এখন অতি গোপনীয়তাই হবে আমাদের একমাত্র মন্ত্র, কথাটা ভুললে চলবে না।
বুঝলাম। কম্যান্ডার শ্যালিঙ্গার এবার উঠে দাঁড়ান, দরজা খুলে বাইরে বের হয়ে যাবার সময় মুহূর্তের জন্য পিছন ফিরে তাকিয়ে বলেন, আশাকরি রোগিনীকে ফুলের তোড়া পাঠানোতে নিশ্চয়ই কোনও বাধানিষেধ নেই?।
পোয়ারো মৃদু হাসে।
শ্যালিঙ্গার চলে যাওয়ার পরে পোয়ারো আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে, কম্যান্ডার শ্যালিঙ্গার, মাদাম রাইস ও মঁসিয়ে লাজারুম এরা তিনজনে ফুলের দোকানে না মারামারি শুরু করেন। এই ফাঁকে আমরা নিঃশব্দে চলো আমাদের গন্তব্যস্থলের রওনা হই। পৌঁছেই প্রথমে প্রশ্ন তিনটের উত্তর জানতে চাইব। যদিও উত্তরগুলো আমি জানি।
কিন্তু কখন তুমি উত্তরগুলো জানতে পারলে?
কেন, যখন আমি প্রাতরাশ করছিলাম,
আমাকে বল।
না, মাদামজোয়েলের নিজের মুখে সব শোনার জন্য ধৈর্য ধর হেস্টিংস।
ব্যাপারটা থেকে আমার মন ঘোরাবার জন্যই সম্ভবত পোয়ারো আমার দিকে একটা খোলা চিঠি এগিয়ে দিল।
এটা হল সেই ছবি বিশেষজ্ঞর দেওয়া রিপোর্ট। যাকে নিকের বাড়িতে সেই বিশেষ ছবিটার মূল্যায়ন করতে পোয়ারো পাঠিয়েছিল। সেই বিশেষজ্ঞই স্পষ্টই জানিয়েছেন, ছবিটার মূল্য কয়েক পাউণ্ডের বেশি মোটেই হবে না। সুতরাং, একটা ব্যাপার পরিষ্কার হওয়া গেল।
আসলে ইঁদুরের গর্তে কোন ইঁদুরই নেই। আমিও পোয়ারোরই বলা উক্তিটা তুলে ধরি।
আমার উক্তিটা তুমি মনে রেখেছ দেখছি, কিন্তু সত্যিই কি তাই হেস্টিংস? কোনও ইঁদুর যদি নাই থাকবে, মিঃ লাজারুম এই ছবিটার জন্য কয়েকগুণ বেশি দর হেঁকেছেন কেন? একজন উঠতি চিত্র ব্যবসায়ীর নিছক মান যাচাইয়ের ক্ষেত্রে গলদ? শুধুই কি তাই?
এ সব কথা আলোচনা করতে করতে আমার নার্সিংহোমে পৌঁছে গেলাম। দোতলার একটা ঘরে আমাদের পৌঁছে দেওয়া হল। ছোটো খাটো চেহারার একজন নার্স আমাদের দেখে এগিয়ে এল। পোয়ারোর দিকে তাকিয়ে সে হাসিমুখে আমাদের অভ্যর্থনা জানিয়ে বলল, কাল রাতে মিস বার্কলি খুব ভাল ঘুমিয়েছেন।
নিক বিছানায় আধশোয়া বসে আছে। খুব ভাল সময় এসেছেন মিঃ পোয়ারো।
পোয়ারো নিকের একটা হাত নিজের দুহাতের মধ্যে নিয়ে বলল, সাহস, মাদাম জোয়েল সাহস। সব সময়ই বেঁচে থাকবার কোনও না কোনও একটা কারণ থাকে।
কথাগুলো নিককে কেমন বাঁকিয়ে দেয়। নিক অদ্ভুত চোখে পোয়ারোর মুখের দিকে তাকিয়েই থাকে। পোয়ারোও তার দিকে তাকিয়ে থাকে।
আপনি কি এখনও আমাকে বলবেন না ম্যাডাম, কেন আপনি অত্যন্ত উদ্বেগ আর দুঃশিন্তার মধ্যে ছিলেন? চেষ্টা করব? ঠিক আছে মাদামজোয়েল, আমার তরফ থেকে আপনার জন্যে রইল গভীর সমবেদনা।
নিমেষে নিক বার্কলির মুখটা কেমন রক্তশূন্য হয়ে গেল।
তাহলে আপনি জানেন সব? যদিও এখন আর কে কি জানল তাতে আমার কিছুই এসে যায় না। এখন সব কিছু শেষ। আমি আর কখনো ওকে দেখতে পাব না। বলতে বলতে নিকের কণ্ঠস্বর কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে।
সাহস রাখুন ম্যাডাম, সাহস রাখুন। আমি আপনাকে আগেও বলেছি, এখনও বলছি, মনকে শক্ত করুন।
আমার মনে আর সাহস অবশিষ্ট নেই। গত সপ্তাহগুলোয় একের পরে এক আঘাত আমার সমস্ত মনোবল ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে।
আমি ঘনঘন দুজনের মুখের দিকে তাকাতে থাকি। ওদের কথাবার্তার বিন্দুবিসর্গ আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।
পোয়ারোও বুঝে নিয়েছে যে বন্ধু হেস্টিংস এসবের মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারছে না। আমরা কি নিয়ে কথা বলছি তার কিছুই জানে না সে।
অসুখী চোখদুটো এবার আমার চোখের সঙ্গে খেলে বেড়ায়। মাইকেল সেটন। আমি ওনার বাগদত্তা ছিলাম। তিনি মারা গেছেন।
.
১১.
মোটিভ
আমি নির্বাক। ধাতস্থ হবার বেশ কিছুক্ষণ পর পোয়ারোর দিকে ফিরে আমি বললাম, তুমি তাহলে এটাই বোঝাতে চাইছিলে?
অবশ্যই। সকালে।
কি করে বুঝলে তুমি? মানে অনুমান করলে কি করে?
সোজা ব্যাপার, খবরের কাগজের প্রথম পাতায়। তারপরই কাল রাতে খাওয়া দাওয়ার সময়ের সমস্ত কথাবার্তা আমার মনে পড়ে গেল। ছবির মতো পরিষ্কার হয়ে চোখের সামনে ফুটে উঠল সব।
তারপর পোয়ারো আবার নিকের দিকে ফেরে। গতরাতেই আপনি খবরটা শুনেছিলেন?
হ্যাঁ, রেডিওতে, ফোন আসবার পর ধরবার নাম করে আমি অন্য ঘরে চলে যাই। আমি সন্ধ্যের বেতার সংবাদটা শুনতে চেয়েছিলাম। যদি কোনও আশার খবর পাওয়া : যায়। প্রাণপণে উঠে আসা কান্নাটাকে গিলে নেবার চেষ্টা করতে করতে সে বলে, তারপর…… শুনলাম……..
শান্ত হোন, শান্ত হোন।
পোয়ালরা নিকের হাত দুটো নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে চাপ দেয়।
মারাত্মক, ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতা। এদিকে সবাই আসতে শুরু করেছে। আমি যে কি করব। পুরো ব্যাপারটাকে সামলাব কি করে কিছুই বুঝতে পারছি না। সব কিছুকে কেমন স্বপ্ন মনে হচ্ছিল। নিজেকেই যেন দেখতে পাচ্ছি আমি, বাইরে থেকে।
একটু থেমে সে সঙ্গে সঙ্গে, যেন বলতে ভুলে গেছে, এভাবে যোগ করে, ব্যাপারটা যথেষ্ট কষ্টদায়কও।
বুঝতে পারছি। স্বাভাবিক। কয়েক মুহূর্ত চুপ করে কি যেন ভাবে নিক। তারপর যখন সে আবার কথা বলে ওর গলায় কেমন একটা অসহায় আর্ততা ফুটে ওঠে।
ফ্রেডরিকার জন্যে গায়ে দেবার জিনিসটা আনতে গিয়ে আমি একলা হবার সুযোগ পেয়ে কেঁদে ফেলেছিলাম। ম্যাগি নীচের তলা থেকে বারবার চিৎকার করছিল তাড়াতাড়ি করবার জন্যে। শেষ পর্যন্ত আমার ছেড়ে রাখা শালটাকেই গায়ে দিয়ে বাইরে গিয়ে দাঁড়ায়। আমি চোখের জল ভাল করে মুছে, কান্নার দাগ ঢাকতে মুখে একটু পাউডার বুলিয়ে ফ্রেডরিকা আর ম্যাগির কোট নিয়ে একতলায় নেমে আসি। বাড়ির বাইরে বের হতেই……… ম্যাগিকে দেখতে পাই….. পড়ে রয়েছে…… মৃত……..।
