ইন্সপেকটর ঘাড় নেড়ে বললেন–ঠিকই অনুমান করেছেন আপনি। ওনার নাম ওয়াল্টার সেন্ট জন, ইনি ক্যারিংটন জেলখানা থেকে আটচল্লিশ ঘণ্টা আগে পালিয়ে এসেছেন।
এই তথ্যটা শুনে শ্রীমতী বাঞ্চ একটু অবাক হলেন বৈকি। তিনি মনে মনে কিছু ভাবার চেষ্টা করলেন। তারপর বলে উঠলেন–তার মানে ওনাকে পুলিশ খুঁজে বেড়াচ্ছিল। আর সেজন্য উনি এমন একটা নিরাপদ স্থানের সন্ধান করছিলেন যেখানে একবার ঢুকে পড়তে পারলে কেউ ওনার টিকিটটিও ছুঁতে পারবে না। তাই তো?
একটু বাদে শ্রীমতী বাঞ্চ প্রশ্ন করলেন–উনি কি কাজ করেছিলেন যার জন্য এই শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছিল?
–এটা একটা মস্ত বড়ো গল্প। গল্পের মধ্যে নানা জটিল অধ্যায় আছে। কয়েক বছর আগে একজন ড্যান্সার একটি মিউজিক হলে নৃত্য প্রদর্শন করছিল। আপনি কি কখনো তার নাম শুনেছেন? এক সময় সে আরবিয়ান নাইট ড্যান্সে খুব নাম করেছিল। তার একটা বিখ্যাত উপস্থাপনা ছিল রত্নগুহায় আলাদীন, সে এইভাবে যথেষ্ট অর্থবান হয়ে ওঠে।
………তবে নাচের ব্যাপারটা সে খুব একটা ভালো জানতো বলে, আমার মনে হয় না। অবশ্য সবই আমার ব্যক্তিগত অনুমান, কিন্তু তার চেহারার মধ্যে এমন একটা যৌন মাদকতা ছিল যে, পুরুষ দর্শকেরা তার শরীরের মধ্যে প্রাচ্য দেশীয় সৌন্দর্যের সাথে পাশ্চাত্যের আধুনিকতার সংমিশ্রণ ঘটে গিয়েছিল। এইভাবে সে অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এক এশীয় রাজপুরুষ তার প্রেমে পড়ে যায়। সে ওই প্রেমিকাকে অসংখ্য জিনিস দিয়েছিল। তার মধ্যে প্রথমে একটা হীরের নেকলেসের কথা উল্লেখ করতে হয়।
এবার বাঞ্চ নিজের মনেই বলতে থাকলেন–তার মানে একজন রাজা সেই বিখ্যাত হীরে মাণিক তো?
ইন্সপেক্টর ক্রাডফ একটুখানি কেশে বললেন–না, মিসেস হারমন, এ ব্যাপারটাকে আরও ভালোভাবে বুঝিয়ে বলা উচিত। এই প্রেমের ঘটনাটা বেশি দিন ঘটতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত কেন যে এটা ভেঙে গেল আমি জানি না। আর তাই বোধহয় দেখা দিল কিছু বিশৃঙ্খলা।
………ওই নাচিয়ে মেয়েটির নাম জোরেইদা। অবশ্য এটা তার বানানো নাম হতে পারে। মাঝে মধ্যে সে নেকলেসটা পরে চারদিকে ঘুরে বেড়াতো। আসলে সে এই উপহারটাকে তার যৌবনের প্রশংসা হিসাবেই ধরে নিয়েছিল। শুধু তাই নয়, ওই ভেঙে যাওয়া প্রেম কাহিনির অন্তরালে এক খলনায়কের আবির্ভাব হয়, ভদ্রলোক সিনেমাতে চুটিয়ে অভিনয় করত, সে ওই মেয়েটির ওপর তার শারীরিক এবং মানসিক আধিপত্য বিস্তারের চেষ্টা করে। ইতিমধ্যে একটা ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটে গেল। নেকলেসটা হারিয়ে গেল নর্তকীর ড্রেসিংরুম থেকে। তখন সে থিয়েটারেই ছিল। কেউ বলে থাকে, এটি নাকি তারই এক ভয়ঙ্কর ষড়যন্ত্র। সে ইচ্ছে করে নেকলেসটাকে চোখের সামনে থেকে তুলে নিয়ে গেল যাতে সেটার ওপর চোর ডাকাতের নজর না পড়ে। আবার অনেকে বলল, এভাবেই সে খবরের কাগজের পাতায়, নিজের নাম ছাপাতে চাইছে। অথবা এর অন্তরালে আরও কোনো কুরুচিকর উদ্দেশ্য থাকতে পারে।
নেকলেসটা আর কখনো পাওয়া যায়নি, কিন্তু তদন্ত করে দেখা গেল, একজনের নাম বেরিয়ে এসেছে, পুলিশের খাতায় সে ওয়াল্টার সেন্ট জন নামে পরিচিত। এই লোকটার মোটামুটি পড়াশোনা আছে। সে যে কেন এই নীচ কাজ করতে গেল তা কে জানে। সে জুয়েলারির দোকানে কাজ করত। এর পাশাপাশি আরও এমন কিছু কাজ করত, যা হয়তো আমরা ঠিকমতো জানতে পারিনি। এর আগে কয়েকটা ছোটো খাটো অপরাধে অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে।
……..এটাও প্রমাণিত হল যে, ওই নেকলেসটা তার হাত দিয়েই পাচার করা হয়েছে। আর এই জন্য তাকে শেষ পর্যন্ত পুলিশের হাতে ধরা দিতে হয়। তার বিচার শুরু হয়। বিচারে দোষী সাব্যস্ত হওয়াতে তাকে জেলখানায় পাঠানো হয় কিন্তু সেখানে সে বেশিদিন থাকতে পারেনি। কীভাবে যে সকলের চোখকে ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে গেল সেটা এখনও আমার কাছে একটা অমীমাংসিত প্রশ্ন হিসাবেই রয়ে গেছে।
এই গল্পটার পরতে পরতে এত উত্তেজনা যে বাঞ্চ বোধহয় নিশ্বাস বন্ধ করে শুনছিলেন। শেষ পর্যন্ত তিনি প্রশ্ন করতে বাধ্য হলেন–লোকটা এখানে একা কেন?
এই ব্যাপারটা সম্পর্কে আমার মনে একটা প্রশ্ন জেগে আছে। মিসেস হারমন আমি ঠিক কথাই বলছি। জেলখানা থেকে বেরিয়ে আসার পর সে কোথায় যাবে হয়তো ভেবে ঠিক করতে পারছিল না। কিন্তু তার গতিবিধি লন্ডন শহরে সীমাবদ্ধ ছিল। সে তার পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা করতে চায়নি, তবে এক বৃদ্ধা রমণীর কাছে গিয়েছিল। ওনার নাম শ্রীমতী জ্যাকাস উনি একসময় থিয়েটারে পোশাক সরবরাহ করতেন। ওই রমণী কিন্তু ভদ্রলোকের ব্যাপারে খুব বেশি কথা বলতে পারেন নি। স্থানীয় বাসিন্দারা দেখেছিল ওই লোকটির হাতে একটি স্যুটকেস ছিল।
বাঞ্চ বললেন–হ্যাঁ, মনে হচ্ছে এই স্যুটকেসটিই বোধহয় ওই লোকটি বেডিংটনে ক্লোকরুমে ফেলে আসে। তারপর সোজা এখানে চলে আসে।
ইন্সপেক্টার ক্রাডফ বলতে থাকেন–ওই সময় একলেস এবং যে লোকটি নিজেকে এডুইন মস বলে ঘোষণা করেছিল, তাদের সন্ধান পাওয়া গেল। তারা ওই স্যুটকেসটার ওপর তাদের অধিকার প্রমাণ করতে চাইল। ওই লোকটির সঙ্গে তাদের দেখা হয়ে যায় বাসের মধ্যে। তারা বোধহয় গাড়িতে করে বাসটিকে অনুসরণ করতে থাকে। কিন্তু এই অনুসরণের ফল খুব একটা ভালো হয়নি। বাস থেকে শয়তান লোকটি নেমে আসে।
