দুজনে দুজনকে আমরা এত কিছু বলেছিলাম, এত অজস্র কথা, তার পুনরাবৃত্তি অসম্ভব; কিন্তু মন ভরে গিয়েছিল। গুপ্ত মহলে জীবনের সে এক পরম রমণীয় সন্ধ্যা। আমাদের মধ্যে কী কথা হয়েছিল, সংক্ষেপে তোমাকে বলব। প্রথমে তুলেছিলাম ঝগড়াঝাটির কথা এবং বলেছিলাম কেন এখন আমি সেটা অন্য চোখে দেখি; তারপর বলেছিলাম বাপ-মাদের সঙ্গে আমাদের পার্থক্যের কথা।
মা-মণি আর বাপি, মারগট আর আমার প্রসঙ্গে ওকে বলেছিলাম।
একটা সময়ে ও জিজ্ঞেস করেছিল, আমার ধারণা, তোমরা প্রত্যেকে প্রত্যেককে একটি করে শুভরাত্রির চুমো খাও, তাই না?
‘একটি করে বলো কী, এক ডজন করে। তোমরা চুমো খাও না?’
‘না, কাউকে আমি কখনও চুমো খাইনি বললেই হয়।’
‘তোমার জন্মদিনেও নয়?’
‘হ্যাঁ, তখন খেয়েছি।’
আমরা দুজনের কেউই আমাদের মা-বাবার কাছে আমাদের গোপন কথা বলি না; ওর মা-বাবার কাছে মন খুললে ওঁরা খুশিই হন, কিন্তু ওর কি রকম ইচ্ছে করে না। আমরা এই সব নিয়ে কথা বললাম। আমি কি রকম বিছানায় শুয়ে কেঁদে ভাসাই আর পেটার কি রকম মটকায় উঠে গিয়ে ঈশ্বরের নামে কসম খায়। মারগট আর আমি এই কিছুদিন হল পরষ্পরকে ভালো করে জানছি, কিন্তু তাও আমরা কেউ কাউকে সব কথা কি রকম বলতে পারি না, তার কারণ আমরা সর্বক্ষণ একসঙ্গে থাকি। কল্পনীয় সব বিষয়েই দেখি–আমি ঠিক যা ভেবেছিলাম পেটার অবিকল তাই।
এরপর ১৯৪২ সাল নিয়ে কথা হল। আমরা তখন কত আলাদা ধরনের ছিলাম। আমরা যে সেই লোক, এখন আর তা মনেই হয় না। গোড়ায় আমরা দুজনে কেউ কাউকে মোটেই দেখতে পারতাম না। পেটার ভাবত আমি বড় বেশি কথা বলি এবং অবাধ্য; আর আমি দুদিনেই বুঝে গেলাম ওকে দেবার মতন আমার সময় নেই। তখন বুঝিনি কেন ও আমার সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করে না; কিন্তু এখন আমি খুশি। পেটার কতটা আমাদের সকলের কাছ থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিল সেটারও সে উল্লেখ করল। আমি বললাম আমার হৈ-হল্লা আর ওর চুপ করে থাকার মধ্যে খুব একটা ফারাক ছিল না। আমি শান্ত চুপচাপ ভাবও পছন্দ করি এবং আমার ডায়রি ছাড়া আর কিছুই আমার একার নয়। পেটার খুব খুশি যে আমার মা বাবার সন্তানেরাও এখানে আছে এবং পেটার এখানে থাকায় আমি খুশি। এখন বুঝেছি কেন ও কথা কম বলে এবং মা-বাবার সঙ্গে ওর কী সম্পর্ক। ওকে সাহায্য করতে পারলে আমার খুবই ভালো লাগবে। এইসব ছিল আমাদের কথার প্রসঙ্গ।
পেটার বলল, ‘সব সময়ই তুমি আমাকে সাহায্য করো।’ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘কি রকম?’ ‘তোমার হাসিখুশি ভাব দিয়ে।‘ ওর এই কথাটা আমার সবচেয়ে মিষ্টি লেগেছে। কী ভালো, কী ভালো! ও নিশ্চয় এতদিনে আমাকে বন্ধুর মতন ভালবাসতে পারছে; আমার পক্ষে আপাতত তাই যথেষ্ট। আমি যে কত কৃতজ্ঞ, কত সুখী কী বলব। তুমি যেন কিছু মনে করো না, কিটি–আজ আমি যেখানে যে কথা বসাচ্ছি তাতে লেখার ঠিক মান বজায় থাকছে না।
আমার মাথায় যখন যা এসেছে আমি ঠিক সেইটুকুই কলমের মুখে ধরে দিয়েছি। আমি এখন অনুভব করছি, পেটার আর আমি, আমার একটি রহস্যের অংশীদার। হাসিতে ফেটে পড়া চোখে ও যদি চোরা চাহনিতে আমার দিকে তাকায় তাহলে সেটা হবে আমার বুকের মধ্যে খানিকটা দতি চলে যাওয়ার মতন। আমি আশা করি, এ জিনিস এই ভাবেই থেকে যাবে এবং মিলিতভাবে আমাদের দুজনের জীবনে এমন অসামান্য লগ্ন অনেক, অনেকবার দেখা দেবে।
তোমার আনা।
.
সোমবার, ২০ মার্চ, ১৯৪৪
আদরের কিটি,
আজ সকালে পেটার জিজ্ঞেস করেছিল আরেকদিন সন্ধ্যাবেলা আমি ওর কাছে যাব কিনা; বলেছিলাম আমি গেলে ওর কাজে কোনো ব্যাঘাত হবে কি না। বলেছিল, একজনের জায়গা হলে দুজনেরও ঠাঁই হবে। আমি বললাম, রোজ সন্ধ্যেয় আসতে পারব না, কেননা নিচের তুলার ওরা সেটা পছন্দ করবেন না। পেটারের কথা হল, ও নিয়ে আমি যেন মাথা না ঘামাই। তখন আমি বললাম একটা শনিবার দেখে আমি স্বচ্ছন্দে সন্ধ্যেবেলা আসতে পারি; আমি, ওকে বিশেষভাবে বলে দিলাম আকাশে চাঁদ থাকলে ও যেন আগে থেকে আমাকে হুঁশিয়ার করে দেয়। পেটার বলল, ‘আমরা তখন নিচে চলে গিয়ে সেখান থেকে চাঁদ দেখব।’
ইতিমধ্যে আমার সুখে একটা ছোট কাটা বিধেছে। আমি বহুদিন ভেবেছি মারগটেরও পেটারকে খুব ভালো লাগে। ওকে সে কতটা ভালবাসে জানি না, তবে আমার মনে হয় তেমন কিছু নয়। পেটার আর আমি যখনই একত্র হই, ওর বুকে নিশ্চয় খুব বাজে। এর মধ্যে হাস্যকর ব্যাপার হল এই যে, ও সেটা প্রায়ই চেপে রাখে।
আমি হলে, এটা ঠিক, হিংসেয় মরে যেতাম, কিন্তু মারগট শুধু বলে আমার ওকে করুণা করার কোনো প্রয়োজন নেই।
আরও বললাম, ‘মাঝে থেকে তুমি বাদ পড়ে গেলে, এটা ভেবে খুব খারাপ লাগছে।’ খানিকটা তিক্ততার সঙ্গে মারগট বলল, ‘ওতে আমি অভ্যস্ত।‘
এখনও এই কথা পেটারকে বলতে আমার সাহস হয় না, হয়ত পরে বলব। তবে তার আগে বিস্তর জিনিস নিয়ে দুজনে কথা বলতে হবে।
কাল সন্ধ্যেবেলা মা-মনি উচিত মতই আমাকে কিছুটা ভেটেছেন; ওঁর প্রতি উদাসীনতা দেখাতে দিয়ে আমার অতটা বাড়াবাড়ি করা ঠিক নয়। আমাকে আবার ভাঙা ভাব জোড়া লাগাবার চেষ্টা করতে হবে এবং যখন যা মনে হবে ফট করে তা বলা চলবে না।
এমন কি পিমও ইদানীং আর আগের মতো নেই। আমি কচি খুকি নই–আমার প্রতি উনি ব্যবহার করছেন সেইমত। ফলে, ওঁর মধ্যে একটা ছাড়া-ছাড়া ভাব। কোথাকার পানি কোথায় গড়ায় দেখা যাক।
