বাঞ্চ প্রশ্ন করলেন-তখনই তাকে হত্যা করা হয়েছে, তাই তো?
ক্রাডফ বললেন–আপনি ঠিকই অনুমান করেছেন, ম্যাডাম। আপনার বুদ্ধির তারিফ না করে আমি পারছি না। খুব কাছ থেকে গুলি করা হয়েছিল। একলেসের রিভলভার থেকে। কিন্তু মস কি এই কাজে অংশ নিয়েছিল? এ ব্যাপারে আমি খুব একটা সুনিশ্চিত নই। মিসেস হারমন, আমরা একটা ব্যাপার আপনার কাছ থেকে জানতে চাইছ। ওয়াল্টার সেন্ট জন যে স্যুটকেসটা বেডিংটন স্টেশনে জমা দিয়েছিল সেটা এখন কোথায় আছে?
বাঞ্চ বলতে চেষ্টা করলেন–আমার মনে হয় আন্ট জেনের কাছেই সেটা রয়ে গেছে। অর্থাৎ এই মিস মার্পলের একটা পরিকল্পনা। মিস মার্পল তার এক কাজের মেয়েকে বেটিংটন স্টেশনের ক্লোকরুমে পাঠিয়ে দিয়েছিল। সেখানেই সে স্যুটকেসটা দিয়ে দেয়। আমরা টিকিট বিনিময় করে নিই। মিস মার্পল অনুমান করেছিলেন, আমার হাত থেকে স্যুটকেসটা ছিনতাই হতে পারে। এখন বুঝতে পারছি কত বিচক্ষণ তিনি। যদি এইভাবে আগে থেকে পরিকল্পনা না করা হত তা হলে আসল স্যুটকেসটা আমি কখনোই পেতাম না।
এই কথা শুনে ইন্সপেক্টর ক্যাডফও খুব অবাক হয়ে গেলেন। তিনি বললেন–তা হলে? আমায় এখনই লন্ডনে যেতে হবে তার সঙ্গে দেখা করার জন্য। আপনি কি আমার সঙ্গে যাবেন, মিসেস হারমন?
বাঞ্চ বললেন–ঠিক আছে, আমি এখনই তৈরি হচ্ছি। ব্যাপারটা আমার ভাবতে বড্ড ভালো লাগছে। গতকাল আমার দাঁতে যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। ভেবেছিলাম লন্ডন শহরে গিয়ে এক ভালো ডেন্টিস্টের শরণাপন্ন হব।
ইন্সপেক্টর ক্যাডও বললেন–আমার পরম সৌভাগ্য।
***
মিস মার্পল প্রথমে ইন্সপেক্টার ক্রাডফের মুখের দিকে তাকালেন। তারপর বাঞ্চ হারমনের উদ্বিগ্ন মুখমণ্ডলের ছবি তার চোখের পর্দায় ফুটে উঠল। টেবিলের ওপর স্টকসেটা পড়েছিল। ওই ভদ্রমহিলা বললেন আমি কিন্তু এখনও ওটা খুলিনি, খোলাটা আমার পক্ষে উচিত হবে না। তবে আমি অপেক্ষা করছিলাম আপনার আসার জন্য। তারপর তিনি বলে উঠলেন–এই স্যুটকেসটা কিন্তু বন্ধ করা আছে, তার ঠোঁটে ফুটে উঠেছে ভিকটোরিও যুগের দুষ্টুমি ভরা হাসির টুকরো।
ইন্সপেক্টার জানতে চাইলেন-এর ভেতর কী থাকতে পারে বলে আপনার অনুমান মিস মার্পল?
মিস মার্পল বললেন–আপনি তো জানেন আমি খুব ভালো অনুমান করতে পারি। আসলে অনেক সময় আমার অনুমান আর বাস্তব মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এর ভেতর আছে জেবেইদার থিয়েটারের পোশাক। আপনি কি নেবেন ইন্সপেক্টার? কিছু একটা খেতে তো হবে? আমরা সরবত খেতে পারি কি?
সকলে মিলে খেতে শুরু করলেন। জানলা দিয়ে সূর্যের আলো ঘরের ভেতর ঢুকে পড়েছে। মনে হচ্ছে সেখানে যেন হাজার রথের উজ্জ্বল উদ্ধার। কখনো সেটা লালাভ কামনায় ভরিয়ে তুলেছে পরিবেশ, কখনো সপ্তমীদের আলিঙ্গনে, কখনো সবুজের সীমাহীন তারুণ্য, আবার কখনো কমলার গৈরিক আবেদন।
মিস মার্পল বললেন–আলাদীনের গুহা, এইসব রত্নরাজিতে নিজেকে সাজিয়ে নিয়ে মেয়েটি নেচে উঠল। পুরুষ দর্শকদের মনে তৈরি হত এমন এক বিভ্রম, যার থেকে তারা বেরিয়ে আসতে পারত না।
ইন্সপেক্টার ক্রাডফ বললেন–আপনি সত্যি বলেছেন, কিন্তু শুধুমাত্র ওই কারণে কি একজন লোককে হত্যা করা উচিত?
মিস মার্পল চিন্তামগ্ন মুখে বললেন–আমার মনে হয় ওই মহিলা খুবই বুদ্ধিমতী কিন্তু সে কি মরে গেছে? ইন্সপেক্টার, আপনি কী বলছেন?
-হ্যাঁ, তিন বছর আগে তার মৃত্যু হয়েছে।
মিস মার্পল বললেন–এই অত্যন্ত মূল্যবান নেকলেসটি তো তার ব্যক্তিগত সম্পত্তি? যদি তার থেকে পাথরগুলোকে খুলে নেওয়া যায়, আর মেয়েটির কসটিউমে তার লাগিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে কী হবে? তাহলে কি এক মায়াবী বিভ্রমের সৃষ্টি হবে? আর যদি কেউ আর একটা নকল নেকলেস তৈরি করে? সেই নেকলেসটা কি কখনো হারিয়ে যাবে? না, এই নেকলেসটা হয়তো কখনো হাতবদল হয়ে বাজারে আসবে না। কারণ চোরটা বুঝতেই পারবে যে, তার ওপর বানানো পাথর অথবা হীরের টুকরোগুলো একেবারে নকল।
বাঞ্চ বললেন–এখানে এনভেলাপটা আছে, এনভেলাপ-এর মধ্যে থেকে উজ্জ্বল বিচ্ছুরিত আলোর ঝর্ণাধারায় নির্গত রত্নরাজির টুকরোগুলো বেরিয়ে এল।
ইন্সপেক্টার ক্রাডফ এটি বাঞ্চের কাছ থেকে গ্রহণ করলেন। তারপর দুটো কাগজ সেখান থেকে বের করে আনলেন। সেখানে লেখা আছে–ওয়াল্টার এডমন্ড সেন্ট জোয়ান এবং ম্যারিমসেকের মধ্যে বিয়ের ঘোষণাপত্র। তার মানে? এটাই হল জোবেইদার আসল নাম।
মিস মার্পল বললেন–তার মানে ওরা বিবাহিত স্বামী-স্ত্রী তাই তো?
বাঞ্চ জিজ্ঞাসা করলেন–তাহলে ব্যাপারটা আমার কাছে বোধগম্য হচ্ছে না। ওই কাগজটায় কী আছে?
-একটি কন্যা সন্তানের জন্ম শংসাপত্র। যার নাম জুয়েল।
বাঞ্চ চিৎকার করে উঠল-জুয়েল, চিপিং লেক হর্নে আমি এই নামটি প্রথম শুনেছিলাম। তার মানে ওই মৃতার্ত ভদ্রলোক এই শব্দটি উচ্চারণ করার চেষ্টা করেছিল–জুয়েল, র্যাভারনাম কটেজে আমি জুয়েলের দেখা পেয়েছি সেখানে জুয়েল সকলের মধ্যে দিন কাটিয়েছিল। হ্যাঁ, মনে পড়েছে, তবে ওখানে তাকে জিল নামে ডাকা হত। মিসেস মান্ডির কথাও মনে পড়ছে। এক সপ্তাহ আগে তার সাথে আমার দেখা হয়েছে। তারা ইনফরমারিতে এসেছিল। জিলের একটা ভালো নামের সন্ধান করতে হবে।
…..আমার মনে হয় জেলখানায় বসে হয়তো বাবার কানে এই সংবাদ পৌঁছে গিয়ে ছিল। তাই বোধহয় সে জেলখানার দুয়ার ভেঙে বাইরে আসার চেষ্টা করছিল। আর পুরোনো ড্রেসারের কাছ থেকে এই সুটকেসটা নিয়ে আসে অথবা এই সুটকেসটা হয়তো তার স্ত্রী ফেলে গিয়েছিল। আমার মনে হয় যদি সত্যি সত্যি ওই বহু মূল্যবান রত্নরাজি তার মায়ের হয়ে থাকে তাহলে সেগুলি বিক্রি করে দেওয়া উচিত, আর সেই টাকায় মেয়েটির ভালোভাবে বেড়ে ওঠায় সাহায্য করা উচিত।
