আমাদের কর্তা হলেন বড় ছেলে। বাপ বিশেষ পছন্দ করতেন না। তিনি বিদেশে বিদেশেই ঘুরে কাটাতেন আর নানান মূর্তি কিনে দেশে পাঠাতেন।
যুদ্ধের আগে বুড়ো বাপ মারা গেলে মিঃ ক্রাকেনথর্প এই বাড়িতে সপরিবারে এসে থিতু হলেন। ততদিনে ছেলেরা সবাই বড়সড় হয়ে গেছে।
সংবাদগুলো খুবই মূল্যবান বলে মনে হয়েছিল লুসির। তাই ধৈর্য ধরে সব শুনেছিল।
বাড়ি ফিরে এসে দেখতে পেয়েছিল বিকেলের ডাকে আসা একটা চিঠি পড়ছে এমা।
–আমার ভাইপো আলেকজান্ডার তার এক সহপাঠী বন্ধুকে নিয়ে কাল আসছে। ছেলেটির নাম জেমস স্টডার্ড। গাড়ি বারান্দার দোতলার পাশাপাশি ঘর দুটোতে ওরা থাকতে পারবে।
.
টগবগে কিশোর দুটি পরদিন সকালেই এলো। সুন্দর দেবদূতের মতো চেহারা তাদের। আলেকজান্ডার ইস্টালির কটা চুল, নীল চোখ। স্টান্ডার্ড ওয়েস্টের রঙ চাপা, চোখে চশমা। ওরা এসে হৈ হট্টগোলে বাড়ি মাতিয়ে তুলল।
লাঞ্চের পরে ধোয়ামোছার কাজ শেষ করে যথানিয়মে লুসি বেরিয়ে পড়ল। ছেলে দুটি তখন দূরের মাঠে দৌড়াদৌড়ি করছিল।
লুসির হাতে গলফ ক্লাবের ছড়ি। আজ বিপরীত দিকের রাস্তায় এগিয়ে গিয়ে সে। একজায়গায় রডোডেনড্রন ঝোপ ফঁক করে ভেতরটা দেখার চেষ্টা করছিল।
লুসির হাতে গলফ ক্লাব দেখে ছেলেরাও উৎসাহিত হয়ে উঠেছিল। তারাও বাড়ির বাগানে গলফ সেট বসানোর কাজে মেতে উঠল।
ঘোরাঘুরি শেষ করে লুসি যখন বাড়িতে ফিরে আসছে, তখন গর্তের সংখ্যা লেখা ফলকগুলো নিয়ে দুই বন্ধুতে সমস্যায় পড়েছে দেখতে পেল।
মরচে ধরে সংখ্যাগুলো অস্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল। লুসি সমাধান বাতলে দিল–তুলি দিয়ে সাদা রং বুলিয়ে দিলেই হবে। কাল খানিকটা রং সংগ্রহ করে নিও।
আলেকজান্ডার খুশিতে লাফিয়ে উঠে বলল, বড় গুদামঘরে রঙের পাত্র আছে আমি জানি। আগের ঈস্টারের আগে রঙের মিস্ত্রীরা কাজ করেছিল। ওখানে একবার দেখলে হয়।
বড় গুদোম ঘর কোনটা জানতে চাইলে আলেকজান্ডার তাকে বাড়ির পেছনে দিকের রাস্তার ধারে একটা বড় দালান দেখিয়ে দিল।
–ওই ঘরটায় বৃদ্ধের সংগ্রহ করা অনেক জিনিস ফেলে রাখা আছে। তিনি সব বিদেশ থেকে সংগ্রহ করেছিলেন। চলো না দেখবে।
কৌতূহলী হয়ে লুসি তার সঙ্গে চলল। বড় গুদোম ঘরে ঢোকার কাঠের দরজায় লোহার কাটা বসানো। দরজার মাথায় আইভি লতার ঝাড়। তার নিচে লোহার সঙ্গে চাবি ঝোলানো ছিল। আলেকজান্ডার চাবি নিয়ে তালা খুলে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। তার পেছনে অন্য দুজন ঢুকল।
লুসি একনজরে চারপাশটা দেখে নিল। নানান ধরনের পাথরের মূর্তি ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে। প্রাচীন শিল্প কর্মের নিদর্শন হলেও অবহেলা অযত্নে নিতান্ত বাজে জিনিসের পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে।
এসবের সঙ্গে রয়েছে অজস্র ভাঙ্গা টেবিল চেয়ার, ঘাসকাটার যত্ন, মোটর গাড়ির বাতিল আসন, মরচে ধরা বালতি, এমনি নানান টুকিটাকি।
আলেকজান্ডার কোণের দিকে এগিয়ে পর্দার ঢাকা সরিয়ে গুটি কয়েক রঙের টিন আর কয়েকটা ব্রাশ বার করে আনল।
লুসি দেখে বলল, রঙ গুলবার জন্য কিছু তারপিন তেল এবারে দরকার।
গুদোমঘরে তারপিন তেল খুঁজে পাওয়া গেল না। কিন্তু দুই কিশোর আনন্দের সঙ্গে জানাল এখুনি সাইকেলে গিয়ে তারা তারপিন তেল সংগ্রহ করে আনবে। প্রবল উৎসাহে তারা ব্রাশ আর রঙের কৌটো নিয়ে বেরিয়ে গেল।
লুসি একা গুদোমঘরে, সতর্ক দৃষ্টি ফেলে চারপাশ তাকিয়ে দেখতে লাগল। ঘরের বাতাস বেশ ভারি। বাইরের হাওয়া চলাচলের অভাবে এমনটা হয়েছে। কেমন একটা পচা গন্ধের আভাস পেল পুসি। নাক টেনে গন্ধটা চিনবার চেষ্টা করতে লাগল।
হঠাৎ বিরাট একটা পাথরের কফিনের ওপরে তার চোখ পড়ল। পায়ে পায়ে সেটার কাছে এগিয়ে গেল। কফিনের ঢাকানাটা ভারি আর আঁট করে লাগানো। লুসির কেমন সন্দেহ হল। চাড় দেওয়ার শক্ত কিছু পাওয়া গেলে ডালাটা খুলে ভেতরটা দেখা যেত।
গুদোমঘর থেকে বেরিয়ে রান্নাঘরে এলো লুসি। একটা ভারি ক্রোবার নিয়ে আবার গুদোমঘরের ফিরে এলো। কিন্তু চেষ্টা করে বুঝতে পারল শক্তি দরকার।
জেদ চেপে গেল তার। ক্রোবার দিয়ে সর্বশক্তি নিয়ে ডালার ফাঁকে ক্রোবারে চাপ দিতে লাগল।
চেষ্টা ব্যর্থ হল না। ভারি ঢাকনাটা অবশেষে ধীরে ধীরে উঠতে লাগল। খানিকটা ফাঁক হলেই লুসি উবু হয়ে দেখতে পেল—কফিনের ভেতরে কি আছে।
২. বেরিয়ে এল লুসি
০৬.
প্রবল উত্তেজনায় ত্রস্ত পায়ে বড় গুদোম ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল লুসি। তার হাত কাঁপছিল। তালা বন্ধ করে চাবিটা আগের জায়গায় রাখল। একরকম দৌড়েই যেন সে আস্তাবলে নিজের গাড়ির কাছে চলে এল।
বাড়ির পেছনের রাস্তা ধরে পোস্ট অফিসের সামনে থামল। টেলিফোন তুলে মিস মারপলের সঙ্গে যোগাযোগ করল।
-কি বলছ লুসি? ওপ্রান্ত থেকে জানতে চাইলেন মিস মারপল।
–আমি জিনিসটা পেয়েছি। হ্যাঁ স্ত্রীলোকের…ফারকোট পরা…একটা পাথরের কফিনের মধ্যে…হ্যাঁ, বাড়ির বাইরের দিকে একটা গুদোম ঘরের মধ্যে। এখন আমি কি পুলিসে খবর দেব?
-এক্ষুনি পুলিসে খবর দাও।
–আনুষঙ্গিক কথাগুলো কি পুলিসকে বলব?
–হ্যাঁ। কোনো কথা গোপন করার দরকার নেই। সত্যকথাটাই তুমি তাদের বলবে।
–আপনার সম্পর্কে?
লুসি রিসিভার নামিয়ে রাখল। একমিনিট অপেক্ষা করে আবার রিসিভার তুলে পুলিস দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ করল।
