মিস মার্পল সাবধানে কথা বলে চললেন–এটা সিটিং রুমের মেঝের ওপর পড়েছিল। ছোট্ট একটা বেল্ট দিয়ে আষ্টেপৃষ্টে বাঁধা। পরবর্তীকালে ওটাকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
পলকের মুখমণ্ডলে ঔৎসুক্যের ছাপ পরিস্ফুটিত। তিনি বললেন–কীভাবে ওই বাচ্চা ছোকরা প্রে সবকিছু জানতে পারে বলুন তো?
মিস মার্পল তাঁর কথা শেষ করতে দিলেন না। তিনি বললেন–আপনার টিউনিকের ওপর একটা পিক লেগে আছে।
কনস্টেবল পলক তাকালেন। বুঝতে পারলেন এই কথার অন্তরালে কী অর্থ লুকিয়ে আছে। তিনি বললেন–সকলেই বলে থাকে ছাই দেখলেই উড়িয়ে দেখা উচিত সেখানে আগুন আছে কিনা, তাহলে হয়তো আমরা অনেক আপাত অকিঞ্চিৎকর প্রশ্ন থেকে রহস্যের সমাধান করতে পারব।
-এবার বোধহয় আপনি সত্য পথের পথিক হতে পেরেছেন। বলুন আমার কাছে আপনি কি জানতে চাইছেন, আমি আন্তরিক ভাবে চাইছি এই রহস্যটার সমাধান তোক।
কনস্টেবল পলক তার গলা আবিষ্কার করলেন। নোটবুকের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ভাববার চেষ্টা করলেন। তার পর বললেন–মৃত ভদ্রমহিলার স্বামী মিস্টার আর্থার স্পিনলো যে জবানবন্দি দিয়েছেন সেটা আমি সযত্নে রেখে দিয়েছি। মিস্টার স্পিনলো মারফত জানতে পারলাম, আজ দুটো বেজে তিরিশ মিনিটে আপনি ওনাকে ফোন করেছিলেন। আপনি ওনাকে আপনার বসার ঘরে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। আপনাদের মধ্যে কোনো একটা বিষয়ে আলোচনা হবে বলে। আপনি তিনটে বেজে পনেরো মিনিট ওই ভদ্রলোককে এখানে আসতে বলেছিলেন। কোনো একটা ব্যাপার নিয়ে আপনি খুবই উদ্বিগ্ন। ম্যাডাম, আমি যা বলছি সব সত্যি কি?
কনস্টেবলকে অবাক করে দিয়ে মিস মার্পল বলে উঠলেন–কখনোই তা নয়, এসব বানানো গল্প কথা।
–সে কী? মিস্টার স্পিনলোকে আপনি দুটো বেজে তিরিশ মিনিটে ফোন করেননি?
–কখনোই না, দুটো তিরিশ-তিনটে তিরিশ-চারটে তিরিশ–কখনোই না।
বেশ বোঝা যাচ্ছে মিস মার্পল এখন বিরক্ত হয়ে উঠেছেন। হবারই কথা, কেউ যদি তার নামে মিথ্যে কিছু বলে থাকে তাহলে বিরক্তি তো মনের মধ্যে জাগবেই।
কনস্টেবল পলক বললেন-ঠিক আছে, এরপর তিনি পরম আনন্দের সঙ্গে তার গোঁফ জোড়া মুচড়ে দিলেন। উত্তেজিত হলে তিনি এভাবেই তার উত্তেজনার প্রশমনের চেষ্টা করে থাকেন।
মিস্টার স্পিনলো আর কী বলেছেন?
মিস্টার স্পিনলোর জবানবন্দির ভেতর অনেক কথাই জানা গেছে। তিনি নাকি অনুরোধে পড়ে এখানে আসতে বাধ্য হয়েছিলেন। তিনি তাঁর বাড়ি থেকে তিনটে বেজে দশ মিনিটে বেরিয়ে আসেন। তারপর মিস মার্পলের বাড়িতে পৌঁছে যাবার পর কাজের মেয়ে মারফত শুনতে পান, মিস মার্পল বাড়িতে নেই।
মিস মার্পল বললেন–গল্পের এই অংশটা একেবারেই সত্যি। ওই ভদ্রলোক হয়তো এখানে এসেছিলেন। কিন্তু আমি তখন উওমেনস ইনস্টিটিউটে একটি কাজে ব্যস্ত ছিলাম।
কনস্টেবল পলক আবার বললেন–ঠিক আছে তো?
মিস মার্পল বললেন-কনস্টেবল, মিস্টার স্পিনলো সম্বন্ধে আপনার কী ধারণা? আপনি কি ওনাকে এখানে সম্ভাব্য অপরাধী হিসেবে ইতিমধ্যে চিহ্নিত করেছেন?
-তদন্তের এই অবস্থায় আমি কোনো মন্তব্য করতে পারব না। অনেকগুলো নাম মিছিল করে হেঁটে চলেছে কিন্তু কে যে সত্যিকারের দোষী তা বের করব কীভাবে? আমাকে আরও সাবধানে পা ফেলতে হবে।
মিস মার্পল জিজ্ঞাসা করলেন–মিস্টার স্পিনলো?
মেয়েটি মিস্টার স্পিনলোকে ভালোবাসে। মিস্টার স্পিনলো মানুষ হিসাবে খুব একটা আকর্ষণীয় নন। খর্বাকৃতি প্রাচীন ভাবধারা আঁকড়ে ধরে পথ চলতে ভালোবাসেন, সাবধানে মেপে মেপে কথা বলেন। তাঁর চরিত্রের মধ্যে সম্মানীয় ব্যক্তিত্বের ছাপ আছে। মনে হয় তিনি বোধহয় কোনো একটা অজ্ঞাত কারণে গ্রামাঞ্চলে বসবাস করতে এসেছিলেন। এতদিন পর্যন্ত তিনি শহরেই তার জীবন কাটিয়ে গেছেন। তাই মিস মার্পলের কাছে এই চরিত্রটা খুব একটা আকর্ষণীয় না হলেও কৌতূহলের উপাদান নেই যে তা বলা যায় না।
তিনি বললেন–ছোটো থেকেই আমি আমার জীবনটা নিজের মতো কাটাতে চেয়েছি। আমি চেয়েছিলাম কোনো একদিন শহর ছেড়ে গ্রামে চলে যাব। ছোট্ট একটি বাগান বাড়ি থাকবে আমার। ফুল আমি অসম্ভব ভালোবাসি। আপনি জানেন আমার বউয়ের একটি ফুলের দোকান আছে। সেই দোকানে তার সাথে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল।
এই ধরনের জবানবন্দির মধ্যে আলাদা কোনো আকর্ষণ নেই। কিন্তু এর অন্তরালে রোমান্সের একটু ছোঁয়া আছে তা স্বীকার করতেই হবে। দেখা গেল ফুলের জলসাঘরে কমবয়েসী সুন্দরী শ্রীমতী স্পিনলো বসে আছেন।
শ্রীযুক্ত স্পিনলো অবশ্য ফুল সম্পর্কে বিশেষ কিছুই জানেন না। বীজ, বীজতলা তৈরি করা, এসব ব্যাপারে তাঁর অজ্ঞতা সকলেই জানে। অবশ্য তার মধ্যে একটা আশা আছে। যে আশা তাকে ওই সুন্দর বাগান বাড়িটায় মালিক করে তুলেছে। এখানে পা রাখলে মনে হবে আপনি বুঝি পৃথিবীর বাইরে অন্য কোথাও পৌঁছে গেছেন। চারপাশে সুগন্ধি যুক্ত ফুলের মেলা। সাতরঙা রামধনু বুঝি পাখা মেলে উড়ে যাচ্ছে। মাঝে মধ্যেই তাকে নানা ধরনের প্রশ্ন করা হচ্ছে, তিনিও কিছুটা উদাসীন ভাবে উত্তর দিয়ে চলেছেন। শুধু তাই নয়, মিস মার্পলের কথাগুলো ছোট একটি নোটবুকে তুলে নিচ্ছেন।
তাঁকে দেখে শান্তস্বভাবের মানুষ বলেই মনে হচ্ছে। কিন্তু পুলিশ কেন তার সম্পর্কে এতখানি আগ্রহী হয়ে উঠবে? আসলে মৃত স্ত্রীর খবর শুনেও তিনি যে ভাবে তার আবেগ সামলাচ্ছেন, সেটাই অনেকের মনে সন্দেহের উদ্রেক করেছে। এই পৃথিবীতে অবশ্য এমন কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা শোক অথবা দুঃখ, আনন্দ অথবা উল্লাসে একই রকম থেকে যান। শ্রীমতী স্পিনলো সম্পর্কে অনেক কথাই তখন জানা গেছে। বারবার প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়া হচ্ছে শ্রীযুক্ত স্পিনলোর কাছে। তা সত্ত্বেও আমরা কি তার হৃদয়ের গোপন দুয়ার খুলতে পারছি?
