.
নয় : পঞ্চায়েতপ্রধান
ভারতের হৃত্পিণ্ড তার গ্রামে অবস্থিত, এ কথা আমি প্রায়ই বলে থাকি। প্রায় ৫,৪৩,০০০টি গ্রাম আছে আমাদের দেশে। জনসংখ্যার ৭০ শতাংশের বাস ওই গ্রামে। ফলে, দেশের সার্বিক উন্নয়নে গ্রামের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। ভারতের স্থানীয় স্বশাসিত ব্যবস্থার ভিত্তি হল গ্রামের পঞ্চায়েত, যার সংখ্যা ২,৫০,০০০। পঞ্চায়েতের নির্বাচিত প্রধানের পদটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের বিশাল গ্রামীণ সমাজের সঙ্গে সরকারি দপ্তরের যোগাযোগের কেন্দ্রবিন্দু হলেন এই প্রধান। বিহারের মতো কিছু রাজ্যে, সরপঞ্চদের ক্ষমতা দেওয়া আছে বিভিন্ন দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা তদারকের। আইনভঙ্গকারীদের শাস্তি প্রদান ও জরিমানা ধার্য করার ক্ষমতাও তাঁদের দেওয়া আছে আইনে। এক উন্নয়নশীল দেশ থেকে এক উন্নত দেশে পরিবর্তিত হওয়ার লক্ষ্যে আগামী দুই দশক ভারতের কাছে অত্যন্ত জরুরি। সেই লক্ষ্যে পৌঁছতে কিছু কর্মযজ্ঞ সম্পর্কে আমার কিছু ভাবনা আপনাদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে চাই।
‘পুরা’ এবং স্ত্রীসমাজ
প্রোভাইডিং আরবান অ্যামেনিটিস ইন রুরাল এরিয়াজ় (পিইউআরএ বা ‘পুরা’) হল তেমনই একটি প্রকল্প যা আমার হৃদয়ের সব থেকে কাছের। বৃদ্ধির সম্ভাবনা আছে এমন এক গুচ্ছ গ্রামকে শনাক্ত করে চার ধরনের যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করা এর মূল লক্ষ্য:
১। সড়ক, পরিবহণ ও বিদ্যুৎ যোগাযোগ।
২। নির্ভরযোগ্য টেলিকম, ইন্টারনেট ও আইটি পরিষেবার মাধ্যমে বৈদ্যুতিন যোগাযোগ।
৩। উত্তম মানের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র দ্বারা জ্ঞানের যোগাযোগ।
৪। কৃষক এবং অন্যান্যদের তাঁদের পণ্যের সব থেকে উৎকৃষ্ট মূল্য পাওয়ার জন্য বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ।
আগামী পাঁচ বছরে সরকার মনস্থ করেছে ‘পুরা’ চালু করা হবে সারা দেশের ৫০০০টি গুচ্ছ-গ্রামে। তৃণমূল স্তরে গ্রামপ্রধানদের গোষ্ঠীবদ্ধ সক্রিয় সহযোগিতার উপর নির্ভর করছে এই উচ্চাশার প্রকল্পটির ভবিষ্যৎ। উপরন্তু, মহিলাদের সহজাত যে সব গুণ যেমন, অন্যের প্রতি সমবেদনা, সহনশীলতা, অধ্যবসায়, সততা, সামাজিক বিষয়ে সংবেদনশীলতা, সমস্যা সমাধানে ইতিবাচক অভিগমন ও কঠোর পরিশ্রম করার ক্ষমতা, তা এই মিশনকে ফলপ্রসূ করতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেবে। গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতা পেলে মহিলারা গোষ্ঠীবদ্ধভাবে দর্শনীয় কাজ করে দেখাতে পারেন।
তামিল মহাকবি সুব্রাহ্মনিয়া ভারতীর কথা মনে পড়ছে, যিনি ১৯১০ সালে, ভারতের নারীদের নিয়ে একটি কবিতা রচনা করেছিলেন। তার অনুবাদ এই রকম হবে:
She walks with raised head,
With her eyes looking straight.
She has her principles
Unafraid of anybody!
She has a lofty
And knowledge-based pride.
Such cultured women
Don’t falter from the chosen path.
She drives ignorance away.
She welcomes the bliss of life
With learned mind.
This is the dharma
Of the emerging woman.
‘পুরা’ এবং পঞ্চায়তপ্রধান
‘পুরা’-র বিষয়ে গ্রামীণ সমাজকে অবগত করে তাঁদের এই উন্নয়ন প্রকল্পে শামিল করতে পারেন পঞ্চায়তপ্রধান। সহযোগিতা করতে পারেন এইভাবে:
১। অশিক্ষা দূরীকরণ অভিযানে সাহায্য ও সহযোগিতা।
২। স্বচ্ছ শাসনব্যবস্থা ও অর্থনৈতিক উন্নতিতে কম্পিউটারের সাহায্যের বিষয়ে গ্রামীণ প্রশাসনকে ওয়াকিবহাল করা।
৩। গ্রামে সমবায় স্থাপন করে কেন্দ্রীয়ভাবে ন্যায্য মূল্যে পণ্য সংগ্রহ, মজুত, প্রক্রিয়াকরণ ও বাজারজাত করার ব্যবস্থা করা।
৪। পরিবার ও গোষ্ঠীর সুস্বাস্থ্যের জন্য উৎকৃষ্ট পুষ্টি, স্যানিটেশন ব্যবস্থা, নিরাপদ পানীয় জল এবং স্বাস্থ্য পরিসেবা জোগান দেওয়া।
৫। পণ, কন্যা ভ্রূণ হত্যা, শিশু বিবাহ, শিশুশ্রম, গার্হস্থ্য হিংসা এবং সামাজিকভাবে পিছিয়ে থাকা শ্রেণির নির্যাতন ও হয়রানির মতো সামাজিক কুপ্রথার বিরুদ্ধে লড়াই করা।
৬। ক্ষুদ্রঋণের ব্যবস্থা আর বিভিন্ন দক্ষতা উন্নতি প্রকল্প আয়োজন করে স্বনির্ভর গোষ্ঠী তৈরি করে মহিলাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বনির্ভর হওয়ার জন্য অনুপ্রাণিত করা।
৭। সৌরশক্তির সঠিক ব্যবহার, বর্জ্য পুনর্নবীকরণ এবং বৃষ্টির জল ধারণ করে জলসম্পদের ব্যবস্থাপনার মতো শক্তি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা।
উপসংহার
ভারতকে উন্নত দেশে রূপান্তরের কাজ শুরু হয়ে গিয়েছে। আমরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ভাবে এই কাজে ব্রতী আছি। কৃষি, কৃষিজাত প্রক্রিয়াকরণ, কুটির শিল্প, হস্তশিল্প, রেশমশিল্প, ঔষধি গাছগাছালি চাষ ইত্যাদির মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে মহিলাদের নানান সাফল্য কাহিনি আমাদের জানা। সামাজিক কুপ্রথার বিরুদ্ধে অভিযানে মহিলারা নেতৃত্ব দেন। ২০২০ সালের মধ্যে ভারতকে এক উন্নত দেশ হিসেবে গড়ে তোলার একমাত্র লক্ষ্যকে সামনে রেখে যদি এই স্ত্রীসমাজ তৃণমূল স্তর থেকে নিরন্তর দায়িত্ব নিয়ে কাজ করে চলেন, তবে আমাদের সেই লক্ষ্যে পৌঁছনো কেউ আটকাতে পারবে না।
সময় হয়েছে মহিলা পঞ্চায়েতপ্রধানদের মননশীল নেতৃত্ব দেওয়ার। কেন্দ্রীয় সরকার, রাজ্য সরকার, উদ্যোগপতি এবং বেসরকারি সংস্থাগুলির সাহায্যে তাঁরা নিজ নিজ গ্রামে ‘পুরা’ প্রকল্পকে বাস্তবায়িত করতে অগ্রণী ভূমিকা নিতে পারেন। এটা করা সম্ভব গ্রামীণ জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে এবং তাঁদের চালিত করে এই কাজে শামিল করা যায়। এটাই হবে মহিলা প্রধানদের মূল কাজ। তাঁদের জন্য আমার দশ-দফা শপথ:
