ম্যাকবেথ তার প্রাসাদে ফিরে আসার বহুক্ষণ আগেই দূত তুতার চিঠিটা এনে দিয়েছে লেডি ম্যাকবেথের হাতে। চিঠিটা খুঁটিয়ে পড়লেন তিনি। তিনি ভেবে দেখলেন ম্যাকবেথ রাজা হলে তিনি হবেন রাজরানি। লেডি ম্যাকবেথও খুব উচ্চাভিলাষী ছিলেন। তিনি এও জানেন তার স্বামী খুব সৎ। কোনও অন্যায়ের আশ্রয় নিয়ে নিজের কার্যসিদ্ধি করতে চান না তিনি। আবারও চিঠিটা মন দিয়ে পড়লেন লেডি ম্যাকবেথ। তারপর স্বামীর উদ্দেশে মনে মনে বলতে লাগলেন, হে আমার গ্লমিশ ও কডর-এর থেন! তুমি চাইছ সৎপথে সিংহাসনে বসতে। কিন্তু তা সম্ভব নয়। সিংহাসনে বসতে হলে অসৎপথেই তোমাকে তা করতে হবে। তুমি আমার সামনে এলে এমন সব ধারালো বাণী তোমাকে শোনাব, যাতে কার্যসিদ্ধির জন্য অন্য পথের আশ্রয় নিতেও তুমি পেছপা হবে না। আমি সেটা করিয়েই ছাড়ব। যেখানে যত অশুভ, অপ্রাকৃতিক শক্তি আছ, তোমরা সবাই আমাকে সাহায্য কর লক্ষ্য পূরণ করতে। আমার মন থেকে ভয়-ভীতি দূর করে জাগিয়ে তোল দুৰ্জয় সাহস। আমার নারীসুলভ মায়া-মমতা দূর করে আমার মনকে পাথরের মত নিষ্ঠুর কর আমাকে। প্রার্থনার ঢংয়ে যখন তিনি নিজেকে এভাবে উত্তেজিত করছিলেন, সে সময় ম্যাকবেথ এলেন সেখানে।
ঘাড় সামান্য নিচু করে স্বামীকে অভিবাদন জানিয়ে লেডি ম্যাকবেথ ফিসফিস করে বললেন, এই কিছুক্ষণ আগে তোমার চিঠি পেয়েছি। পড়ে মনে হল তোমার ভবিষ্যৎ খুবই উজ্জ্বল।
স্ত্রীকে জড়িয়ে ধরে চুমু খেয়ে ম্যাকবেথ বললেন, আর কিছুক্ষণ বাদেই অমাত্যদের সাথে নিয়ে রাজা ডানকান এসে পড়বেন। আজ রাতে তিনি আমাদের অতিথি।
ভালোই তো, বললেন লেডি ম্যাকবেথ, তা এখান থেকে কখন তিনি ফিরে যাবেন?
ম্যাকবেথ বললেন, রাজার কথা শুনে মনে হল আগামী কাল সকালে তিনি চলে যাবেন।
স্বামীর কথা শুনে লেডি ম্যাকবেথ বললেন, আজকের রাতটা যেন শেষ না হয়।
ম্যাকবেথ অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, কী বলছ তুমি?
ফিস ফিস করে লেডি ম্যাকবেথ বললেন, আমি বলতে চাইছি আজ রাতটাই যেন রাজার জীবনের শেষ রাত হয়। তোমার চাউনি দেখে মনে হচ্ছে তুমিও এই আশাই করছি। তুমি কি চাও না আজ রাতে রাজাকে হত্যা করে তোমার উচ্চাশা পূরণ করতে? দেখছি তোমার দ্বারা কিছু হবে না। বেশ, যা করার আমিই করব।
স্ত্রীর কথার জবাব না দিয়ে চুপচাপ রইলেন ম্যাকবেথ। লেডি ম্যাকবেথ-আন্দাজ করলেন শুভ-অশুভের দোলাচলে দুলছেন তার স্বামী। তাই স্বামীকে বললেন, দেখ, দুশ্চিন্তার ছায়া পড়েছে তোমার চোখে-মুখে। তোমাকে দেখলে যে কেউ বুঝতে পারবে মানসিক দ্বন্দ্বে ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে তুমি। এবার মন দিয়ে শোন, কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সবসময় হাসিমুখে থাকবে। রাজা এলে তাকে যথাযোগ্য সম্মান জানাবে, লক্ষ রাখবে যেন তার আতিথ্যের কোনও ত্রুটি না হয়। তারপর যা করার তা আমিই করব। রাজা ও তার অমাত্যদের সামনে সবসময় ভালোমানুষ সেজে থাকার চেষ্টা করবে যাতে তোমার প্রকৃত উদ্দেশ্য কেউ টের না পায়। মনে রাখবে আজ রাতে আমরা এমন একটা কাজ করতে যাচ্ছি যা সফল হলে আমাদের বাকি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তই আমাদের ইশারায় চলবে।
ম্যাকবেথের মনে তখনও দ্বন্দ্ব চলছে। স্ত্রীর কথার জবাব না দিয়ে তিনি বললেন, পরে তোমার সাথে এ বিষয়ে কথা হবে।
ম্যাকবেথের কথা শেষ হতে না হতেই প্রাসাদের বাইরে শোনা গেল তুর্যনাদ, বেজে উঠল। দামামা, ভেরী। রাজা এসেছেন জেনে ম্যাকবেথ তার স্ত্রীকে নিয়ে ছুটে গেলেন ফটকের সামনে। তার নির্দেশে ফটক খুলে দেবার পর স্বামী-স্ত্রী বাইরে গিয়ে রাজা ও সঙ্গীদের যথোচিত অভ্যর্থনা জানিয়ে নিয়ে এলেন প্রাসাদের ভেতরে।
লেডি ম্যাকবেথকে দেখিয়ে হাসিমুখে বললেন রাজা, সেনাপতি ম্যাকবেথের স্ত্রী শুধু রূপসিই নন, তিনি যে একজন আদর্শ গৃহিণী তা তাকে দেখলেই বোঝা যায়। বুঝলেন লেডি ম্যাকবেথ, আজ আমরা সবাই আপনার অতিথি।
সে তো আমাদের পরম সৌভাগ্য মহারাজী, বিনয়ের সাথে বললেন লেডি ম্যাকবেথ, আমরা তো আপনারই আজ্ঞাবহ ভূত্য মাত্র। আমাদের সৌভাগ্যের মূলে রয়েছে আপনার অসীম করুণা। আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করব অতিথিসেবার–বলে রাজাও অমাত্যদের পথ দেখিয়ে প্রাসাদের ভেতর নিয়ে গেলেন তারা।
এবার খেতে বসলেন রাজা ডানকান ও তার সঙ্গীরা। রীতি অনুযায়ী ম্যাকবেথও বসে গেলেন তাদের সাথে। কিন্তু তখনও পর্যন্ত মনস্থির করে উঠতে পারেননি। তাই রাজার খাওয়া শেষ হবার আগেই তিনি টেবিল ছেড়ে উঠে গেলেন তার শোবার ঘরে। রাজার খাওয়া শেষ হবার আগেই টেবিল ছেড়ে আসার জন্য লেডি ম্যাকবেথ বাকাবিকি করল তার স্বামীকে। তার বুঝতে বাকি রইল না শুরুতে রাজাকে হত্যা করার সাহস দেখালেও এখন তার স্বামীর বিবেক জেগে উঠেছে। ম্যাকবেথ স্ত্রীকে বললেন, দেখ, রাজা আজ আমাদের অতিথি। তারই দয়ায় আমি একই সাথে গ্লমিশ আর কডর-এর থেন। তাছাড়া আমি তার আত্মীয়। এসব কথা বিবেচনা করে এখন আমি তাকে হত্যা করতে পারব না।
কী বললে, তুমি পারবে না? উপহাসের হাসি হেসে বললেন লেডি ম্যাকবেথ, রাজাকে হত্যা করে সিংহাসনে বসার পরিকল্পনা করে আমাকে চিঠি লেখার সময় তোমার বিবেক-বুদ্ধি কোথায় ছিল? সততার ধ্বজা বয়ে কাপুরুষের মতো জীবন কাটাবে তুমি?
স্ত্রীকে ধমক দিয়ে ম্যাকবেথ বললেন, দোহাই তোমার, একটু থাম। আমি তাই করব যা একজন সত্যিকারের পুরুষ মানুষ করে থাকে। আর এও জেনে রাখ, আমার মতে যে পুরুষের সাহস নেই সে মানুষই নয়।
