মদিরা পানের সাথে সাথে শুরু হল। ঠাট্টা-তামাশা। বিশেষ করে সবাই লেগেছে পেক্রসিওর পেছনে–ক্যাথারিনার মতো দজাল মেয়েকে বিয়ে করে সে নাকি পস্তাচ্ছে, ভবিষ্যতে এর জন্য তাকে নাকের জলে চোখের জলে এক হতে হবে–এমনই সভার মনোভাব। তিন বউয়ের মধ্যে ক্যাথারিনাই সবচেয়ে খারাপ হবে — হাসি-মশকরার মধ্যে দিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সবাই একথা বোঝাতে চাইছে পেক্রসিওকে। কিন্তু এসব কথায় কান না দিয়ে এক মনে মন্দিরা পান করে চলেছে সে। শেষমেশ তার শ্বশুর ব্যাপটিস্টা যখন বললেন যে বউয়ের জন্যই সারা জীবন অশান্তি ভোগ করতে হবে, তখন সে আর প্রতিবাদ না করে পারল না। সবার সামনেই সে বলে বসল, লুসেনসিও আর হর্টেনসিওর বউ-এর চেয়ে আমার বউ ক্যাথরিন অনেক বেশি বাধ্য আর সুশীলা। সে বাইবেলের অনুশাসনের মতো মনে করে স্বামীর কথাকে। সে জানে স্বামীর আজ্ঞা পালন না করলে মহাপাতকী হতে হয়। পেক্রসিওর এ কথাকে রসিকতা বলে উড়িয়ে দিল সবাই।
তখন পেত্রুসিও বলল, আমার কথা আপনাদের বিশ্বাস হচ্ছে না? আমার কথা সত্যি না। মিথ্যা তা যাচাই করতে চান আপনারা? বেশ তো, তাহলে বাজি ধরুন — পেত্রুসিওর স্বর আত্মবিশ্বাসে ভরা।
ক্যাথারিনার স্বভাবের সাথে ভালোভাবেই পরিচিত লুসেনসিও আর হর্টেনসিও তারা নিশ্চিত বাজি হেরে যাবে পেত্রুসিও। তাই উভয়ে একশো মোহর করে বাজি ধরল। সবাই জানে পুরুষদের মন্দিরা পানের আসরে মেয়েরা থাকে না–আগে ভাগেই চলে যায়। তারা স্থির করল এই প্রচলিত রীতির বিরুদ্ধে বাজি ধরবে। ঠিক হল পেক্রসিও, লুসেনসিও আর হর্টেনসিও — যে যার স্ত্রীকে টেবিলে আসার জন্য ডেকে পাঠাবে। যার স্ত্রী আসবে সেই বাজি জিতবে।
সর্বপ্রথম লুসেনসিও ডেকে পাঠাল তার বউ বিয়াংকাকে। কিন্তু সেনা এসে জানিয়ে দিল অন্য কাজে ব্যস্ত থাকার দরুন সে আসতে পারবে না।
এবার হর্টেনসিও মিনতি জানিয়ে তার টেবিলে আসার জন্য অনুরোধ করল স্ত্রীকে। কিন্তু সে এল না। জানিয়ে দিল, পুরুষদের মদ্যপানের আসরে স্ত্রী লোকের যাবার নিয়ম নেই। তাই আমি যেতে পারব না।
সর্বশেষে এল পেক্রসিওর পালা। সে একজন ভৃত্যকে ডেকে বলল, যা, ভেতরে গিয়ে আমার স্ত্রীকে বল সে যেন সব কাজ ফেলে এখনই এখানে চলে আসে।
সবাই ধরে নিল বদমেজাজি ক্যাথারিনা তো আসবেই না, উলটো কড়া জবাব পাঠিয়ে দেবে। কিন্তু সবার ধারণাকে মিথ্যে প্রমাণ করে ক্যাথারিনা চলে এল সেখানে। এসেই বলল, কী হয়েছে, আমায় ডাকছ কেন?
পেত্রুসিও বলল, লুসেনসিও ডেকেছিল তোমার বোন বিয়াংকাকে আর হর্টেনসিও ডেকেছিল তার স্ত্রীকে। কিন্তু তারা কেউ আসেনি। স্বামী ডাকলে যে সব কাজ ফেলে ছুটে আসতে হয়, সে বোধ তাদের নেই। আর সে শিক্ষাও কেউ তাদের দেয়নি। তুমি এসে প্রমাণ করেছ যে ওদের চেয়ে তুমি অনেক সুশীলা। তোমার স্থান ওদের অনেক উপরে। যাও, এবার ভেতরে গিয়ে ওদের দুজনকে ডেকে নিয়ে এস। ভেতরে গিয়ে কিছুক্ষণ বাদে হর্টেনসিওর বউ আর ছোটোবোন বিয়াংকাকে সাথে করে নিয়ে এল ক্যাথারিনা।
সত্যিই বাজিমাত করে দিল পেত্রুসিও। তার শ্বশুর ব্যাপটিস্টাও খুশি হলেন এই দেখে যে তার বদমেজাজি মেয়ে কেমন শান্ত-শিষ্ট হয়ে গেছে পেত্রুসিওর মতো স্বামীর হাতে পড়ে। সবার সামনে তিনি জানিয়ে দিলেন মোটা পুরস্কার দেবেন বড়ো জামাইকে।
দ্য মেরি ওয়াইভস অব উইন্ডসর
জ্ঞাতিভাই স্লেন্ডার আর গ্রামের পাদরি স্যার হিউ ইভানসের কথা শোনার পর বিচারপতি ফ্যালো বললেন, খুবই অন্যায় করেছেন স্যার জন ফলস্টাফ। তবে বুদ্ধি দিয়ে এর মোকাবেলা করতে হবে, আইনের সাহায্যে নয়।
পাদরি জন ইভানস বললেন, হুজুর! আমার মাথায় একটা ভালো ফন্দি এসেছে। মাস্টার জর্জ পেজের মেয়ে অ্যানি বেসা আজকাল বেশ বড়োসড়ো হয়ে উঠেছে। ওর মতো সুন্দরী মেয়ে আর একটিও মিলবে না। আমাদের গ্রামে। মরার আগে ওর ঠাকুর্দা নাতনির জন্য নগদ সাতশো পাউন্ড টাকা আর একগাদা সোনা-রুপোর গয়না রেখে গেছেন। সে সব কিছুই অ্যানি তার বিয়েতে যৌতুক পাবে। এখন অ্যানিদের বাড়িতেই রয়েছেন স্যার জন ফলস্টাফ। আপনি সেখানে গেলেই তাকে পেয়ে যাবেন।
তই নাকি! তাহলে তো একবার যেতেই হয় সেখানে বলে জ্ঞাতিভাই স্লেন্ডার আর পাদরি স্যার ইভানসকে নিয়ে পেজের বাড়িতে এলেন বিচারপতি ফ্যালো। সে সময় ওখানেই ছিলেন স্যার ফলস্টাফ। বিচারপতি ফ্যালো তাকে বললেন, আপনি অন্যায়ভাবে আমার বাড়িতে ঢুকে আমার পালিত হরিণটাকে মেরে ফেলেছেন।
হ্যা, আমি আমার অপরাধ স্বীকার করছি, বললেন স্যার ফলস্টাফ, তবে আমি তো আর আপনার দারোয়ানের মেয়ের মুখে চুমো খেতে যাইনি?
দেখিছেন! আপনার অপদার্থ চাকারগুলো কী হাল করেছে আমার? কাদো কঁদো স্বরে বললেন স্লেন্ডার, ওরা আমায় শুড়িখানায় নিয়ে গিয়ে জোর করে মদ গিলিয়েছে। তারপর নেশা হলে আমার সব টাকা-কড়ি কেড়ে নিয়ে পালিয়ে গেছে।
পাদরি স্যার ইভানস বললেন, এসব ঘটনা আমি আমার ডাইরিতে নোট করে রাখছি। পরে বিচার করে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জর্জ পেজের যুবতি মেয়ে অ্যানি বেশ ডাগর-ডোগর দেখতে। সে ভালোবাসে ফেনটন নামে একটি ছেলেকে, আর ফেনটনও ভালোবাসে অ্যানিকে। বিয়ের স্বপ্নে বিভোর দু-জনে। কিন্তু অ্যানির বাবা মোটেও রাজি নন ফেনটনের সাথে তার মেয়ের বিয়ে দিতে। তিনি চান বিচারপতি ফ্যালোর জ্ঞাতিভাই স্লেন্ডারের সাথে অ্যানির বিয়ে দিতে। পেজ ভালোই জানেন স্লেন্ডার অ্যানিকে খুব পছন্দ করে। কিন্তু অ্যানি মোটেও পছন্দ করে না স্লেন্ডারকে। এদিকে অ্যানির মার পছন্দ আবার কেইয়াস নামে এর ফরাসি চিকিৎসককে–তারই সাথে তিনি মেয়ের বিয়ে দিতে চান। কেইয়াসও পছন্দ করে অ্যানিকে।
