নিঃশ্বাস নেবার জন্য মিস মার্পল কিছুক্ষণের জন্য বিরতি দিলেন। তারপর আবার গড়গড়িয়ে বলতে শুরু করলেন–তাদের মধ্যে অন্য কোনো ঘটনা ঘটেছিল কিনা সেটা আমি ঠিক বলতে পারব না। তবে আমার মন এত নীচ নয় যে, আমি পুরুষ এবং নারীর মধ্যে কোনো সহজ-সরল সম্পর্ক মেনে নেব না। তবুও আমার মনে হয় কোথায় যেন একটা ছোট গোলমাল হয়ে যাচ্ছে। যে গোলমালের কেন্দ্রে পৌঁছোতে না পারলে এই রহস্যের সমাধান করা কখনোই সম্ভব হবে না। অনেকেই বলে থাকে, মিসেস স্পিনলো নাকি ওই অল্পবয়সী ছেলেটির দ্বারা বিশেষ ভাবে আকর্ষিতা হয়েছিলেন। শুধু তাই না, তিনি ওই ছেলেটিকে বেশ কিছু টাকা ধার হিসেবে দিয়েছিলেন। এই ঘটনার মধ্যে কতটা সত্যি লুকিয়ে আছে তা আমি জানি না। কিন্তু ওই ছেলেটিকে সেদিন স্টেশনে দেখা গিয়েছিল। দুটো সাতাশ মিনিটে ডাউন ট্রেনে সে চড়ে বসেছিল। থাকতেই পারে। কিন্তু তার আচরণের মধ্যে কিছু কিছু অস্বাভাবিকতা চোখে পড়েছে। ট্রেন যখন ছুটে চলেছে, তখন ছেলেটি কোথায় গেল? সে কি ট্রেনের কামরার মধ্যে দিয়ে অন্য দিকে চলে যায়? তারপর বাঁশের বেড়া পার হয়ে কাটাঝোপকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যায় স্টেশনের প্রবেশ পথের দিকে। তাকে কিন্তু কটেজের চারপাশে আর দেখতে পাওয়া যায়নি। আর একটা বিষয়ের কথাও আপনাকে মনে রাখতে হবে, তা হল মিসেস স্পিনলো কোনো পোশাক পরিধান করেছিলেন? সেই পোশাকের মধ্যে কোনো অস্বাভাবিকতা আছে বলে আপনার কি মনে হয়?
–আমি তো এ ব্যাপারটা কখনো ভেবে দেখিনি, এ প্রশ্নটা আপনি কেন করছেন?
মিস মার্পল বলে উঠলেন–উনি একটা কিমোনো পরে ছিলেন, কোনো সাধারণ পোশাক নয়। কিমোননা কিন্তু কোনো কোনো মানুষের কাছে বিশেষ অর্থ বহন করে।
–আপনি কি তাই মনে করছেন?
-না, আমি ঠিক সেভাবে বলতে চাইছি না। আমি বলতে চাইছি, এর মধ্যে একটা অস্বাভাবিকতা লুকিয়ে আছে।
–আপনি কি এটাকে স্বাভাবিক বলে মনে করছেন?
মিস মার্পলের চোখ দুটি জ্বলে উঠল। এখনও সেখানে বজায় আছে শৈত্য ভাব এবং প্রতিফলনের ক্ষমতা। তিনি বলে উঠলেন–হ্যাঁ, কোনো কোন ক্ষেত্রে এটাকে সাধারণ ভাবে দেখা উচিত।
এবার ইন্সপেক্টার প্যাট মন্তব্য করলেন–তাহলে? ওনার স্বামীর বিরুদ্ধে আরেকটা অপরাধ-তত্ত্ব খাড়া করা যেতে পারে সেটা হল প্রচণ্ড হিংসা।
-না না, এখানে আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে, মিস্টার। আমার মনে হয় মিস্টার স্পিনলো কখনোই স্ত্রীকে হিংসা করতেন না। তিনি এসব ছোটোখাটো ব্যাপারে মাথা ঘামাতেন বলে আমার মনে হয় না। যতটুকু আমি তাকে দেখেছি, তার ভিত্তিতেই এ কথা বলছি। যদি ওনার বউ বাইরে চলে যায় এবং লণ্ঠনের ওপর একটা চিরকূট রেখে যান, তাহলেও কিন্তু উনি কিছু মনে করবেন না। ওনার স্বভাবটা এমন নয় বলেই আমার বিশ্বাস।
মিস মার্পল সন্দেহ ভরা দৃষ্টিতে ইন্সপেক্টার প্যাটের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। প্যাট একটু বিব্রত বোধ করলেন। এই মুহূর্তে প্যাটের মন থেকে ভাবনারা দূরে কোথায় হারিয়ে গেছে। মিস মার্পলের কথার বিরুদ্ধে যাবার মতো সাহস এবং শক্তি তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। শেষ অব্দি মিস মার্পল জোরের সঙ্গে বললেন-ইন্সপেক্টার স্পটে গিয়ে আপনি কি কোনো সূত্র খুঁজে পেয়েছিলেন? নাকি অন্ধকারে হাতড়েছেন?
–মিস মার্পল, এখনকার দিনে কেউ আর আঙুলের ছাপ কিংবা সিগারেটের ছাই রাখে না অনুসন্ধানের জন্য। এখন ব্যাপারটা একেবারে পাল্টে গেছে।
-কিন্তু আমার মনে হচ্ছে এটা বোধহয় একটা পুরোনো ধরনের অপরাধ।
–প্যাট সঙ্গে সঙ্গে বললেন–এ কথার অর্থ কী? আমি তো ঠিক বুঝতে পারছি না।
মিস মার্পল শান্তভাবে জবাব দিলেন–আপনি কি কনস্টেবল পলকের সঙ্গে কথা বলেছেন? আমার মনে হয় এই ব্যাপারে কনস্টেবল আপনাকে যথেষ্ট সাহায্য করতে পারবেন। তিনিই কিন্তু প্রথম এই অপরাধটা দেখেছেন, তাই তার জবানবন্দির একটা আলাদা দাম আছে বৈকি।
.
০৪.
ডেক চেয়ারের ওপর বসে আছেন মিস্টার স্পিনলো। তাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি বোধ হয় জগৎ সংসার থেকে দূরে কোথাও হারিয়ে গেছেন। তিনি ঠাণ্ডা শান্ত স্বরে বলছেন–আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, কীভাবে ঘটনাটা ঘটেছে। আমার শ্রবণ শক্তি খুব একটা প্রখর না, অনেক শব্দ আমি ঠিক মতো শুনতে পাই না। কিন্তু আমার মনে হল একটি অল্প বয়সী ছেলে আমাকে ডেকে বলেছিল-ক্লিসেন্ট কার নাম? তার গলার শব্দ শুনে আমি ভেবেছি সে হয়তো কাউকে খুঁজছে, কিন্তু আমি, আমি ভাবতেই পারিনি যে, আমার প্রিয় সহধর্মিনী আর বেঁচে নেই। আমি, আমি কী করে তাকে জগৎ থেকে হারিয়ে ফেললাম।
মিস মার্পল একটি মৃত গোলাপের পাপড়ির দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন-তার মানে ওই ছেলেটি কি আপনাকে কোনো খবর দিতে এসেছিল? এই ব্যাপারে আমি একেবারে সুনিশ্চিত।
কিন্তু একটি বালকের মাথার ভেতর থেকে এমন বুদ্ধি আসবে কি? আমি তো কিছুই মাথা মুণ্ডু বুঝতে পারছি না।
মিস মার্পল বললেন–হ্যাঁ, এখন দেখা যাক বড়োরা কী কথা বলতে পারে?
তার মানে? অন্য অনেকের মনেও একই ভাবনা ঘুরপাক খেয়েছে?
–সেন্ট ম্যারিমেড-এর বাসিন্দাদের মধ্যে অর্ধেকজনই এই ভাবনাটায় একেবারে আপ্লুত হয়ে গেছে।
-কেন, কেন বলুন তো? এই ধরনের একটা ভাবনা কেন ভাবনায় এসেছে? আমাকে সবাই দোষী সাব্যস্ত করতে চাইছে কেন? আমি করেছি? আমি যে আমার স্ত্রীকে কতখানি ভালোবাসতাম তাতো সকলেই জানেন। আহা, আমি ভাবতেই পারছি না এখন আমার জীবন কীভাবে কাটবে? আসলে তার জন্য আমি শহর ছেড়ে গ্রামে বসবাস করতে শুরু করি। আমি ভেবেছিলাম এখানে আমাদের দিনগুলো ভালোভাবেই কেটে যাবে। হয়তো কোনো কোনো ব্যাপারে আমাদের মধ্যে সামান্য মতপার্থক্য দেখা দিয়েছে, সেটাই স্বাভাবিক, তার জন্য আমি কখনো তাকে দোষারোপ পর্যন্ত করিনি। এই শূন্যতা আমি সামাল দেব কী করে?
