-হ্যাঁ, এবার আমি একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারছি। তার মানে? ওই ভদ্রমহিলা কিমানো পরেছিলেন কেন? তিনি তার নতুন পোশাকটা পরার চেষ্টা করছিলেন। তার জন্য তিনি সামনের ঘরে চলে গিয়েছিলেন। মিস পলিট তখন কী করছিলেন? মিস পলিট বোধ হয় ব্যস্ত ছিলেন তাঁর কাজে। আর তিনি সামান্য অসতর্কতার মুহূর্তে ভদ্র মহিলার গলায় টেপ পেঁচিয়ে দিয়েছিলেন। কেন একাজটা তিনি করেছিলেন? হা, এই হত্যাকাণ্ড করা হয়েছে গলায় টেপ পেঁচিয়ে দিয়ে। তারপর? আবার অতি দ্রুত মিস পলিট বাইরে বেরিয়ে যান। দরজা বন্ধ করে দেন। তারপর? সামনে দাঁড়িয়ে বারবার দরজায় বেল বাজাতে থাকেন। এর অর্থ কী? এর অর্থ তিনি সকলকে বোঝাতে চেয়েছিলেন, তিনি বোধহয় তখনই ওখানে এসেছেন। কিন্তু ওই পিনই তার সর্বনাশের প্রহর ঘনিয়ে এনেছে। ওই পিনই বলে দিয়েছে আগেই তিনি ঘরের মধ্যে ঢুকেছিলেন, বাকিটুকু সবটাই তার অভিনয়।
তার মানে? মিস পলিট শ্রীমতী স্পিনলোকে খুন করেছিল, তাই তো?
–হ্যাঁ, পোস্ট অফিস থেকে ফোনটা করা হয়। দুটো বেজে তিরিশ মিনিটের সময়, তখন বাসটা আসে এবং কিছুক্ষণের জন্য পোস্ট অফিস ফাঁকা হয়ে যায়, তখন মিস পলিট এই সুযোগটাই গ্রহণ করেছিলেন।
কর্নেল মেলচেট বললেন–কিন্তু মিস মার্পল কেন? কেন এমন একটা হত্যার সঙ্গে মিস পলিট নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছিলেন? আমরা জানি যে কোনো হত্যার অন্তরালে একটা সুনির্দিষ্ট উদ্দেশ্য থাকে। যাকে আমরা মোটিভ বলে থাকি। এক্ষেত্রে মোটিভটা কী, সেটাই তো আমার বোধগম্য হচ্ছে না।
আচ্ছা, আমি সব কিছু বুঝিয়ে বলছি। কর্নেল মেলচেট, আপনি কি বুঝতে পারছেন, এই হত্যার পরিকল্পনাটা অনেক বছর আগে করা হয়েছে। আপনি কি আমার দুজন ভাইয়ের গল্প শুনবেন? আমার নিজের ভাই নয়, তুতো ভাই। কিন্তু মনে হচ্ছে এই গল্পটা আপনার শুনে রাখা দরকার। তাদের নাম হল অ্যান্টনি আর গর্ডন। অ্যান্টনি যা কিছু করত সেটাকে সঠিক বলে মনে করত। হতভাগ্য গর্ডন কিন্তু কোনো ব্যাপারে তার সঙ্গে একমত হতে পারত না। এইভাবে তাদের মধ্যে একটা ঝগড়ার পরিবেশের সৃষ্টি হয়। আর এক্ষেত্রে কী হয়েছে? এক্ষেত্রে দুই মহিলা একে অন্যের বিপরীতে চলতে গিয়ে এমন একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি করে, যার ফলে দুজনকে প্রাণ দিতে হয়।
কর্নেল মার্পলের কথাবার্তা কিছুই বুঝতে পারছেন না। তিনি প্রশ্নবোধক চোখে তাকিয়ে থাকলেন মিস মার্পলের দিকে। তারপর বললেন–আপনি কি অনুগ্রহ করে আমাকে সব বুঝিয়ে বলবেন?
–ওই ডাকাতির ঘটনাটা একবার ভাবুন তো। কত দামী মরকত মণি চুরি হয়ে গিয়েছিল, অন্তত আমি যা শুনেছি। এই ঘটনার সাথে দুজন মহিলার নাম জড়িয়ে যায়, একজন হল ওই ভদ্রমহিলার পরিচারিকা, আর একজন অচেনা মহিলা। একটি ব্যাপার কিন্তু এখনও পর্যন্ত অমীমাংসিত থেকে গেছে, যখন ওই মেয়েটি উদ্যান পরিচালককে বিয়ে করে তখন তার হাতে কি এত অর্থ ছিল, যা দিয়ে সে একটা ফুলের দোকান তৈরি করতে পারে? এই সমস্যার সমাধান হল ডাকাতির একটা ভালো অংশ সে পেয়েছিল। এটাই হল একটা সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত। আপনি তো জানেন, টাকায় টাকা বাঁধে। কিন্তু ওই বেচারি পরিচারিকা? তার কী হল? সে কি চিরদিন দুর্ভাগ্যকে সাথী করে দিন কাটাবে? সে একটা গ্রামে এসে সাধারণ পোশাক সরবরাহকারীর পেশা গ্রহণ করল। অনেক বছর পরে তাদের মধ্যে আবার দেখা হয়। আমার মনে এক্ষেত্রে টেড গের্যান্টের কিছু ইতিবাচক ভূমিকা আছে।
..মিসেস স্পিনলো সব সময় বিবেকের দংশনে ভুগতেন, তিনি অত্যন্ত আধ্যাত্মিক স্বভাবের মহিলা ছিলেন। আর ওই ভদ্রলোক যখন তাঁর জীবনে নতুন বার্তা নিয়ে এল, তখন তিনি আপনার সামনে দাঁড়িয়ে ভয় পেয়ে গেলেন। তিনি হয়তো সব কথা খুলে বলার জন্য ব্যগ্র হয়ে উঠেছিলেন। আবার মিস পলিটের ক্ষেত্রে ঘটনাটা একেবারে অন্যভাবে ঘটে যায়। পলিট বুঝতে পারছিল যদি মিসেস স্পিনলো বেঁচে থাকেন তাহলে একদিন হয়তো ডাকাতির অপরাধে তাঁকেই দোষী সাব্যস্ত করা হবে। শেষ পর্যন্ত তার দিন কাটবে রুদ্ধ কারার অন্তরালে। অনেক বছর আগে ঘটে যাওয়া একটা মারাত্মক ঘটনার ফল তাকে এই ভাবেই ভোগ করতে হবে। অথচ মিসেস স্পিনলোকে কেউ সন্দেহ পর্যন্ত করতে পারবে না। এই সমস্যার সমাধান কী ভাবে হতে পারে? অনেক দিন বেচারী পলিট নিজের বিবেকের সঙ্গে লড়াই করেছে, শেষ পর্যন্ত সে একটার ভয়ঙ্কর সিদ্ধান্তে এসে পৌঁছে গেল। যে করেই হোক মিসেস স্পিনলোকে পৃথিবী থেকে সরাতেই হবে। মাঝে মাঝে মানুষ আবেগ দ্বারা তাড়িত হয়ে কত অসম্ভব কাজ যে করে ফেলে, এছাড়া মিস পলিটকে যতটুকু দেখেছি, সে কিন্তু অত্যন্ত শয়তানি মনোভাবের মেয়ে। সে-ই এই বুদ্ধিটা করে, যাতে মিস্টার স্পিনলোকে ফাঁসিকাঠে ঝুলতে হয়, তাহলে হয়তো তার দুটো উদ্দেশ্য সফল হবে।
কর্নেল মেলচেট আমতা আমতা করে বলতে থাকেন–আপনার এই তথ্যটাকে আমি একেবারে খারিজ করতে পারছি না। কিন্তু কি সত্যি সত্যি অ্যাবারক্রমগাই এর পরিচারিকা? এ ব্যাপারে আপনি একশো ভাগ নিঃসন্দেহ?
এবার মিস মার্পলের ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি দেখা গেল। তিনি আশ্বস্ত সুরে বললেন–আমার অনুসন্ধানের কাজে কখনো কোনো ভুল হয় না, কর্নেল। আমি যখন যে কথা বলি, অনেক ভেবে চিন্তেই বলি। তাহলে কী হল? তাহলে দেখা গেল সত্য একদিন প্রকাশিত হবেই। এছাড়া আমি ওই টেপটার মাটা নিয়েছি, গতকালই আমি এটা করেছি। দেখা গেল, পুলিশ এদিকে নজর দেয়নি, আসলে পুলিশ বুঝতেই পারেনি যে, এখন থেকে হত্যার বিষ তীর ছুটে আসতে পারে। আমার মনে হয় আপনি ব্যাপারটা এই ভাবে সাজিয়ে নিন। তাহলে এই কেস-এ আপনি জিতে যাবেন।
