মস্ত বড়ো একটি বাড়িতে শ্রীমতী স্পিনলো একজন সাহায্যকারিনী হিসাবে জীবন শুরু করেছিলেন। তিনি ওই কাজটা ছেড়ে দিলেন, বাগান পরিচর্যা যিনি করতেন, তাঁকে বিয়ে করলেন। তাঁরই সহায়তায় লন্ডনে একটি ফুলের দোকান খুলেছিলেন। ধীরে ধীরে দোকানের শ্রীবৃদ্ধি হল। কিন্তু ওই উদ্দাম পরিচালকের অবস্থার ক্রমাবনতি দেখা গেল। দীর্ঘদিন রোগে ভুগে শেষ পর্যন্ত তিনি মারা গেলেন।
এবার ওই বিধবা মহিলা আশা ও ভালোবাসাকে পাথেয় করে এগিয়ে চললেন। তার দোকানের আরও শ্রীবৃদ্ধি ঘটল। তারপর? তিনি উক্তৃষ্ট দামে দোকানটা বিক্রি করে দিলেন। এবার আবার তাকে বিয়ের আসরে বসতে হল, তাঁর দ্বিতীয় পক্ষের স্বামী হলেন শ্ৰীযুক্ত স্পিনলো। মধ্যবয়সী একজন রত্ন ব্যবসায়ী, যিনি একটা ছোট্ট ব্যবসাকে স্বীয় উদ্যম এবং বুদ্ধি বলে বড়ো করে তুলেছেন। কিছুদিন বাদে তারা ঐ ব্যবসাটাও বিক্রি করে সেন্ট ম্যারিমেড-এ চলে আসেন।
শ্ৰীমতী স্পিনলোকে আমরা এক মোটামুটি অবস্থাপন্ন মহিলা বলতে পারি। আসলে ফুলের দোকান বিক্রি করে তিনি যে বিপুল অর্থ পেয়েছেন, তার থেকে নিয়মিত সুদ মাঝে মাঝে তার হাতে পৌঁছে যায়। জীবন যাত্রার মান খুব একটা উঁচু নয়। তাই হয়তো যে কোনো বিপর্যয় মোকাবিলা করার মতো সাহস এবং শক্তি তার আছে।
তিনি বুদ্ধি করে বিভিন্ন লগ্নীতে টাকা রেখেছেন। এর ফলে আগের গরিমাটা যথেষ্ট বেড়ে গেছে। আর এর ফলেই হয়তো তিনি আধ্যাত্মিকতার দিকে ঝুঁকেছেন। শ্রীমতী স্পিনলো মাঝে মধ্যেই সম্মোহনের আসর বসান। শুধু তাই নয়, পরলোক সম্পর্কে তাঁর অগাধ আস্থা। মিডিয়াম ব্যবহার করে তিনি পরলোকের মানুষকে টেনে আনার চেষ্টা করেন। তিনি এক অদ্ভুত ধর্মমতে বিশ্বাস করেন। এর মধ্যে ভারতীয় আধ্যাত্ম শক্তির ছাপ আছে। শুধু তাই নয়, প্রাণায়াম এবং যোগক্রিয়াতেও তার উৎসাহ চোখে পড়ার মতো। সেন্ট ম্যারি মেড-এ আসার পর তার ধার্মিক ভাবনাতে কিছু পরিবর্তন ঘটে গিয়েছিল। তিনি পুরোনো দিনের গোড়া ক্রিশ্চান হয়ে ওঠার চেষ্টা করেছিলেন। মাঝে মধ্যেই চার্চে যেতেন। চার্চের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত রাখতেন। শুধু তাই নয়, স্থানীয় ঘটনাবলী সম্পর্কে তার আগ্রহের কোনো সীমা ছিল না। এমনকি তিনি মেয়েদের সঙ্গে বসে ব্রিজ খেলার আসরেও মেতে উঠতেন।
একটি সাধারণ জীবনযাত্রা, সেখানে কেন আকাশে কালো মেঘের ঘনঘটা? কেন এভাবে নিহত হতে হল তাকে।
.
০২.
কোনো ব্যাপার একবার তার মাথার মধ্যে ঢুকে গেলে আর নিস্তার নেই। সেটার শেষ না দেখে তিনি ছাড়বেন না। তিনি পরিষ্কার ভাবে বললেন–স্যার, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই, স্বামীটাই খুন করেছে, তাকে আগে গারদে পুরতে হবে।
–তোমার কি তাই মনে হয়?
-এটা আমার অনুমান নয়, স্যার, আমার স্থির সিদ্ধান্ত। আপনি শুধু একবার ওই ভদ্রলোকের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখবেন। সমস্ত মুখ অপরাধে থমথম করছে। ওনার মধ্যে আপনি কি এক টুকরো আবেগের বিচ্ছুরণ দেখেছেন? উনি জানতেন যে, ভদ্রমহিলা মারা গেছেন। তাই অত আস্তে আস্তে হেঁটে বাড়ির দিকে আসছিলেন।
এছাড়া তুমি আর কাউকে সন্দেহের তালিকায় রাখতে পারছ না? ভেবে দেখ তো শোকের ভূমিকায় অভিনয় করা কি খুবই শক্ত?
–অনেকের ক্ষেত্রে এটা হয় না, স্যার। কোনো কোনো মানুষ আছে যারা আরোপিত ব্যক্তিত্বে বিশ্বাস করে না। স্পিনলো সেই জাতের বলে আমার মনে হয়।
–তার জীবনে কি অন্য কোনো মহিলার ছাপ আছে? কর্নেল জানতে চাইলেন।
-না, এখনও পর্যন্ত তেমন কোনো খবর আমার হাতে আসেনি। অবশ্য ওই ভদ্রলোক নানা ছলাকলা জানেন। তিনি যে কোনো গোপন অভিলাষ চেপে রাখতে পারেন। আমার মনে হচ্ছে উনি বোধহয় স্ত্রীকে আর সহ্য করতে পারছিলেন না। স্ত্রীর অগাধ অর্থ আছে, এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এই জাতীয় মহিলাদের সহ্য করা সত্যি সম্ভব নয়। স্বামীদের এঁরা চাকর করে রাখতে ভালোবাসেন। তাই উনি ঠাণ্ডা মাথায় এই খুনের পরিকল্পনাটা করেছিলেন। উনি হয়তো ওনার খিটখিটে মেজাজের স্ত্রীর কাছ থেকে মুক্তি পেতে চেয়েছিলেন। বাকি জীবনটা সুখে শান্তিতে কাটিয়ে দেবার ইচ্ছে লুকিয়ে ছিল ওনার মনের মধ্যে।
–হ্যাঁ, হয়তো তোমার অনুমান সঠিক। এখন আমার তাই মনে হচ্ছে।
-এই অনুমানটার ওপরেই নির্ভর করে থাকুন স্যার, আমি বলছি আপনাকে ঠকতে হবে না। ওই ভদ্রলোক ধীরে ধীরে ষড়যন্ত্রের জাল বুনেছিলেন। তাই বোধ হয় ফোন কল এসেছে এমন একটা অছিলায় বের হয়ে যান।
মেলচেট জানতে চাইলেন–তার মানে কোনো ফোন কল আসেনি?
–না, স্যার। এর কী অর্থ হতে পারে? হয়তো ওই ভদ্রলোক মিথ্যে কথা বলেছেন, অথবা ওই কলটা এসেছিল পাবলিক টেলিফোন বুথ থেকে। এই গ্রামে মাত্র দুটো পাবলিক টেলিফোন বুথ আছে। একটা স্টেশনে, অন্যটা পোস্ট অফিসে। পোস্ট অফিসের টেলিফোন থেকে কল আসেনি। কারণ মিসেস ক্লোক মোটামুটিভাবে সকলকেই চেনেন। স্টেশনের টেলিফোন বুথ থেকে কলটা আসতে পারে। ট্রেন আসে দুটো সাতাশ মিনিটে, তখন খানিকটা হৈ চৈ হয়। তবে একটা ব্যাপার আমার মাথায় আসছে না। সেই ব্যাপারটা সম্পর্কে অনুসন্ধান করতে হবে। তিনি বলেছেন, মিস মার্পল তাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। এটা কিন্তু একেবারে ডাহা মিথ্যে। মিস মার্পলের বাড়ি থেকে ফোন কলটা আসেনি, কারণ মিস মার্পল তখন ইনস্টিটিউটে চলে গিয়েছিলেন।
