কুচি চেবাতে চেবাতে লেফটেন্যান্ট বললে, দেখে কি মনে হয়, স্টিভেন্স?।
আইডিয়াটা ভালোই, ভোলা মনেই জবাব দিয়েছিল স্টিভেন্স।
চিঁড়েচ্যাপটা হয়ে যাবে কিন্তু।
জলের চাপ তো সাংঘাতিক। জলের উপরিভাগে এই চাপ প্রতি বর্গইঞ্চিতে চোদ্দো পাউন্ড, ত্রিশ ফুট নিচে তার দ্বিগুণ, ষাট ফুট নিচে তিনগুণ, নলুই ফুট নিচে চারগুণ, নশো ফুট নিচে চল্লিশগুণ, পাঁচ হাজার ফুট নিচে তিনশোগুণ–প্রায় মাইলখানেক–চোদ্দো পাউন্ডের দুশো চল্লিশগুণ–প্রায় দেড় টন। প্রতি বর্গইঞ্চিতে দেড় টন। সমুদ্র যেখানে পাঁচ মাইল গভীর, সেখানে সাড়ে সাত টন–
ইস্পাতের চাদরও তো দারুণ মোটা।
নিরুত্তর রইল লেফটেন্যান্ট।
আলোচনা হচ্ছে স্টিলের একটা অতিকায় বল নিয়ে। ব্যাস প্রায় নফুট। দেখতে অনেকটা দানবিক কামানের গোলার মতো। জাহাজের ওপর বিরাট ভার আর মঞ্চ তৈরি করে বলটা রাখা হয়েছে তার ওপর। এইখান থেকেই নামিয়ে দেওয়া হবে সমুদ্রের জলে। বলের গায়ে দুটো গোলাকার জানলা। একটার ওপর আর-একটা। দারুণ পুরু কাচ দিয়ে ঢাকা। স্টিলের ফ্রেম। একটা জানলা খোলা রয়েছে। লেফটেন্যান্ট এবং স্টিভেন্স সাত সকালেই গোলকের ভেতর দেখে এসেছে। পুরু কুশন দিয়ে মোড়া। কুশনের ফাঁকে ফাঁকে হাতল–সাদাসিধে যন্ত্রপাতি চালু রাখার ব্যবস্থা। ভেতরে ঢুকে জানলা বন্ধ করে দেওয়ার পর শ্বাস-প্রশ্বাসের কার্বনিক অ্যাসিড শুষে নিয়ে তার বদলে অক্সিজেন ছেড়ে দেওয়ার মায়ার্স যন্ত্রটাও গদি দিয়ে সুরক্ষিত। পুরো ভেতরটা এমনভাবে গদি দিয়ে মোড়া যে কামান থেকে গোলার মতো ছুঁড়ে দিলেও ভেতরে যে বসবে, তার গায়ে আঁচড়টি লাগবে না। একটু পরেই কাচের ম্যানহোল দিয়ে সত্যিই এক ব্যক্তির প্রবেশ ঘটবে ভেতরে, গোলক। নিক্ষিপ্ত হবে জলে তলিয়ে যাবে অনেক নিচে–মাইল পাঁচেক তো বটেই।
তারপর? কাচ বেঁকে ভেতরে ঢুকে যাবে–জানলার দফারফা হয়ে যাবে। সুচিন্তিত অভিমত প্রকাশ করলে লেফটেন্যান্ট। তখন হুড়হুড় করে জল ঢুকবে ভেতরে। লোহার ফলা ঢুকিয়ে দেওয়ার মতোই জলের খোঁচায় প্রাণটা উধাও হবে চক্ষের নিমেষে। বুলেট বলাও যায়। জলের বুলেট। চিঁড়েচ্যাপটা তো হবেই ভেতরের মানুষ, সেই সঙ্গে পুঁটি দুটুকরো হবে, ফুসফুস ফাটিয়ে দেবে, কানের পরদা—
গোলকের অবস্থাটা? জানতে চেয়েছিল স্টিভেন্স।
বেশ কিছু বুদবুদ ছেড়ে চিরকালের মতো তলিয়ে যাবে কাদার ওপর। রুটিতে মাখন মাখানোর মতো ব্যাপার আর কী।
উপমাটা মনে ধরল লেফটেন্যান্টের নিজেরই। নিজের মনেই বারকয়েক আওড়ে গেল একই কথা।
