আমি তোমাকে কোনওভাবে মনে আঘাত দিতে চাই নি। তুমি কেন তোমার ইচ্ছে মতো কাজ করবে না? অবশ্যই তা পারো। বেশ কিছুক্ষণ নীরব থাকবার পর সে আবার বলে এলিন, আর একটা ছোট্ট ব্যাপার, আশাকরি এই ব্যাপারটাতে তুমি আমাকে সাহায্য করতে পারবে। এটা তো একটা বহু পুরনো বাড়ি। তুমি কি জান, এই বাড়িতে কোনো লুকনো, গোপন কক্ষ বা খুপরি আছে?
এই ঘরেই একটা সেরকম জিনিস আছে, পাশ থেকে ঠেলে সরিয়ে দেওয়া যায়। খুব ছোট বেলায় একবার দেখেছিলাম। তবে, এত বছর পর এখন আমি হুবহু মনে করতে পারছি না, সেটা ঠিক কোথায় রয়েছে।
একজন মানুষের লুকিয়ে থাকবার পক্ষে সেটা যথেষ্ট বড়?
না, না, স্যার। সেরকম কিছু নয়। একটা কাবার্ড ধরনের জিনিস। দেড়-দু ফুট চওড়া। চৌকো আকৃতির।
ওহ, তাহলে যেটা আমি যা খুঁজছি, চাইছি তা নয়। আমি দেখলাম, এবং চরমতম বিস্মিতও হলাম।
এলিনের গালে চিবুকে আবার সেই রক্ত ছোপ লেগেছে। আপনি যদি ভেবে থাকেন আমি কোথাও লুকিয়ে ছিলাম, তা নয় স্যার। তা নয়। আমি মিস নিককে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে আসতে এবং বাইরে বের হয়ে যাবার পদ শব্দ শুনি। তারপরই আর্তচিৎকার, কান্না শুনতে পেয়ে এঘরে ছুটে আসি। ঈশ্বরের নামে শপথ করে বলছি। এটাই সত্যি। এটাই সত্যি, ঈশ্বরের দিব্যি।
.
১৩.
চিঠিগুলো
পোয়ারো এরপর এলিনকে শান্ত করে এবং সান্ত্বনার প্রলেপ লাগিয়ে ফেরত পাঠাল। তারপর চিন্তাজর্জরিত মুখে আমার দিকে ফিরে তাকাল। এলিন সত্যি কি গুলির শব্দ শোনেননি? নাহ্ সেটা হবার সম্ভাবনা না খুব কম। আমার বিশ্বাস সে শব্দ শুনেছিল। রান্না ঘরের জানালা খুলে বুঝবার, দেখবার চেষ্টা করেছিল। তারপর নিককে সিঁড়ি নেমে আসতে, বের হয়ে যেতে শোনে। নিকের আর্তচিৎকার শুনতে পেয়েই সে এঘরে এসেছিল কি ঘটেছেবুঝতে। এটা ঘটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সেই সন্ধ্যেতে কেন সে বাজি পোড়ানো দেখতে বাগানে গেল না? এটাই জানতে চাইবার, এর পিছনে কারণটা কি?
নিছকই কৌতূহল। মনে রেখো, ঝ’-কে আমরা এখনো সন্দেহের তালিকা থেকে বাদ দিতে পারিনি।
ঝ? প্রবল বিস্ময়ে প্রশ্ন করি আমি।
হ্যাঁ, মনে নেই? আমার সন্দেহ তালিকার শেষ নাম। অজানা সন্দেহভাজন। সে কে আমরা এখনও জানি না। তবে, এখন আমার ক্রমে সন্দেহ হতে শুরু করেছে ওই ঝ’ কোনোভাবে এলিনের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত, ঘটনার রাতে সে এই বাড়িতে এসেছিল। গোপন কুঠুরীতে লুকোয়। একটি যুবতাঁকে কালো শাল জড়িয়ে যেতে দেখে তাকে নিক বলে ভেবে নেয় (বা ভুল করে) এবং তাকে গুলি করে। অবশ্যই, অনুসরণ করে বাইরে যাবার পর। যদিও আমরা জেনেছি এই বাড়িতে কোনো লুকনো কুঠুরী নেই। সে রাতে এলিন কেন বাজি পোড়ানো দেখতে বাগানে যায় নি। সে রহস্য আমাকে অবশ্যই খুঁজে বের করতে হবে। তবে তার আগে এসে মাদাম জোয়েলের উইলটা খুঁজে দেখি।
বাইরের ঘর খুঁজে কোনো কাগজপত্র পাওয়া গেল না। এরপর আমরা লাইব্রেরি ঘরে পৌঁছলাম। আধো অন্ধকার ঘর। ঘরটাতে বেশ বড় বড় ওয়ালনাট টেবিল। বেশ খানিকক্ষণ সময় গেল এই ঘরটাতে খুঁজতে। কারণ পুরো ঘরটা চূড়ান্ত অগোছাল অবস্থা। নানারকম বিল ও রিমিট, জমা দেওয়া টাকার রসিদ মিলে মিশে একাকার। বহু পুরনো চিঠি, আত্মীয় স্বজন, বন্ধুবান্ধবদের, স্কুপ হয়ে রয়েছে নানা জায়গায়। প্রায় আধঘণ্টা পরে পোয়ারো একটা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে বলল, সবই আমার মোটামুটি যাচাই করে দেখেছি। কিছু বাদ যায় নি। হঠাৎ পোয়ারো আমার দিকে একটা গোটা কাগজ ছুঁড়ে দেয়। একটা চিঠি। বেশ বড় বড় অক্ষরে হাতের লেখা।
প্রিয়তম,
পার্টি সত্যি সত্যি চমৎকার হয়েছে। আজকের দিনটা বেশ উষ্ণ। আশাকরি তুমি ওই জিনিসটা স্পর্শ করবে না। আবার শুরু কর না, প্রিয়তম। অবশ্য, ছেড়ে দেওয়াটা সত্যি সত্যি বড্ড কঠিন। আমার বয়ফ্রেণ্ডটিকে লিখছি দ্রুত সরবরাহ করতে। জীবন কি নরক সমতুল্য।
—তোমার, ফ্রেডি।
গত ফ্রেব্রুয়ারির তারিখ দেওয়া দেখছি। চিন্তিত গলায় পোয়ারো বলে। উনি যে ড্রাগ নেন তা অবশ্য প্রথমবার ওর দিকে তাকিয়েই আমি বুঝতে পেরেছিলাম।
সত্যি আশ্চর্য, আমি কখনও ব্যাপারটা বুঝতে পারিনি। অবাক গলায় আমি বলি।
সেটা খুবই স্বাভাবিক। তুমি শুধু ওনার চোখ দেখতে, সৌন্দর্য উপভোগ করতে কিন্তু কোনদিনই ওনার মুড বোঝবার চেষ্টা করনি। কখনও সেটা প্রবলভাবে প্রাণোচ্ছল, আবার কখনও চরমভাবে প্রাণহীন, বিষাদগ্রস্থ। অবসন্নতায় আক্রান্ত। যা কখনও খুব স্বাভাবিক নয়।
মাদক গ্রহণ তো মরাল-সেন্সকে অ্যাটাক করে তাই না?
অবশ্যই, তবে মাদাম জোয়েল রাইস সেভাবে মাদকাগ্রস্থ নন। সবে হয়ত শুরু করেছেন।
আর নিক?
নাহ, মাদাম জোয়েলকে দেখে মনে হয় না উনি মাদকে অভ্যস্থ। হয়তো নেহাত মজা বা অ্যাডভেঞ্চারের জন্য মাঝে মাঝে ভোপ পার্টিতে যান। তবে, সেভাবে মাদক নেন না। আমি কথাটা শুনে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম, এবং মুখে সেটা প্রকাশও করে ফেললাম। যাক, বাঁচা গেল। পোয়ারো হঠাৎ উঠে দাঁড়ায়, যাক, চল এবার মাদাম জোয়েলের-ঘরটা একটু খুঁজে দেখা যাক।নিকের ঘরে এসে হাজির হলাম আমরা। এই ঘরেও একটা বেশ বড়সড় ডেস্ক রয়েছে। তন্নতন্ন করে খুঁজেও সেখানে উইলটার চেহারা দেখা গেল না। শুধুমাত্র নিকের গাড়ির রেজিস্ট্রি সংক্রান্ত কাগজপত্র ছাড়া আর কোনওরকম গুরুত্বপূর্ণ কাগজই সেখানে পাওয়া গেল না।
