সম্রাটের কাণ্ড দেখে বেজায় ঘাবড়ে গেলেন। বড়ো ছেলে লুসিয়াসকে ডেকে তিনি বললেন, দ্যাখ! হাতে আর মোটেও সময় নেই। প্ৰাণে বাঁচতে চাও তো এইবেলা রোম ছেড়ে পালিয়ে গিয়ে গথিদের দেশে আশ্রয় নাও। সেখান থেকে সৈন্য নিয়ে রোম আক্রমণ করে এর প্রতিশোধ নেবে। পিতার নির্দেশে তখনই ঘোড়ায় চড়ে রোম ছেড়ে পালিয়ে গেলেন লুসিয়াস। যাবার আগে তিনি নিজের ছেলেকে বাবার কাছে রেখে গেলেন।
দু-হাত আর জিভ কটা, কথা বলার ক্ষমতাও নেই ল্যাভিনিয়ার। টাইটাসের কথা মতো সে দাঁতে কাঠি কামড়ে ধরে ভেজা মাটির উপর লিখল—সম্রাজ্ঞী ট্যামোরার নির্দেশে তার দুই ছেলে চিরন আর ডিমিট্রিয়াস কেটে নিয়েছে তার দুহাত আর জিভ। এমন কি সম্রাজ্ঞীর প্ররোচনায় বনের মাঝে খুন হয়েছেন তার স্বামী ব্যাসিয়ানাস।
সম্রাট স্যাটানিনাস আর সম্রাজ্ঞী ট্যামোরা উভয়েই বেজায় ভয় পেয়ে গেলেন যখন তারা গুপ্তচরের মুখে শুনলেন বিশাল গথ সেনাবাহিনী নিয়ে রোম আক্রমণ করতে আসছেন টাইটাসের ছেলে লুসিয়াস। এদিকে টাইটাসের পেট থেকে লুসিয়াসের কথা বের করতে ট্যামোরা তার দুই ছেলে চিরন আর ডিমিট্রিয়াসকে মন্ত্রী সাজিয়ে টাইটাসের কাছে নিয়ে এলেন। টাইটাসকে আশ্বাস
ঐ দু-জনকে তার কাছে রেখে যান। সেই সাথে তাকে আমন্ত্রণ জানালেন তিনি যেন সম্রাটকে সাথে নিয়ে নৈশভোজে তার প্রাসাদে আসেন।
দুই ছেলেকে টাইটাসের ভরসায় রেখে দিয়ে রাজপ্রাসাদে ফিরে গেলেন ট্যামোরা। এরপর টাইটাসের প্রাসাদে এলেন রাজপ্রতিনিধি মার্কাস অ্যান্ডোনিকাস। ছেলে দুটিকে দেখেই তিনি তাদের শনাক্ত করলেন ট্যামোরার ছেলে চিরন আর ডিমিট্রিয়াস বলে। রাজপ্রতিনিধির কথা শুনে খুব খুশি হলেন টাইটাস। তিনি তখনই ল্যাভিনিয়াকে ডেকে এনে তাদের চোখের সামনে নিষ্ঠুরভাবে–ছুরি দিয়ে হত্যা করলেন ট্যামোরার ছেলে দু-টিকে। তারপর নিজেই রান্না করলেন ছেলে দুটির মাংস। নৈশভোজে সম্রাট স্যাটানিনাস আর সম্রাজক্ট ট্যামোরা এসে পৌঁছাবার পর তিনি তাদের সেই মাংস খাওয়ালেন। এবার তাদের সবার সামনে টাইটাস নিজ হাতে হত্যা করলেন মেয়ে ল্যাভিনিয়াকে। ট্যামোরা বাধা দিতে এলে তিনি তাকেও খুন করলেন। পরমুহূর্তে টাইটাস অ্যান্ড্রোনিকাসকে হত্যা করলেন সম্রাট স্যাটার্নিনাস। তখন ভোজসভায় রক্তের ছড়াছড়ি। যে যেদিকে পারে ভয়ে পালিয়ে যাচ্ছে। এ সব কাণ্ডের মাঝেই বিশাল বাহিনী নিয়ে হাজির হলেন টাইটাসের বড়ো ছেলে লুসিয়াস। কোমরে আঁটা খাপ থেকে তলোয়ার খুলে তিনি আমূল বসিয়ে দিলেন সম্রাটের বুকে।
এরপর জনগণের ইচ্ছানুসারে রোমের সিংহাসনে বসলেন লুসিয়াস।
ট্রয়লাস অ্যান্ড ক্রেসিডা
ট্রয় শহরের রাজপ্রাসাদের বাইরে পথের ধারে দাঁড়িয়ে রাজপুত্র ট্রয়লােস কথা বলছেন ক্রেসিডার কাকা প্যান্ডারাসের সাথে। ক্রেসিডার বাবা কালচাসট্রিয়ের পুরোহিত। তিনি এখন গ্রিকদের পক্ষে। তারই মেয়ে সুন্দরী ক্রেসিডার প্রেমে হাবুডুবু রাজপুত্র ট্রয়লাস।
এখন খুবই দুঃসময় চলছে ট্রয়ের। এখনকার রাজা প্রায়ামের পাঁচটি ছেলে, তাদের নাম হেক্টর, ট্রয়লাস, প্যারিস ডিফোবাস আর হেলেনাস। এছাড়াও রাজার এক অবৈধ পুত্রসস্তান আছে — নাম মারগারেলন। সে প্রায় ছবছর আগের কথা। রাজার সেজ ছেলে প্যারিস সে সময় প্রেমে পড়েছিলেন গ্রিক সেনাপতি আগামেমননের ভাই মিনিলাসের সুন্দরী স্ত্রী হেলেনের সাথে। স্বামীর কাছ থেকে তাকে ছিনিয়ে এনে সোজা তাকে রাজপ্রাসাদে এনে তুলেছিলেন প্যারিস। সেই থেকেই হেলেন রয়েছে প্যারিসের সাথে। এর পরপরই গ্রিসের রাজারা সবাই একজোট হয়ে ট্রয় আক্রমণ করেছেন। তাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হেলেনাকে উদ্ধার করে তাকে গ্রিসে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া। জলে, স্থলে চারদিক দিয়ে তারা বারবার আঘাত হানছে ট্রয়ের উপর।
বীর যোদ্ধা হিসেবে রাজপুত্র ট্রয়লাসের যথেষ্ট খ্যাতি সত্ত্বেও যতই দিন যাচ্ছে শত্রুসৈন্যের মোকাবিলা করার উৎসাহ কেন জানি তিনি হারিয়ে ফেলছেন। ট্রয়লাসের মনোভাব অনুমান করে
চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ট্রয়লাস বললেন, না, মন থেকে যেন সাড়া পাচ্ছি না।
বল কী! তোমার মতো বীরের মুখে তো এ কথা মানায় না, বললেন প্যান্ডারাস।
ট্রয়লাস বললেন, যুদ্ধ করা তারই পক্ষে সম্ভব হৃদয়-মন যার আয়ত্তে থাকে। আজ আর আমার মন নিজের আয়ত্তে নেই। যতক্ষণ রাজসভায় থাকি, সুন্দরী ক্রেসিডা আমার সারা মন জুড়ে থাকে। তখন আর নিজের মনের উপর অধিকার থাকে না।
প্যান্ডারাস বললেন, ক্রেসিডার কাকা হিসেবেই আমি বলছি, সে যতই সুন্দরী হোক না কেন, হেলেনের সাথে তার কোনও তুলনা হয় না। আমি ভেবে পাচ্ছি না কেন যে ক্রেসিডা তার বাবার সাথে গ্রিক শিবিরে যায়নি। তার উচিত ছিল সেখানে যাওয়া। ভবিষ্যতে তার সাথে দেখা হলে আমি তাকে সে কথা বলব। এই বলে অন্যদিকে চলে গেলেন প্যান্ডারাস। আর ক্রেসিডার কথা ভাবতে ভাবতে ট্রয়লাসও হাঁটা দিলেন রাজপ্রাসাদ অভিমুখে।
প্রাসাদের লাগোয়া পথ ধরে হেঁটে চলেছে ক্রেসিডা। এমন সময় ভৃত্য আলেকজান্দার এসে তাকে বলল, আজ সকালে সূর্য ওঠার আগেই যুবরাজ হেক্টর রওনা দিয়েছেন যুদ্ধ করতে।
অবাক হয়ে ক্রেসিড বললেন, সত্যি?
আলেকজান্দার বলল, আজ্ঞে হ্যা! শুনেছি আজ হেক্টরের মা হেলেনাকে সাথে নিয়ে দুর্গে দাঁড়িয়ে যুদ্ধ দেখবেন। আজ তুমুল লড়াই হবে গ্রিক বীর অ্যাজাকসের সাথে হেক্টরের। তবে হেক্টর এক লড়াই করবেন না। তার পরের ভাই ট্রয়লাসও থাকবেন তার পাশে। সবাই জানে হেক্টরের চেয়ে যুদ্ধবিদায় কম পারদশী নন ট্রয়লাস।
