নিক এবার একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে, আপনার নির্দেশই মেনে চলছি। এখন আর আমি কি করছি না করছি তাতে আমার কিছু যায় আসে না।
যাইহোক, আমরা এবার উঠব। আপনার দুঃখে আর বেশিক্ষণ অনধিকার প্রবেশ করব না। আমরা উঠে দাঁড়াই। দরজার দিকে পা বাড়াই। হঠাৎ পোয়ারো ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে, মাদাম একটা কথা মনে পড়ে গেল। আপনি একটা উইল করেছিলেন বলে আমায় জানিয়ে ছিলেন মনে পড়ে?
হ্যাঁ,
সেটা এখন কোথায় আছে?
ওহ, সেটা? এই আছে, কোথাও এদিক সেদিক।
পোয়ারো বলে এন্ড হাউসে নিশ্চয়ই?
হ্যাঁ, এন্ড হাউসে তো বটেই।
এন্ড হাউসের কোথায়? নিশ্চয়ই কোনও নিরাপদ স্থানে। আপনার ডেস্কে, তালাচাবি দেওয়া তো?
উমম, আমি ঠিক বলতে পারব না। আসলে কাগজপত্র গুছিয়ে রাখার ব্যপারে আমি খুব একটা পটু নই। রেখেছি কোথাও। তবে নিশ্চিত করে বলতে পারব না সেটা কোথায় রেখেছি। খুঁজে দেখতে হবে। তবে হ্যাঁ, লাইব্রেরিতে একটা লেখার টেবিল আছে। তার চারটে ড্রয়ারেই আমি আমার সমস্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র, বিল, ভাউচার হিসাবপত্র রাখি। সম্ভবত ওই টেবিলের কোনও এক ড্রয়ারেই নিশ্চয়ই ওটা রেখে থাকতে পারি।
পোয়ারো এবার সবিনয় ভঙ্গিতে বলে, আপনি কি আমাকে উইলটা খুঁজে দেখার অনুমতি দেবেন?
হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। আপনি যদি চান অবশ্যই দেখতে পারেন। যা খুশি খুঁজে দেখতে পারেন আপনি।
ধন্যবাদ মাদাম জোয়েল, আপনার বদান্যতা এবং ভদ্রতার তুলনা নেই।
.
১২.
এলিন
নার্সিংহোম থেকে বের হবার পর দীর্ঘক্ষণ পোয়ারো কোনও কথা বলল না। তারপর একসময় সে আমার কব্জির কাছটা চেপে ধরল, তুমি দেখলে হেস্টিংস? আমি ঠিক বলেছিলাম। কিছু একটা ছিল, কিছু একটার অভাব, ছোট্ট একটুকরো ধাঁধা। যেটার অভাবেই সেই হারিয়ে যাওয়া সূত্রটার অভাবেই গোটা ব্যাপারটা অর্থহীন হয়ে যাচ্ছিল। ওর এত আনন্দ, উচ্ছ্বাসের কারণ আমি খুঁজে পাচ্ছিলাম না। কি এমন ঘটেছে? এগোনোর মতো কি কোনও জোরালো সূত্র পাওয়া গেছে?
অথচ দেখো, ব্যাপারটা সবসময়েই কিন্তু আমাদের চোখের সামনে ছিল। আমি দেখতে পাই নি। কি করে দেখতেই বা পাব? কিছু একটা অবশ্যই আছে, জানতে হলে আমাকে তো বুঝতে হতো সেই বিশেষ কিছুটা কি? এবং কেন?
পোয়ারোর বিড়বিড়ানি আমার কাছে ডাচ বা জার্মান ভাষার মতোই দুর্বোধ্য মনে হচ্ছিল। বাধ্য হয়ে প্রশ্ন না করে পারলাম না। তুমি কি অপরাধের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত এরকম কিছু তথ্য, সূত্র বা ঘটনা খুঁজে পেয়েছ?
তুমি দেখতে পাওনি?
সত্যিটা হচ্ছে, না পাইনি। আমি স্বীকার করতে বাধ্য হলাম।
হায় ভগবান, এটাও সম্ভব? আমরা যা খুঁজছিলাম সেই পথ নির্দেশ পেয়ে গেলাম।
আমি অনেক ভেবে বললাম, মোটিভ, অস্বচ্ছ মোটিভ বা কোনও ধরনের ঈর্ষা বোধ, তুমি কি সেরকম কিছু ইঙ্গিত করছ?
ঈর্ষা? না, বন্ধু না। সেই সাধারণ মোটিভ, টীকা, বন্ধুর টীকা, পোয়ারো শান্ত গলায় কথাগুলো বলে গেল।
কোন কথা না বলে আমি খরচোখে ওর দিকে তাকালাম।
মাত্র সপ্তাহ খানেক আগে ম্যাথু সেটন মারা গেছেন। আর উনি ছিলেন কোটিপতি। ইংল্যন্ডের অন্যতম ধনী ব্যক্তি।
হ্যাঁ, ঠিকই….কিন্তু।
ওনার কাছে আত্মীয় বলতে আছে একমাত্র ভাইপো। যাকে তিনি ভীষণ রকম ভালবাসতেন। আমরা বিনা দ্বিধায় ধরে নিতে পারি, স্যার ম্যাথু তার সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী তাকেই করে গিয়েছেন।
মাইকেল সেটনকে? পোয়ারোর কথার মাঝে আমি জানতে চাই। আসলে ব্যাপারটা আমার কাছে তখনও একটা ধাঁধার মতো মনে হচ্ছিল। আমার কথায় আমল না দিয়ে পোয়ারো আমাকে বোঝাবার ভঙ্গিতে বলে চলে, গত মঙ্গলবার মাইকেল সেটন নিখোঁজ হলেন আর মাদাম জোয়েলকে প্রথম হত্যার চেষ্টাটা ঘটল বুধবার। এরপর থেকে একের পর এক মাদামের ওপর হামলা হয়েই চলল। হেস্টিংস, আমি নিশ্চিত, মাইকেল সেটন অনিশ্চিয়তায় ভরা উড়ান যাত্রায় পাড়ি দেবার আগে একটা উইল করেছিলেন।
এবার আমার কাছে ব্যাপারটা ধীরে ধীরে স্পষ্ট হতে থাকল। পোয়ারো কথাগুলো আরো একটু গুছিয়ে বলে, মাইকেল সেটন তার সেই উইলে সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির উত্তরাধিকারী করেছিলেন তার সদ্য বাগদত্তাকে।
আমি বলি, পোয়ারো সমস্ত ব্যাপারটা তুমি কিন্তু আন্দাজে ধরে নিয়ে বলছ।
হ্যাঁ, তোমার কথা ঠিক।…. আমি কেবল অনুমান করেছি মাত্র। কিন্তু সঙ্গে এটাও ঠিক যে ঘটনাটা এইরকমই ঘটেছে–ঘটতে বাধ্য, আমার থিয়োরিতে বলে অন্যরকম ঘটতে পারে না। আর সত্য যদি অন্য কিছু ঘটত তাহলে এই অপরাধগুলো ঘটত না। তাছাড়া ভেবে দেখ, টাকার অঙ্কটা মোটেই কিন্তু সামান্য কিছু নয়, বিশাল অঙ্কের টাকা, যা অকল্পনীয় ব্যাপার।
আমি আর কোন কথা বললাম না। আমার মনের মধ্যে ব্যাপারগুলো কেবল ঘুরপাক খেতে লাগল। আমার মনে হচ্ছিল একটা হঠকারী পদ্ধতিতে ঘটনাটা পরিণতির দিকে এগোতে চাইছে। যা অসম্ভব। অথচ, আমার মনের ভেতর থেকে অন্য একটা কণ্ঠ বলছিল, পোয়ারোই ঠিক, পোয়ারোর এক স্বচ্ছন্দগতিময় অসাধারণত্ব রয়েছে বরাবর সঠিক থাকবার। হয়তো সেটাই আমাকে পোয়ারোর চিন্তার স্বপক্ষে ভাবতে, সহমত হতে, প্রভাবিত হতে। সঙ্গে অবশ্য এটাও আমার মনে হল, ব্যাপারটাকে প্রমাণ করতে পোয়ারোকে এখনও বহু পথ হাঁটতে হবে।
তোমার থিয়োরির সবচেয়ে বড় দুর্বলতাটা কিন্তু, এনগেজমেন্টের খবরটা কেউই জানে না, জানত না। তাই নয় কি? আমি তর্কের গলায় বলি।
