–হয়তো আপনার মুখ থেকে ছুটে আসা প্রতিটি শব্দ সঠিক, কিন্তু আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য আপনি কী বলবেন? আপনার হাতে কোনো অস্ত্র আছে কি?
মিস্টার স্পিনলো এবার উঠে দাঁড়ালেন। তারপর বললেন–আমার প্রিয় মহাশয়া, অনেক বছর আগে আমি এক চীনা দার্শনিকের কথা শুনেছিলাম। যিনি তাঁর স্ত্রীকে অত্যন্ত ভালোবাসতেন। তখনকার দিনের নিয়মানুসারে সেই মহিলাটিকে রাস্তায় নিয়ে যাওয়া হয়। তাকে নানাভাবে আহত এবং আক্রান্ত করা হয়। যেটা ছিল চীনা সমাজের এক বিকৃত উল্লাস, আমি জানি, তখন তার মনের ভেতর কী ভাবনার অনুরণন ধ্বনিত হয়েছিল। এক্ষেত্রে আমার মনও একই ভাবনায় প্লাবিত হয়েছে। আমি কী ভাবে আমার মনোভাব প্রকাশ করব?
মিস মার্পল তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন মিস্টার স্পিনলোর দিকে। তারপর বললেন সেন্ট ম্যারিমেড-এর মানুষরা কিন্তু আপনার এসব তত্ত্ব কথায় বিশ্বাস করবে না। তাদের কাছে চীনা দার্শনিক তত্ত্বের কোনো মূল্য নেই।
-কিন্তু আপনি কি আমার কথা বুঝতে পারছেন?
মিস মার্পল এবার বললেন–আঙ্কেল হেনরি এই ধরনের মানুষরা আবেগ এবং অনুভূতিকে সংযত রাখতে পারে না। মাইকেল হেনরির উদ্দেশ্য কী ছিল? কখনো সর্বজন সমক্ষ্যে আবেগ দেখাবে না। ওই ভদ্রলোক কিন্তু ফুল ভালোবাসতেন।
এবার মিস্টার স্পিনলো বললেন–আমি একটা অন্য জিনিস ভাবছি, আপনার কথা বলার মধ্যে এক ধরনের ঔৎসুক্য ফুটে উঠেছে। আমি বাগানের এককোণে একটি সুন্দর পুরু বাগিচা তৈরি করেছি। একেবারে পশ্চিমদিকে। সেখানে গোলাপি গোলাপেরা সুবাস ছড়ায়। উসটোরি ফুলও আছে। এছাড়া একটি তারার মতো দেখতে সাদা ফুলও আছে, যার নাম এই মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে না।
ওই ভদ্রলোক খুব আস্তে আস্তে কথা বলছেন, তখনই মিস মার্পল বলছেন-এই তো, এখানে যে তালিকা আছে, সেখানে ফুলের নাম ও ছবি আছে। আপনি হয়তো এই ধরনের ফুলের কথা বলতে চাইছেন। এমন ফুল গ্রামে অনেক দেখতে পাওয়া যায়।
মিস্টার স্পিনলো ওখানে বসে থাকলেন, তার কোলের ওপর ক্যাটালগ। মিস মার্পল তার ঘরের ভেতর চলে গেলেন, একটি বাদামি কাগজে কোনো একটি পোশাক তুলে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। তাকে এখন অতি দ্রুত পোস্ট অফিসে যেতে হবে। ড্রেস মেকার মিস্ পলিট ওই পোস্ট অফিসের পাশের ঘরেই বসবাস করেন।
মিস মার্পল সোজা ওপরের সিঁড়ি ধরে উঠে গেলেন। দুটো বেজে তিরিশ মিনিট, এক মুহূর্ত দেরি হয়েছে, মাচঝেহেমের বাস পোস্ট অফিসের দরজার সামনে এসে থামল। সেন্ট মেরিমেড-এর দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় এটা একটা মনে রাখার মতো ঘটনা। পোস্ট-মিস্ট্রেস পার্শেল নিয়ে বেরিয়ে এলেন। পার্শেলটা এখনই বিলি করতে হবে। পোস্ট অফিস যে শুধুমাত্র ডাক বিলি করে তা না, এখান থেকে সন্দেশ পাওয়া যায়, ছোটোদের খেলনা বাটি আর সস্তা দামের বই পত্র।
কিছুক্ষণের জন্য অন্তত চার মিনিট মিস মার্পল পোস্ট অফিসে একলা ছিলেন।
পোস্ট-মিস্ট্রেস ফিরে আসার পর্যন্ত মিস মার্পল সেখানেই থাকলেন। তিনি সিঁড়ি ধরে ওপরতলায় গিয়ে মিস পলিটের কাছে সব কথা খুলে বললেন। তাকে একটা পুরোনো ধূসর রঙের ক্রেপের কাপড় দিতে হবে। আরও কিছু, মিস পলিট সব কিছু দেবার প্রতিশ্রুতি দিলেন।
.
০৫.
মিস মার্পলের নাম শুনে চিফ কনস্টেবল একটুখানি অবাক হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি এসে নানা ধরনের ক্ষমা প্রার্থনা করে বললেন–খুব দুঃখিত, আপনাকে এভাবে বিরক্ত করতে হচ্ছে বলে। আমি আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করছি। আপনাকে অত্যন্ত ব্যস্ত মুহূর্ত কাটাতে হয়। কর্নেল মেলচেট আশা করি আপনি আমার ধৃষ্টতা ক্ষমা করবেন। আমার মনে হচ্ছে ইন্সপেক্টার প্যাট না হয়ে আপনি আমার সঙ্গে কথা বলতেন তা হলে রহস্যের সমাধানটা এতদিনে হয়ে যেত। একটা বিষয় আপনাকে আমি খুলে বলছি। কনস্টেবল পলককে বলবেন, সে যেন সাহায্য করে। সত্যি কথা বলতে কী কনস্টেবল পলকের সাক্ষ্য এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য হতে পারে।
এসব কথা শুনে কর্নেল মেলচেট কেমন যেন হয়ে গেলেন। তিনি বললেন–পলক? সেন্ট ম্যারিমেড-এর কনস্টেবল? এই সমস্যা সমাধানের ব্যাপারে তার কাছে যেতে হবে। নাকি?
–ওই ভদ্রলোক একটা পিন তুলে নিয়েছিলেন, আপনি কি তা জানেন? এটা ছিল টিউনিকের সঙ্গে লাগানো। আমার মনে হয় এই পিনটা বোধহয় পাওয়া গেল মৃতা স্পিনলোর বাড়ি থেকে।
শান্ত হোন, শান্ত হোন। ঠিক করে বলুন তো, এই পিনটা নিয়ে এত চিন্তা করার কি আছে? মিসেস স্পিনসোর মৃতদেহের কাছে এই পিনটা ছিল, তাই তো? প্যাট তো এই কথাটা গতকাল আমাকে জানিয়েছিল, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। না, কোনো বস্তু তো সরানো হয়নি। ব্যাপারটা নিয়ে এত মাথা ঘামাবার কিছু আছে কি? এতো একটি অত্যন্ত সাধারণ পিন, এইদিন মেয়েরা যা সচরাচর ব্যবহার করে থাকে।
-না না কর্নেল মেলচেট, এখানেই কোথাও বোধহয় আপনার ভুল হচ্ছে। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির তফাতে অনেক বস্তু তার বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেলে। একজন সাধারণ পুরুষের চোখে যাকে অতি সাধারণ পিন বলে মনে হচ্ছে, এটা কিন্তু তা না। এটা এক বিশেষ ধরনের পিন, অত্যন্ত পাতলা, যেটাকে আমরা ব্যবহার করে থাকি কোনো পোশাক পরিচ্ছদ পরার জন্য। ড্রেসমেকাররা সচরাচর যে পিন ব্যবহার করে যাবে।
মেলচেট এবার অবাক চোখে মিস মার্পলের দিকে তাকালেন। তিনি কি সমস্যার গভীরে প্রবেশ করতে পারছেন? মিস মার্পল অধৈর্য হয়ে বার বার তার মাথা নাড়লেন।
