আমরা পাহাড়ী, বাঁকাচোরা পথ ধরে ধীর পায়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম। এইভাবে হাঁটতে হাঁটতে এক সময় আমরা এন্ড হাউসের দরজায় পৌঁছে গেলাম। দরজা ঠেলে ঢোকবার পর আমরা দেখলাম মধ্যবয়সী এক পুরুষ এক মনে ঘাস হেঁটে চলেছে। আমরা বুঝলাম, এই হচ্ছে বাড়ির মালি, অর্থাৎ এলিনের স্বামী। আমরা ওকে অতিক্রম করে ড্রইংরুমে এসে ঢুকলাম। আমি দরজার ঘণ্টাটা বাজালাম। কয়েক মুহূর্ত পরই যথারীতি টিপটপ, কালো পোশাকে সজ্জিতা এলিন এসে হাজির হল। আমাদের দেখে সে মোটেই বিস্মিত হল না। পোয়ারো ওকে জানাল আমরা মিস বার্কলির অনুমতি নিয়ে এসেছি, ঘরটা তল্লাশি করবার জন্যে।
ঠিক আছে স্যার।
পোয়ারো প্রশ্ন করে, পুলিশের কাজ শেষ হয়েছে?
হ্যাঁ, স্যার, ওরা সব, কাজ শেষ করে চলে গেছেন।
এলিন এবার ঘর ছেড়ে বের হবার জন্য ঘুরে দাঁড়ায়। আর ঠিক তখনি পোয়ারো ওকে থামিয়ে দিয়ে একটা প্রশ্ন করে, গত রাতে তুমি যখন শুনলে মিস ম্যাগি বার্কলি গুলিতে মারা গেছেন, খুব অবাক হয়েছিলে কি?
হ্যাঁ, স্যার নিশ্চয়ই। খুবই অবাক হয়েছিলাম। মিস ম্যাগি অত্যন্ত চমৎকার মহিলা ছিলেন। তার এই ভাবে মৃত্যু………. আমি তো চিন্তা করতে পারি না। একমাত্র কেউ শয়তানি বুদ্ধির মানুষ থাকতে পারে যে মিস ম্যাগির ক্ষতি করতে চাইছে।
যদি অন্য কেউ মারা যেত, খুন হত, বোধহয় এত অবাক হতে না। তাই না? পোয়ারোর এই প্রশ্নে এলিন সহসা চমকে ওঠে, থতমত খেয়ে যায়। আপনার কথার সঠিক অর্থ আমি বুঝতে পারছি না স্যার।
কাল রাতে যখন আমি এ ঘরে আসি, তুমি আমাকে প্রশ্ন করেছিলে, কেউ কি আহত হয়েছে? কারও আঘাত লেগেছে? তুমি কি সেই ধরনের কিছু আশা করেছিলে? বা সেইরকম কিছুর জন্যে অপেক্ষা করছিলে?
এলিন চুপ মেরে যায়। বাক্য হারা। হাতের আঙুলগুলো দিয়ে শেষ প্রান্তের ভাজে আঙুল বোলাতে থাকে। যেন সেগুলো সোজা করার চেষ্টা করছে। সেইভাবেই বিড়বিড় করে বলে, বুঝবেন না, আপনারা বুঝবেন না।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই বুঝব। পোয়ারো বলে, যত আশ্চর্য অবাক হবার মত অসাধারণ কথাই আমি ঠিকই বুঝতে পারব। তুমি বরং কষ্ট করে কথাটা বলেই ফেল হে। পোয়ারোর গলায় প্রবল ব্যঙ্গ। এলিন ওর দিকে যথেষ্ট সন্দেহ নিয়ে তাকায়। তারপর মনে হল মনকে আশ্বস্ত করে, পোয়ারোকে বিশ্বাসযোগ্য মনে করে, আপনি তো নিজের চোখেই দেখছেন স্যার। বাড়িটা ভাল নয়। মনের জড়তা, দ্বিধা কাটিয়ে অবশেষে বলে। আমি ওর কথায় প্রায় আকাশ থেকে পড়লেও পোয়ারোকে দেখে মনে হল না কথাগুলো ওর কাছে আদৌও অস্বাভাবিক মনে হয়েছে।
তুমি বলতে চাও বাড়িটা পুরনো। তাই তো?
হ্যাঁ, স্যার। এবং বাড়িটা ভালো নয়।
আচ্ছা এলিন, এই বাড়িতে তুমি কতদিন যাবৎ রয়েছ?
ছয় বছর। তবে তার আগে অল্প বয়সেও আমি এই বাড়িতে কাজ করেছি। রান্না ঘরে। রান্না পরিচারিকা হিসেবে। যেটা ছিল বৃদ্ধ স্যার নিকোলের সময়। পোয়ারো প্রখর দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে।
এইসব পুরনো বাড়িগুলোতে অশুভ ছায়া পড়ে। ব্যগ্র গলায় এলিন বলে চলে।–আপনি দেখতে পাবেন না। কিন্তু হাওয়ায় সেই অশুভ পরিবেশ টের পাবেন। আমি সবসময় জানতাম এ বাড়িতে অশুভ কিছু ঘটতে চলেছে।
পোয়ারো মাথা নীচু করে কি যেন ভাবে। তারপর স্পষ্ট চোখে এলিনের দিকে তাকিয়ে বলে, তুমি সঠিক প্রমাণিত হয়েছ।
হ্যাঁ, স্যার সত্যি, ওর গলায় একটা নিশ্চিত আত্মপ্রসাদের চোরাটান ছিল। কিন্তু তুমি ভাব নি এটা ছিল ম্যাগি। পোয়ারো বাঁকা চোখে ওর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে। না, সত্যি স্যার। আমি ভাবতে পারিনি। ওনাকে সবাই ভালবাসতো।
আমি ধরতে পারলাম এলিনের কথাগুলো একটা সূত্র। আশা করলাম পোয়ারো এবার সেটা ধরে সুতো গোটাবে।
কিন্তু আমাকে অবাক করে দিয়ে পোয়ারো সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রসঙ্গান্তরে চলে গেল, তুমি গুলি ছোঁড়ার শব্দ পেয়েছিলে?
না স্যার, আসলে বাজি ফাটছিল অনেক। খুব শব্দ হচ্ছিল। গুলির আওয়াজ আলাদা করে বোঝবার উপায় ছিল না।
তুমি বাজি পোড়ানো দেখতে যাও নি?
না স্যার, আমার তখনও বাসন ধোওয়া বাকি ছিল।
তোমার সাহায্যকারী হিসাবে কে ছিল?
কেউ না স্যার। সবাই বাজি পোড়ানো দেখতে চলে গিয়েছিল।
তুমি যাওনি কেন? বাজি পোড়ানো দেখতে তোমার ভাল লাগে না?
হ্যাঁ স্যার, নিশ্চয়ই ভাল লাগে। তবে আমি আগে হাতের কাজ সেরে নিতে চেয়েছিলাম।
ওহ, খুব ভাল কথা! তাহলে তুমি শুনেছিলে মাদাম জোয়েল ম্যাগি তার কোট চাইছিলেন?
না স্যার, আমি শুনলাম মিস নিক সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেলেন। তারপর মিস ম্যাগি একতলা থেকে কিছু একটা চেয়ে কয়েকবার তাড়া দিলেন। এবং তারপর বললেন–আমি কালো শালটা নিয়ে নিচ্ছি।
এক মিনিট। তুমি কথাগুলো শুনেও কোটগুলো খুঁজে দিতে যাওনি, প্রয়োজন বোধ করনি কেন এলিন?
আমি তো আপনাকে আগেই বলেছি স্যার, আমি হাতের কাজ সারতে ব্যস্ত ছিলাম। পোয়ারো এবার সরাসরি বিদ্ধকারী চোখে এলিনের দিকে তাকায়।
মহিলা দুজনেও তোমায় ডাকেন নি। কারণ তারা জানতেন, প্রতি বছরের মতো, এবারও তুমি বাইরে বাজি পোড়ানো দেখছো। আচমকা এলিনের গাল, চিবুকে রক্তের ছোপ দেখা গেল।
আপনি কি বলতে চাইছেন আমি বুঝতে পারছি না। হ্যাঁ, আমাদের বাগানে যাওয়ার কোনো কারণ ছিল না। কিন্তু অন্যবারের মতো এবার যদি আমি বাজি পোড়ানো দেখতে না যাই, কাজ সেরে তাড়াতাড়ি বিছানায় যেতে চাই, সেটা নিশ্চয়ই সম্পূর্ণ আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। তাই নয় কি?
