আমার দেবীপ্রতিমা, আমার পরী, গত চিঠির উত্তরে তুমি যা-যা বলেছ সবই সত্যি। এই চিঠিটা আমার জীবনের একটা সম্পদ হয়ে সযত্নে রক্ষিত থাকবে। আমি তোমার জন্যে অর্ধেকও উপযুক্ত নই। অন্য সবার থেকে তুমি এতো আলাদা, অন্যরকমের। আমি তোমাকে শ্রদ্ধাবশত ভালবাসি। আমার কাছে তুমি এক অতি মহার্ঘতম বস্তু।
—তোমার—মাইকেল
শেষ চিঠিটা আশ্চর্যজনক ভাবে তারিখ বিহীন।
প্রিয়তমাসু,
আমি আগামীকাল উড়ছি। অত্যন্ত উৎসাহী এবং উত্তেজিত বোধ করছি। সাফল্য সম্বন্ধে অবশ্য পুরোপুরি নিশ্চিত। আলবাট্রাসও পুরোপুরি প্রস্তুত। আমি জানি সে আমাকে কোন ভাবেই হতাশ করবে না। চিয়ার আপ সুইটহার্ট। আর কোনরকম চিন্তা কর না। হ্যাঁ, ঝুঁকি তো এই কাজটাতে আছেই। কিন্তু জীবনের কোন ক্ষেত্রে ঝুঁকি নেই?
ভাল কথা, শুভানুধ্যায়ীরা অনেকে পরামর্শ দিল, আমার একটা উইল করে ফেলা উচিত। এরা খুবই বাস্তববাদী নিঃসন্দেহে। তবে এদের পরামর্শটা আমি গ্রহণ করেছি। ক্ষতি কি? ভাগ্যের কথা কে বলতে পারে? সুতরাং, আমি আধপাতার একটা নোট আমার আইনবিদ উইলফ্রেড অ্যান্ড কোম্পানী–তে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। গতকাল উইলটা তৈরি হয়ে এসেছে। কারও মুখে যেন একবার শুনেছিলাম, তিন শব্দের উইল–সব কিছু মায়ের। আমারটাও অনেকটা সেইরকম হয়েছে। তোমার ভাল নাম যে ম্যাগডালা, আমার খেয়াল আছে, চিন্তা কর না। আর হ্যাঁ, উইলকে জড়িয়ে সামান্য বিষাদময় প্রসঙ্গটায় মনে আঘাত পেও না, দুঃখবোধ কর না। করবে না তো, আমার সোনামনি? আমি ঠিক থাকব, ঠিক থাকব। অস্ট্রেলিয়া এবং ভারতে পৌঁছে তোমাকে টেলিগ্রাম করব। তারপর থেকে যে-যে দেশে পৌঁছব সেখান থেকেও টেলিগ্রাম করব। ভাল থেকো। চিন্তা কর না আমাকে নিয়ে। দেখো, আমি ভালো থাকব। শুভরাত্রি। ভগবান তোমায় ভালো রাখুন —মাইকেল।
পোয়ারো চিঠিগুলোকে আবার ভাঁজ করে রাখে। দেখেছ হেস্টিংস। আমি চিঠিগুলোকে পড়লাম নিশ্চিত হয়ে আর তোমাকে যা বলেছিলাম তাই ঘটল।
তুমি কি সেরকম কোন সূত্র খুঁজে পেয়েছ?
না, না। সেরকমভাবে না হলেও, অন্যভাবে আমি বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও প্রমাণ পেয়েছি।
অন্যভাবে? যেমন?
যেমন? যেমন আমরা জানতে পারলাম মাইকেল সেটন আমাদের মাদাম জোয়েলের নামে যে উইলটি করেছেন সেটা একেবারে আইনসিদ্ধ ভাবেই তৈরি করা হয়েছে। যদি অন্য আর কেউ এই চিঠিগুলো পড়ে থাকেন, তিনিও আমাদের মতোই নিশ্চিতভাবে সেই ব্যাপারটা জেনেছেন। আর যেভাবে অত্যন্ত দায়সারা, অসুরক্ষিত অবস্থায় চিঠিগুলো ফেলে রাখা, তাতে যে কেউই সহজে এগুলো পড়ে ফেলতে পারে।
এলিন? এলিন। প্রায় নিশ্চিতভাবে আমরা একটা ছোট পরীক্ষা করব পুরোপুরি নিশ্চিত হতে।
কিন্তু উইলটার তো কোন চিহ্নমাত্র দেখা গেল না? পোয়ারো মাথা নাড়ে। চিন্তিত ভঙ্গিতে বলে, সেটাই তো আমাকে অবাক করছে। তবে, যতদূর মনে হচ্ছে, অন্যমনস্কভাবে উনি জিনিসটাকে কোন আলমারির মাথায় ছুঁড়ে দিয়েছেন, অথবা হয়ত কোন চিনামাটির ফুলদানির মধ্যে ঢুকিয়ে রেখেছেন। মাদাম জোয়েলের স্মৃতিকে উসকে দিয়ে তার মুখ থেকে উইলটার খোঁজ জানতে পারবে অপেক্ষায় থাকা ছাড়া, আপাতত এই ব্যাপারে কিছুই করবার নেই।
আমরা বাইরের ঘরে এসে দেখলাম এলিন ঘরের ধুলো ঝাড়ছে আসবাবের থেকে। পোয়ারো ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার ভান করে বিদায় জানায়। দরজার হাতল টেনে বের হয়ে যেতে গিয়েও ঘুরে দাঁড়িয়ে আচমকা সে বলে, এলিন, মিস বার্কলি যে বিমান অভিযাত্রী মাইকেল সেটনের বাগদত্তা ছিলেন, এ কথাটাতো বলনি আমাদের? এলিন বাঁকা চোখে তাকায়। কি? কাগজে যাকে নিয়ে খুব লেখালেখি হচ্ছে? আমি ব্যাপারটা একেবারেই জানতাম না। মিস নিকের বাগদত্তা, হে ভগবান।
বাড়ির বাইরে বের হয়ে এসে আমি বললাম, দারুণ অভিনয়। না জানবার, আকাশ থেকে পড়বার ভানটা খুব বিশ্বাসযোগ্য ভাবে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছ। হ্যাঁ, ব্যাপারটা তো একেবারে আসলের মতোই লাগল।
হয়ত ও সত্যি কথাই বলেছে।
হুম। আর ওই চিঠির তোড়া নামের পর মাস ওই অন্তর্বাসগুলোর নীচে অনাবিষ্কৃত থেকে গেছে।
তাহলে ঠিক কি দাঁড়াচ্ছে ব্যাপারটা? আমি নিজের মনকে প্রশ্ন করি। আমরা সবাই তো এরকুল পোয়ারো নই। আমরা অপরাধের জগৎ কে এগোবার ক্ষমতাধারী নই। আমরা অপরাধের গন্ধ শুঁকে এগোবার ক্ষমতাধারী নই। এই এলিন… এক রহস্যময় নারী।
পোয়ারো বলে, গভীর চিন্তান্বিত মুখে মাথা নাড়াতে নাড়াতে বলে, নাহ, আমার ব্যাপারটা একদম ভাল লাগছে না। একটা হেঁয়ালি যেন। কোথায় যেন কিছু একটা রয়েছে। যা কিছুতেই আমি বুঝতে পারছি না।এক হাত মুঠো করে সখেদে অন্য হাতের তালুতে ঘুষি মারে সে।
.
১৪.
হারিয়ে যাওয়া উইলের রহস্য
আমরা আবার ফিরে গেলাম সোজা নার্সিংহোমে। নিক যথারীতি বেশ অবাক হল আমাদের দেখে।
হ্যাঁ, মাদাম জোয়েল। নিকের সপ্রশ্ন কৌতূহলী দৃষ্টির উত্তর দিয়ে পোয়ারো বলে, আমি এখনও এই কেসের তলদেশটাতে পা রাখতে পারি নি। কিছু কৌতূহলের এখনও, কোন সদুত্তর খুঁজে পাইনি। নিক বার্কলির চোখের কৌতূহলী দৃষ্টি আরও ঘন হয়ে উঠল। সে যেন সুতীব্র দৃষ্টিতে পোয়ারোর মুখে কি খুঁজতে লাগল। সিরিয়াস কথাগুলো সেরে নিই। আমি এসেছি। আপনার সেই, বস্তুটি আমি খুঁজে পাইনি।
