এবার শুরু হল বার বার বেল বাজানোর পালা। ট্যাক ট্যাক শব্দে কলিং বেল বেজে উঠল। মনে হল দরজায় ধ্বনি প্রতিধ্বনির শব্দ শোনা যাচ্ছে। তিনি চিৎকার করে ডাকলেন–কোথায় আছেন কেউ? কেউ কি ভেতরে আছেন?
ভেতর থেকে কোনো উত্তর ভেসে এল না।
মিস পলিট মনে মনে কিছু একটা বলার চেষ্টা করলেন। অস্ফুটে বললেন–আমার মনে হয় মিসেস স্পিনলো এই ব্যাপারটা ভুলে গেছেন। তিনি কখনো বাড়িতে নেই। দেখি অন্য কোনো একটা সময় আসতে হবে আমাকে।
তিনি বাইরে বেড়িয়ে আসার জন্য হাঁটতে শুরু করলেন।
মিস হার্টনেল বলে উঠলেন–একেবারে বোকা বুদ্ধি। এভাবে তোমার সঙ্গে ব্যবহার করাটা মোটেই উচিত হয়নি ভদ্রমহিলার। আমি হলে কখনো তা করতে পারতাম না। দেখা যাক, জানলা দিয়ে ভেতরের দিকে তাকিয়ে। জীবনের কোনো স্পন্দন চোখে পড়ে কি না?
ভদ্রমহিলা হেসে উঠলেন। এভাবেই হেসে তিনি সকলের সঙ্গে কথা বলতে ভালোবাসেন। ভাবলেন, ভারি সুন্দর একটা জোক বলা হয়েছে। তারপর, জানলার ভেতর দিয়ে ভেতরের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করার চেষ্টা করলেন। বেশ কিছুক্ষণ ধরে এই প্রয়াস চলতে থাকল। কিন্তু এইভাবে তিনি কি ওই কাজে সফল হবেন? আসলে মিস্টার এবং মিসেস স্পিনলো যে বাতাবরণের মধ্যে জীবন কাটাতে ভালোবাসেন, সেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ নিষেধ।
মিস হার্টনেল জীবনের স্পন্দন কোথাও দেখতে পেলেন না, বরং জানলার দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো ভেতরে কিছু একটা বিপর্যয় ঘটে গেছে। স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। মিসেস স্পিনলোর শরীরটা নোয়ানো আছে, দেখলেই বোঝা যাচ্ছে মৃত্যু হয়েছে তার। তার মানে? একটা ভয়ঙ্কর ঝামেলার সামনে দাঁড়িয়ে বুক চিতিয়ে লড়াই করতে হবে এই দুই মহিলাকে।
পরবর্তীকালে এই গল্পটা বলার সময় হার্টনেল বলেছিলেন–আমি আমার মাথা ঠাণ্ডা রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলাম। বেচারি পলিট, ও তো বুঝতেই পারছে না, এই পরিস্থিতিতে তার কী করা দরকার। আমি ওকে বলেছিলাম–ব্যাপারগুলো আমার ওপর ছেড়ে দাও, তুমি শান্ত মাথায় এখানে চুপটি করে দাঁড়াও, আমি এখনই গিয়ে কনস্টেবল পলককে ডেকে আনছি।
আমার এই কথা শুনে পলিট কোনো জবাব দেয়নি। হয়তো সে একেবারে বিমূঢ় হয়ে গিয়েছিল। আমিও তার প্রতি বেশি মনোযোগ দিলাম না। তখন কাউকে না কাউকে তো শক্ত হতেই হবে। এই ব্যাপারটা নিয়ে বেশি আলোচনা আমি মোটেই পছন্দ করি না। আমি কনস্টেবলকে ডাকার জন্য বার হচ্ছি, ঠিক সেই সময় মিস্টার স্পিনলো বাড়ির এককোণ থেকে বেরিয়ে এলেন।
এত অব্দি বলার পর মিস হার্টনেল ইঙ্গিতপূর্ণ বিরতি টানলেন। মনে হল তিনি বোধহয় কিছু একটা বলতে চাইছেন। আর শ্রোতার কণ্ঠে তখন জেগেছে ঔৎসুক্য। শ্রোতা জানতে চাইলেন, তাঁকে দেখে কীরকম লাগছিল আপনার? তিনি কি বিধ্বস্ত চেহারার নাকি উৎফুল্ল।
মিস হার্টনেল কথা চালিয়ে গেলেন। সত্যি কথা বলতে কী, তখনই আমার মনে হয়েছে তার আচরণের মধ্যে কোথায় যেন একটা অসঙ্গতির চিহ্ন লুকিয়ে আছে। তিনি বেশি রকমের শান্ত। তিনি একেবারেই উত্তেজিত হননি। এই অবস্থায় কেউ কি এই ভাবে শান্ত থাকতে পারে? যদি কাউকে বলা হয় তার স্ত্রীকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে, তাহলে সেই ভদ্রলোক কোনো রকম আবেগ দেখাবেন না, এটা কি বিশ্বাসযোগ্য?
পরে উপস্থিত সকলে এই বক্তব্যের সাথে সহমত পোষণ করলেন।
পুলিশও এই ব্যাপারটাকে মেনে নিয়েছিলেন। তাহলে মিস্টার স্পিনলোকেই কি আমরা সম্ভাব্য হত্যাকারী বলতে পারি? নাকি এর মধ্যেও অন্য কোনো কারণ লুকিয়ে আছে? নিজের স্ত্রীর মৃত্যুর খবর শুনে ভদ্রলোক কি এমন হয়ে গিয়েছিলেন? ইতিমধ্যে ঝুলি থেকে বেড়ালটা বেরিয়ে পড়ল। জানা গেল এই দম্পতির মধ্যে একটি আশ্চর্য চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল। যদি কোনো কারণে শ্রীমতীর মৃত্যু হয়, তাহলে তার সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী হবেন ওই স্বামী বাবাজীবন। একথা শোনার পর কেউ কি তাকে চোখের বাইরে রাখতে পারে?
এবার মিস মার্পলের কথা বলার পালা। তার মুখমণ্ডলে একটা অদ্ভুত লাবণ্য লুকিয়ে আছে। তার জিভও অত্যন্ত দ্রুত এপাশ থেকে ওপাশে চলে যায়। স্পিনলের পাশের বাড়িতে আপাতত তার অবস্থান। আধ ঘন্টার মধ্যে খবর সেখানে পৌঁছে গেছে। পুলিশ কনস্টেবল পলকের সাহায্যে। পলকের সঙ্গে একটি নোটবুক আছে। তিনি শান্ত মনে সব কিছু লিপিবদ্ধ করছেন।
পলকের কণ্ঠস্বর শোনা গেল–ম্যাডাম, আপনি যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে কি আমি আপনাকে কয়েকটা প্রশ্ন করতে পারি?
মিস মার্পল বললেন–এটা কি মিসেস স্পিনোর হত্যা সংক্রান্ত প্রশ্ন? তাহলে জবাব দিতে আমার কোনো আপত্তি নেই।
পলক কথা বলা শুরু করলেন–আমি জানতে চাইছি, ম্যাডাম, আপনি কী ভাবে এই বিষয়টির কথা জানতে পারলেন?
মিস মার্পলের ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছে তাচ্ছিল্যের হাসি। তিনি বললেন–কোন বিষয়? আমি ঠিক বুঝতে পারছি না। মাছের টুকরোটা কেমন সেটা জানতে চাইছেন?
এমন প্রশ্ন আশা করেননি কনস্টেবল পালক। তিনি চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকতে বাধ্য হলেন। আসলে জেলে যে মাছটা ধরে এনেছে যে সম্পর্কে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ থাকবে কেমন করে? এই মাছটাই আজ মিস মার্পলের সান্ধ্যকালীন খাবার টেবিলে সাজিয়ে দেওয়া হয়েছে।
