এভাবে তিনি লুসির ছেলেবেলার অনেক মজাদার গল্প উৎসাহের সঙ্গে শুনিয়ে গেলেন। পরে নিজের গ্রামের জীবনের স্মৃতিচারণও করলেন।
এমনি সময় ব্রায়ানের সঙ্গে দুই কিশোর ঘরে ঢুকল। খুনের রহস্য মোচনের সূত্র সন্ধান করে তারা গলদঘর্ম হয়ে এসেছে।
চা পরিবেশিত হবার খানিক পরেই ডাঃ কুইম্পার ঘরে প্রবেশ করলেন।
মিস মারপলের সঙ্গে তার পরিচয় করিয়ে দেওয়া হল।
–ডাক্তারের জীবন আমাকে মুগ্ধ করে। সমাজের জন্য তাদের কত ত্যাগ আর তারা কত মহৎ।
ডাঃ কুইম্পার হেসে বললেন, এককালে ডাক্তারদের বলা হত জোঁক। অবশ্য জোঁক জাতীয় ডাক্তার অনেক আছে।
কথা বলতে বলতেই তিনি একরাশ স্যান্ডউইচের সঙ্গে কেক ও কফির সদ্ব্যবহার করলেন।
–তোমার বাবাকে একবার দেখে আসি চল।
এমা ডাক্তারকে নিয়ে ভেতরে চল গেল। মিস মারপল তাদের দুজনকে লক্ষ্য করলেন।
-মিস ক্রাকেনথর্প খুবই পিতৃভক্ত মেয়ে। মুগ্ধস্বরে বললেন তিনি।
–ওই বুড়োকে কি করে যে সহ্য করে
কেড্রিকের কথায় বাধা দিয়ে বলে উঠল হারল্ড, এমার জন্যই পরিবারটা সজীব রয়েছে। বাবাও স্নেহ করেন।
এমনি আরও দুচার কথার পর মিস মারপল উঠে পড়লেন। ওঠার সময় তাঁর স্কার্ফ ও হাতব্যাগখানা ফেলে দিলেন।
তিন ভাইই অতিথির সৌজন্যে তৎপরতার সঙ্গে জিনিসগুলো তুলে দিল।
–তোমরা অনেক ভালো। বড় ভালো লাগল। হ্যাঁ, আমার ওই নীল মাফলারটা তুলে দাও। আমার প্রিয় লুসি কোথায় আছে ভেবে চিন্তা হত। এখন আমি নিশ্চিন্ত। আমাকে যে চায়ের আমন্ত্রণ জানিয়েছে এ তোমাদের বদান্যতার পরিচয়।
–আমাদের আনন্দের পরিবেশে বিঘ্ন ঘটাল কেবল একটা হত্যার ঘটনা।
–কেড্রিক।
হারল্ড ক্রুদ্ধ কণ্ঠে ভাইকে সতর্ক করে দিল।
কেড্রিকের দিকে তাকিয়ে মিস মারপল হাসলেন। বললেন, তোমাকে দেখে আমার ব্যাঙ্ক ম্যানেজারের ছেলেটির কথা মনে পড়ে। মানুষের মনে আঘাত দিয়ে কথা বলার অভ্যাস। ওয়েস্ট ইন্ডিজে ছিল। বাপের মৃত্যুর পর বাড়ি ফিরে এসে বাপের সঞ্চিত টাকা দেদার ওড়াচ্ছে।
.
মিস মারপলকে বাড়ি পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে লুসি বাড়ির আস্তাবলে গাড়ি ঢোকাল।
এমন সময় অন্ধকার কুঁড়ে তার সামনে উপস্থিত হল আলফ্রেড।
এক অদ্ভুত অভিজ্ঞতা হল লুসির। সুদর্শন আলফ্রেড ঘনিষ্ঠ হয়ে আবেগমিশ্রিত স্বরে বলল, পরিচারিকার বৃত্তিতে তুমি বড় বেমানান লুসি।
–আমি অখুশি নই।
–তুমি যথেষ্ট চালাকচতুর, রূপ আছে, সহজেই লোকের আস্থা অর্জন করতে পার–এ যে কতবড় মূলধন যদি বুঝতে চেষ্টা করতে!
–এই মূলধন নিয়ে আপনার সঙ্গে সোনার ইট বিক্রির ব্যবসায় নামতে বলছেন?
–অতটা ঝুঁকি নিতে বলছি না আমি–যেসব বিরক্তিকর নিয়মকানুন আর আইন স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে বিঘ্নিত করে, এসবের সামান্য পাশ কাটিয়ে অনেক উন্নতি করা চলে। তোমাকে অংশীদার হিসেবে পেলে খুশি হই।
-শুনে ভালো লাগছে।
–দেখ, আমার বুড়ো বাপ বেশিদিন বাঁচবে না। তিনি মারা গেলেই আমার হাতে মোটা অঙ্কের অর্থ এসে যাচ্ছে; তখন তোমাকে নিয়ে
-ব্যবসা কাঁদবেন। কিন্তু শর্ত কি?
বিবাহ, অবশ্য যদি তোমার পছন্দ হয়। তুমি নিশ্চয় বুঝতে পারছ লুসি, আমি তোমার প্রেমে পড়েছি।
লুসিকে দুহাতে বেষ্টন করল আলফ্রেড।
খিলখিল করে হেসে উঠে নিজেকে মুক্ত করে নিল লুসি।
-এখন ওসব কথা থাক। ডিনারের সময় হয়েছে চলুন।
–তোমার রান্না সত্যিই চমৎকার।
দুজনে বাড়িতে প্রবেশ করল। লুসি ঢুকে গেল রান্নাঘরে।
কিন্তু ডিনার প্রস্তুত করতে গিয়েই আবার বাধা পড়ল।
মিস আইলেসব্যারো, আপনাকে একটা কথা বলব ভেবেছিলাম।
হারল্ড ক্রাকেনথর্প এগিয়ে এলো।
-ডিনারের পরে শুনলে দেরি হয়ে যাবে ভাবছেন?
–মোটেও না। বেশ তাই হবে।
যথারীতি আনন্দময় পরিবেশেই ডিনার পর্ব সমাধা হল। ধোয়ামোছার কাজ শেষ করে লুসি হলঘরে এল।
হ্যারল্ড অপেক্ষায় ছিল। এগিয়ে এসে লুসিকে নিয়ে ড্রইংরুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করল।
–তোমার কাজের দক্ষতা দেখে আমি মুগ্ধ হয়েছি। কালই আমি চলে যাচ্ছি। তাই তোমাকে একটা কথা বলতে চাই।
-ধন্যবাদ।
-তোমার যোগ্যতা বাজে কাজে অপচয় হচ্ছে। এরকম চলতে পারে না। তোমাকে একটা প্রস্তাব দিচ্ছি। এখানকার সঙ্কট কেটে গেলে তুমি লন্ডনে আমার সঙ্গে দেখা করবে।
সেক্রেটারিকে আমার নির্দেশ দেওয়া থাকবে। তোমার মত কর্মদক্ষ কর্মী আমাদের প্রতিষ্ঠানে দরকার। যথেষ্ট ভালো টাকা তুমি পাবে। তাছাড়া ভবিষ্যৎ উন্নতির সম্ভাবনার কথা শুনলে তোমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হবে।
লুসি মনে মনে বলল, বাঁচা গেল, বিবাহিত বলেই হয়তো হারল্ড বিবাহের প্রস্তাব দিল না।
মুখে বিনীতভাবে বলল, ধন্যবাদ মিঃ ক্রাকেনথর্প। আপনার প্রস্তাব আমি মনে রাখব।
-হ্যাঁ, শোন মেয়ে, শুভ কাজে দেরি করতে নেই। জীবনে উন্নতির সুযোগ সবসময় আসে না।
শুভরাত্রি জানিয়ে হারল্ড ক্রাকেনথর্প ভেতরে চলে গেল।
শোওয়ার ঘরে যাওয়ার পথেই সিঁড়িতে কেড্রিকের মুখোমুখি হল লুসি।
–শোন, লুসি, তোমাকে একটা কথা বলব।
–আপনাকে বিয়ে করে ইডিজিতে যেতে চাই কিনা, একথা নিশ্চয়ই?
–ওরকম কথা একদম ভাবিনি।
ভুলের জন্য দুঃখিত।
–একটা টাইম টেবল বাড়িতে পাওয়া যাবে কিনা, জানতে চাইছিলাম।
–ওহ, হলঘরের টেবিলেই রয়েছে একখানা।
–শোন লুসি, নিজেকে তুমি সুন্দরী ভাবত পার, কিন্তু সকলেই তোমাকে বিয়ে করতে চাইবে এরকম ধারণা রেখো না। এধরনের কথা রটনা হলে ফল ভালো হয় না। জেনে রেখো, আমি যেসব মেয়েকে বিয়ের জন্য বিবেচনা করতে পারি তাদের তালিকায় স্থান পাবার কোনো যোগ্যতা তোমার নেই।
