-আপনি কি বুঝতে পারছেন, আপনার কথার অন্তরালে কী অর্থ লুকিয়ে আছে? আপনি কী সাহায্য আমার কাছ থেকে পেতে চাইছেন তা একবার খুলে বলবেন কী? আপনি কি সত্যিটার সন্ধানে আমার কাছে এসেছেন?
-হ্যাঁ, তা হতে পারে।
-তাহলে শুনুন, এব্যাপারে কথা বলার প্রয়োজনীয়তা আছে বলে আমি মনে করছি। অবশ্য এক্ষেত্রে কিছুটা অনুমান শক্তির কথাও বলতে হবে। এখানে কি দুটো আলাদা শিবির হয়ে গেছে? আপনি কি আমার কথার অন্তরালে লুকিয়ে থাকা অর্থ বুঝতে পারছেন? আসুন, আমি সূত্রটা ধরিয়ে দিই। কিছু কিছু মানুষের দৃঢ় বিশ্বাস জেগেছে যে, ওর স্বামীটাই আসল খুনি, তিনি বোধহয় এইভাবে নিজেকে চাপা দেবার চেষ্টা করছেন। আসলে যখনই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে একজনের মৃত্যু হয়, তখন যে বেঁচে থাকে তার ওপর আমরা জোর করে অভিযোগের দায়ভার চাপিয়ে দিই। আপনার মনেও কি ধারণা তাই নয়?
–হতে পারে, প্যাট নিজের মনোভাব গোপন রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করলেন।
-তাহলে? আমি কি ঠিক বলিনি? সবক্ষেত্র থেকেই সন্দেহটা মিস্টার স্পিনলোর ওপর পড়তে পারে। আমি শুনেছি মিসেস স্পিনলো নাকি অঢেল অর্থের অধিকারিনী ছিলেন। তাঁর মৃত্যু হলে সমস্ত অর্থ মিস্টার স্পিনলো পাবেন।
-এটাই তো আমরা জানি, এ ক্ষেত্রে আমাদের মনে কোন সন্দেহ হয়? অর্থের লোভে স্বামী স্ত্রীকে মেরে ফেলেছেন তাইতো? আমি কিন্তু এই ব্যাপারটার সাথে একদম একমত হতে পারছি না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায় একেবারে শেষ মুহূর্তে আমাদের অনুমান ধারণা সবকিছু ভেঙে ধূলিসাৎ হয়ে যাচ্ছে।
-হ্যাঁ, আপনি ঠিকই বলেছেন, ম্যাডাম, স্ত্রীর মৃত্যুর ফলে হঠাৎ ভদ্রলোক বিপুল সম্পত্তির অধিকারী হয়ে গেছেন।
আর তার জন্য কি তাকে দোষী সাব্যস্ত করা যায়? ব্যাপারটার মধ্যে একটুখানি অবিশ্বাস্য আছে একথা আমি অস্বীকার করতে পারছি না। কিন্তু শুধু টাকার জন্য একজন পুরুষ মিছিমিছি তার স্ত্রীকে হত্যা করবেন কেন? আমার তো মনে হয় এর অন্তরালে অন্য একটা ব্যাপার লুকিয়ে আছে, কতকগুলো বিষয় অবশ্য আমি গোপন করতে পারছি না। যেমন, তিনি কেন মিথ্যে করে বললেন যে, আমার কাছ থেকে টেলিফোনের খবর পেয়ে তিনি ছুটে এসেছিলেন? তারপর ফিরে গিয়ে দেখেন যে, তার স্ত্রী মৃত অবস্থায় পড়ে আছেন। অর্থাৎ এই হত্যার ঘটনাটা ঘটেছে যখন তিনি বাড়িতে ছিলেন না, তার মানে? তার মানে কি কোনো অচেনা অজানা আগন্তুক এসে এই হত্যাকাণ্ডটা ঘটিয়েছে? এটা কি কোনো ছিঁচকে চোরের কাজ? হয়তো শ্ৰীমতী বাধা দেবার চেষ্টা করেছিলেন। ছিঁচকে চোর তার পাপের কোনো সাক্ষী রাখতে চায়নি।
ইন্সপেক্টার মাথা নাড়লেন–আপনি কি একবার টাকা পয়সার লেনদেনের কথাটা ভাববেন না? আমরা শুনেছি ইদানীং স্বামী স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা ছিল না। পাড়া প্রতিবেশীরা মাঝে মধ্যেই তাদের চিৎকার শুনতে পেতেন।
মিস মার্পল এই কথা শেষ করতে না দিয়ে বললেন–এটা স্বামী স্ত্রীর মধ্যে অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা।
–তাহলে আপনি কী অনুমান করেন?
–না, সকলে যা ভাবছে আমি কিন্তু তা ভাবছি না। কী বিষয় নিয়ে তাদের ঝগড়া হত সে ব্যাপারটা একবার ভেবে দেখেছেন কি? আমার মনে হয় ওই পরিচারিকা গ্রাইট বেন্টের ওপর নজর রাখা দরকার। এই বেন্টের মারফতই তো খবরগুলো বাইরে চলে গেছে, তাই নয় কি?
এবার ইন্সপেক্টারের কণ্ঠস্বরের ভেতর কেমন একটা মলিনতা জেগেছে। ইন্সপেক্টার আমতা আমতা করে বলতে চেষ্টা করলেন–আসলে হয়তো এই কাজের মেয়েটি সব খবর জানে না। নেহাত উত্তেজনার বসে সে কিছু গুজব ছড়িয়েছে।
শুকনো ঠোঁটের কোণে হাসির চিহ্ন আঁকবার আপ্রাণ চেষ্টা করলেন তিনি। শেষ পর্যন্ত পারলেন না।
মিস মার্পল তখন গড়গড়িয়ে বলে চলেছেন–এখানে অবশ্য আর একটা দল গড়ে উঠেছে, এবার টেড গোর্যান্টের কথা বলি, টেড গোর্যান্ট হল এক সুপুরুষ সুদর্শন যুবক। আমার মনে হয় রূপের সাহায্যে মানুষ অনেকের মন ভোলাতে পারে। টেডের ক্ষেত্রে কি তেমনই ঘটনা ঘটে গিয়েছিল? যে সমস্ত মেয়েরা চার্চে আসত, বিকেলে অথবা সকালবেলা, তাদের অনেকের সাথেই আমি কথা বলেছি। শুধু কী তাই? দেখা গেল মধ্যবয়সিনী মেয়েরাও চার্চের কাজে আরও বেশি মাত্রায় যোগ দিতে আসছে। তারা সঙ্গে আনছে টেডের জন্য ক্লিপার এবং স্কার্ট। এই ব্যাপারটা ওই মানুষটির মাথা ঘুরিয়ে দেবার পক্ষে যথেষ্ট নয় কি?
…কিছু দেখা যাক, এর মধ্যে কোনো সন্দেহ বা সম্ভাবনা লুকিয়ে আছে। আবার আমি টেড গোর্যান্টের কথা বলব। কেন টেড গোর্যান্টের নাম বারবার উচ্চারণ করছি বলুন তো? আসলে টেড গোর্যান্টে তো মাঝে মধ্যেই মিসেস স্পিনোর সঙ্গে দেখা করতে আসত, সেই খবরটা কি আপনার জানা আছে? মিসেস স্পিনলো কথা প্রসঙ্গে আমাকে একবার বলেছিলেন যে, তিনি অক্সফোর্ড গ্রুপের মধ্যে ঢুকে গেছেন। আসলে এখানে এক একটা ছোটো ছোটো গ্রুপ তৈরি হয়েছে। এক সময় অক্সফোর্ড গ্রুপ নামে একটি ধার্মিক আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিল, আমি ব্যক্তিগত ভাবে মনে করি এই মতবাদে যাঁরা বিশ্বাস করেন তারা সকলেই নিজস্ব কর্ম সম্পর্কে অত্যন্ত সচেতন এবং প্রাণপণ চেষ্টায় কাজটা শেষ করার কথা ভাবেন। আমার মনে হয় মিসেস স্পিনো বোধ হয় ওই ছেলেটির কথাবার্তা শুনে কিছুমাত্রায় তার প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়েছিলেন।
