সত্যি, একটা দারুণ শক, নিঃসন্দেহে।
না, আপনি বুঝতে পারছেন না। আমি ভীষণ রেগে গিয়েছিলাম। এটা আমার হবার কথা ছিল, আমি হলে পারতাম। আমার সেরকমই ইচ্ছে করছিল। আমি মরে যেতে চাইছিলাম, অথচ আমি দিব্যি বেঁচে আছি। আর আমাকে নিরাপত্তা দিতে সে বেচারি ম্যাগি বেঘোরে মারা গেল। মাইকেল মারা গেল বহু দূরে প্যাসিফিক সমুদ্রের জলে ডুবে।
বেচারা। পোয়ারো সংক্ষিপ্ত মন্তব্য করে।
আমি বাঁচতে চাই না। আমি বেঁচে থাকতে চাই না। বলতে বলতে অঝোরে কেঁদে চলে সে।
আমি বুঝতে পারছি মাদাম জোয়েল, আমাদের প্রত্যেকের জীবনেই এইরকম একটা পর্ব কখনও না কখনও আসে কিন্তু সময়ই সব কিছুকে ভুলিয়ে দেয়। শোক দুঃখকে অতিক্রম করে জীবন এগিয়ে চলে।
আপনি ভাবছেন, অল্প কয়েক দিনের মধ্যে আমি দুঃখ ভুলে যাব, অন্য কাউকে বিয়ে করব। কান্না মেশানো সুরে কথাগুলো বলে নিক।
না, না, আমি সেরকম কিছুই ভাবছি না। পোয়ারো শান্ত গলায় সহানুভূতির গলায় বলে, আপনি অত্যন্ত সৌভাগ্যবান মাদাম। একজন যথার্থ সাহসী মানুষের ভালবাসা পেয়েছিলেন আপনি কিন্তু ওনার সঙ্গে আপনার আলাপ হয়েছিল কি ভাবে?
গত সেপ্টেম্বর, লা টকটেউ-তে, প্রায় এক বছর আগে।
আর আপনাদের এনগেজমেন্ট হয়েছিল কবে?
ক্রিসমাসের দুদিন পরে। কিন্তু ব্যাপারটাকে সেটন-এর ইচ্ছেতে গোপন রাখা হয়েছিল।
কেন?
মাইকের কাকা ম্যাথু সেটন পাখি খুব ভালবাসেন। আর উনি মহিলাদের দারুণ ঘৃণা করেন।
তার কারণ জানতে পেরেছিলেন?
মাইকেল যতটুকু বলেছিল–উনি একটু আধপাগল ধরনের ছিলেন। ওনার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল নারী পুরুষের জীবন ধ্বংস করে দেয়।
কিন্তু মিঃ সেটন কেন ব্যাপারটাকে মেনে নিয়েছিলেন?
মাইকেল পুরোপুরি ওনার ওপর নির্ভরশীল ছিল। মাইকেলের ব্যাপারে উনি অত্যন্ত গর্বিত ছিলেন। মাইকেলের বিশ্বব্যাপী উড়ান যানটি তৈরি করা এবং অন্যন্য সমস্তরকম আর্থিক খরচ বহন করছিলেন ম্যাথু কাকা। মাইকেলের ইচ্ছে ছিল বিশ্ব সফর থেকে ফিরে এসেই সে আমাদের বিয়ের কথা ঘোষণা করবে।
বেশ, বুঝলাম। পোয়ারো গম্ভীর গলায় মাথা নাড়ে।
মাইকেল বলেছিল, কোনওভাবে যেন আমাদের এনগেজমেন্ট-এর খবরটা ফাঁস না হয়ে যায়। যদি হয় তাহলে ভয়ঙ্কর প্রতিক্রিয়া হবে। ম্যাথু কাকা সবরকমের আর্থিক সাহায্য বন্ধ করে দেবেন আর উড়ানের মাধ্যমে তার বিশ্ব সফর মাইকেলের সারা জীবনের স্বপ্ন ছিল বলে সেটা আমি গোপন রাখব প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম তাকে। আমি আমার প্রতিশ্রুতি রেখেছি। আমার প্রিয় বন্ধু ফ্রেডিকেও এ ব্যাপারে কিছুই বলিনি।
পোয়ারো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, শুধু আমাকে যদি একবার ব্যাপারটা জানাতেন।
নিক পোয়ারোর দিকে তাকায়, তাতে কি লাভ হতো? আমার ওপর হামলা বা হত্যার চেষ্টাগুলোর সাথে মাইকেলের তো কোনও যোগাযোগ নেই। তবে হ্যাঁ, এসব কথা গোপন রাখার একটা প্রতিক্রিয়া আমার মনের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলেছিল। সারাক্ষণ একটা চাপা ভয়, দুশ্চিন্তা আমার মানসিক চাপ প্রচণ্ড বাড়িয়ে তুলেছিল যা এক অসহ্যকর অবস্থায় আমাকে উপনীত করেছিল।
হ্যাঁ, সেটা তো আমরা সবাই দেখেছি। পোয়ারো নিকের কথায় সায় দেয়।
এর আগেও মাইকেল একবার নিখোঁজ হয়েছিল, সেটা আপনি নিশ্চয়ই জানেন। হ্যাঁ, ভারতের দিকে যাবার পথে মরুভূমির মধ্যে হারিয়ে গিয়েছিল। মাইকেল সেটা আমাকে বলেছিল। সে ঘটনাও খুব ভয়ঙ্কর ছিল, যার থেকে শেষ পর্যন্ত ও বের হয়ে আসতে পেরেছিল। আর আমিও এবার নিজেকে বারবার বলতাম এবারও সেরকম কিছু একটা হবে। আবার নিজেকে বোঝাতাম–সে যতই বিপদের মুখে পড়ুক না কেন, সব বাধা কাটিয়ে সে ফিরে আসবেই। অন্যেরা যখন বলতো সে মারা গেছে, তখন আমি আমার মনকে বোঝাতাম, সে বেঁচে আছে, সুস্থ আছে, সে ফিরে আসবেই। সবাই ভুল বলছে। আর……… তারপর………… কাল রাতে…………. ওর কথাগুলো ক্ষীণ হতে হতে যেন হাওয়ায় মিশে যায়।
পোয়ারো অত্যন্ত সহানুভূতিশীল ভঙ্গিতে মাথা নাড়ে–আমি বুঝতে পারছি, আপনার মনের অবস্থাটা আমি বুঝতে পারছি।
এবার হঠাৎ করে পোয়ারো একেবারে অন্য প্রসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আচ্ছা মাদাম, মিঃ ভাইস-এর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন?
নিক হকচকিয়ে যায় পোয়ারোর অপ্রাসঙ্গিক কথায়। প্রশ্ন করে চার্লস হঠাৎ ওর কথা আপনার মাথায় এল কেন?
না, না, এমনিই। আমি শুধু জানতে চাইছি। কোনও উদ্দেশ্য নিয়ে নয়।
এমনিতে চার্লসের সঙ্গে আমার সম্পর্ক খুব ভালোই। তবে একটু ভীতু স্বভাবের মানুষ সে। কখনও সে এই জায়গাটা ছেড়ে অন্য কোথাও যায়নি।
মাদাম জোয়েল আমি শুনেছি, তিনি নাকি আপনার প্রতি নিবেদিত প্রাণ?
এবার নিকের মুখে খানিকটা বিব্রতভাব ফুটে ওঠে। হয়তো। তবে চার্লসের অনেক কিছুই আমার অপছন্দ। আমার জীবনযাত্রার ভঙ্গি, আমার ককটেল পার্টি, আমার বন্ধুরা, আমার কথাবার্তা, আসলে ও ভাবে আমার জীবনের মুড অপরিপক্ক, ও সবসময় আমাকে রিফর্ম করবার কথা চিন্তা করে, আশা করে। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থাকার পর হঠাৎ নিক তীক্ষ্ণ চোখে তাকায়, ওর চোখ দুটোয় এক অদ্ভুত ঝিকিমিকি আলো খেলে যায়। কিন্তু এই খবরটা আপনাদের কানে পৌঁছে দিল কোন মহানুভব?
পোয়ারো মৃদু হাসে এই প্রশ্নে। কোনও উত্তর দেয় না। তারপর সেই ফিচেল মার্কা হাসিটা মুখে ধরে রেখেই সে বলে, যাইহোক ম্যাম, আপনি আপাতত এখানেই থাকবেন, হ্যাঁ। এখানকার সব নিয়মকানুন মেনে চলবেন। মনে রাখবেন এখানে যা কিছু হবে আপনাকে যা কিছু করতে বলা হবে তার সব কিছুই হবে আমারই নির্দেশে।
