কারাধ্যক্ষ চলে যাবার পর টিনের পেয়ালাটা পরিষ্কার করে তাতে নিজের মুখ দেখলাম। নিজের মুখাবয়ব ভীষণ সিরিয়াস মনে হচ্ছিল, এমনকি আমি যখন হাসবার চেষ্টা করলাম তখনও। বিভিন্ন কোণ থেকে পেয়ালাটা ধরে মুখ দেখলাম; কিন্তু বরাবরই সিরিয়াস বিষণ্ণ একটি চেহারা তাতে ফুটে উঠল।
সূর্য অস্ত যাচ্ছে, এবং এই সময়টার কথা না-বললেই ভালো সময়টার নাম দিয়েছিলাম আমি ‘নামহীন সময়,–এই সময় বন্দিশালার চারদিক থেকে শব্দগুলি যেন সতর্ক মিছিলের মতো উঠে আসত। খোলা জানালায় দাঁড়িয়ে দিনের শেষ আলোয় আবার নিজের মুখের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকালাম। আগের মতোই সিরিয়াস; অবশ্য আশ্চর্যের কিছু ছিল না, কারণ তখন আমি নিজেই সিরিয়াস ছিলাম। কিন্তু এই সময় এমন কিছু শুনলাম যা গত কয়েকমাস শুনিনি। একটি গলার স্বর; আমার নিজের, এতে আর কোনো ভুল ছিল না। বুঝতে পারলাম, গত কয়েকদিন ধরে এই স্বরধ্বনিই আমার কানে গুঞ্জন তুলেছে। তার মানে এ কয়দিন সারাক্ষণ আমি নিজের সঙ্গে কথা বলেছি।
এবং তখন আমার পুরনো একটি কথা মনে হল। মা’র অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় সেই নার্সটি মন্তব্যটি করেছিল। না, আর কোনো উপায় নেই এবং কেউ কল্পনাও করতে পারবে না বন্দিশালার বিকেলটা কেমন।
.
৩.
সব মিলিয়ে মাসগুলি যে তাড়াতাড়ি কেটে যায়নি এমন কথা বলতে পারি না; প্রথম গ্রীষ্ম পার হয়ে গেছে বোঝার আগেই আরেক গ্রীষ্ম এসে উপস্থিত। গ্রীষ্মের উষ্ণতা অনুভবের সঙ্গে সঙ্গে জানতে পারলাম, নতুন কিছু খবর অপেক্ষা করে আছে। আমার মামলা এ-সাইজ কোর্টে শেষ সেশনের জন্যে তৈরি হয়ে আছে যা আগামী জুনের কোনো-এক সময় শেষ হবে।
রৌদ্রোজ্জ্বল এক দিনে আমার বিচার শুরু হল। আমার উকিল জানালেন মামলাটা দুএকদিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে। বললেন তিনি, ‘যদ্দুর মনে হয় কোর্ট তোমার মামলা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিষ্পত্তি করে দেবে, কারণ গুরুত্বপূর্ণ মামলার তালিকায় এটা পড়ে না। এর ঠিক পরপরই আছে পিতৃহত্যা-সম্পর্কিত একটি মামলা যা শেষ হতে বেশকিছু সময় লাগবে।‘
সকাল সাড়ে সাতটায় তারা আমাকে নিতে এল এবং আসামিদের গাড়ি করে আমাদের ল’ কোর্টে নিয়ে যাওয়া হল। দুজন পুলিশ আমাকে নিয়ে এল অন্ধকারাচ্ছন্ন একটি ঘরে। দরজার পাশে বসলাম আমরা যা দিয়ে গলার স্বর, চিৎকার, চেয়ার টানার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। এ-সমস্ত আমাকে মনে করিয়ে দিল মফস্বলের কোনো পার্টির কথা যেখানে কনসার্ট শেষ হওয়ার পর নাচের জন্যে হল পরিষ্কার করা হয়। পুলিশদের একজন জানাল বিচারকরা তখনও এসে পৌঁছাননি। আমাকে একটি সিগারেট সাধল সে যা আমি প্রত্যাখ্যান করলাম। কিছুক্ষণ পর সে জিজ্ঞেস করল আমি নার্ভাস হয়ে পড়েছি কি না। আমি বললাম, ‘না। বরং আদালতে বিচার দেখা আমাকে আগ্রহান্বিত করে তুলেছিল; এর আগে কখনও আদালতের বিচার দেখিনি।’
‘হতে পারে’, বলল অন্যজন, ‘কিন্তু বিচারের দুএক ঘণ্টাই যথেষ্ট।‘
কিছুক্ষণ পর ঘরের মধ্যে একটি বৈদ্যুতিক ঘণ্টা বেজে উঠল। পুলিশ দুজন আমার হাতকড়া খুলে ঘরের দরজা খুলল এবং আমাকে আসামির কাঠগড়ায় নিয়ে গেল।
আদালত দর্শকে পূর্ণ। জানালার ঝিলমিলিগুলি নামিয়ে দেওয়া হয়েছে, তা সত্ত্বেও ফাঁকফোকর দিয়ে আলো ছিটকে আসছিল, এবং ইতোমধ্যে ঘরটি হয়ে উঠেছিল গরম। জানালাগুলি বন্ধ করে রাখা হয়েছে। আমি বসে পড়লাম এবং পুলিশ অফিসাররা আমার চেয়ারের দুপাশে তাদের জায়গায় দাঁড়াল।
আর ঠিক তখনই উলটোদিকে একসারি মুখ আমার নজরে পড়ল। লোকগুলি কঠোর দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে ছিল। তাতে মনে হল তারা বোধহয় জুরি। কিন্তু আলাদা আলাদা ব্যক্তি হিসেবে তাদের আমি দেখছিলাম না। ট্রামে উঠলে হঠাৎ যেমন মনে হয় বিপরীত সারির বসে-থাকা লোকগুলি বুঝি কাউকে দেখে হাসির খোরাক খুঁজছে, আমারও তেমন মনে হয়েছিল। অবশ্য জানতাম এটা। একটি অবিশ্বাস্য তুলনা। এই লোকগুলি আমার দিকে তাকিয়ে ছিল হাসির খোরাকের জন্যে নয়, বরং অপরাধের চিহ্নের জন্যে। তবুও তফাতটা খুব বেশি না, আমার অন্তত তা-ই মনে হয়েছিল।
দর্শক এবং বদ্ধ বাতাসের জন্যে কিছুটা অস্বস্তি লাগছিল। আদালতের চারদিকে চোখ বুলিয়েও আমি পরিচিত কারও মুখ খুঁজে পেলাম না। প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারছিলাম না যে এত লোক শুধু আমার জন্যেই এখানে এসেছে। সবার আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু আমি–এই অভিজ্ঞতাটা আমার জন্যে নতুন; কারণ অন্য সময় কেউ আমার দিকে ফিরেও তাকাত না। বামপাশের পুলিশটির দিকে তাকিয়ে মন্তব্য করলাম, ‘এত ভিড়!’ সে বললে, পত্রিকাগুলিই এর জন্যে দায়ী। জুরি-বক্সের ঠিক নিচে একদল লোককে দেখিয়ে সে বলল, ‘ঐ যে ওরা।’–কে?’ জিজ্ঞেস করলাম আমি, উত্তরে সে জানাল, ‘সাংবাদিক।‘ সে আরও জানাল তার একজন পুরনো বন্ধুও আছে তাদের মধ্যে।
কিছুক্ষণ পর পুলিশটির সেই পুরনো বন্ধু আমাদের দিকে এগিয়ে এল এবং পুলিশটির সঙ্গে করমর্দন করল। সাংবাদিকটি বেশ বয়স্ক, খানিকটা গম্ভীর, কিন্তু তার ব্যবহার বেশ অমায়িক। লক্ষ করলাম আদালতে সমবেত প্রায় সবাই একে অপরের সঙ্গে কুশলাদি বিনিময়ে ব্যস্ত দেখে মনে হচ্ছিল তারা যেন কোনো একটি ক্লাবে জমা হয়েছে যেখানে যে যার রুচিমতো দলবেঁধে গল্প করছে। তাই মনে হচ্ছিল যেন আমি এখানে অনাহূত। যাহোক, সাংবাদিকটি বেশ অমায়িকভাবে আমাকে সম্বোধন করে আশা প্রকাশ করলেন সবকিছু আমার পক্ষে যাবে। আমি তাকে ধন্যবাদ জানালাম, প্রত্যুত্তরে হাসিমুখে তিনি বললেন :
