মাস ছয় আগে আমাদের আলাপ-পরিচয় হয়।
হুম, আর আপনারা একজন অন্যজনের প্রতি…….. কথা অসম্পূর্ণ রেখে পোয়ারো একদৃষ্টে চেয়ে থাকে ফ্রেডরিকার চোখের দিকে।
ফ্রেডরিকা কাঁধ বাঁকায়। উনি বেশ ধনী।
আহ, পোয়ারো মাথা নেড়ে বলে, আমার প্রশ্নের সঠিক উত্তর কিন্তু এটা নয়।
এবারে ফ্রেডরিকার মুখে সলজ্জ হাসির রেখা ফুটে উঠতে লক্ষ্য করলাম। বলল, আমার হয়ে আপনিই বলুন না, নিজের মুখে কি বলব?।
পোয়ারো এবার হাসে, ওয়েল, সেটা আপনি নিজের মুখে না বললেও আসলে সত্যিটা সত্যিই। আমি আবার আপনাকে বলছি ম্যাডাম, আপনি অত্যন্ত বুদ্ধিমতী।
বেশ, তাহলে খুব তাড়াতাড়ি আমাকে একটা ডিপ্লোমা সার্টিফিকেট দিয়ে দেবেন। বলেই ফ্রেডরিকা উঠে দাঁড়ায়।
আমাকে আপনার আর কিছু বলার নেই তো মাদাম জোয়েল?
ফ্রেডরিকা পোয়ারোর দিকে তাকায়, নাঃ আপাতত নেই।
এবার একবার অন্তত নিককে দেখে আসি সে বেচারা কেমন আছে?
বাঃ খুব ভাল কথা। আপনার সঙ্গে খোলামেলা ভাবে কথাবার্তার জন্য অশেষ ধন্যবাদ।
পোয়ারোর কথাগুলো শুনে ফ্রেডরিকা একবার ঘুরে দাঁড়িয়ে মুচকি হাসে। ভাবলাম কিছু হয়তো বলবেন উনি। কিন্তু কিছু না বলে এগিয়ে গেলেন দরজার দিকে। আমি দরজা খুলে ধরতে উনি আমার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
মহিলা অতি বুদ্ধিমতী ঠিকই কিন্তু এরকুল পোয়ারোও তো কম নয়। মহিলা চলে যাবার পর পোয়ারো মিটিমিটি হাসে।
আমি প্রশ্ন করি, কি বলতে চাইছো তুমি?
পোয়ারো সরাসরি কোনও উত্তর দেয় না আমার প্রশ্নের। শুধু বিড়বিড় করে বলতে থাকে, মিঃ লাজারুম অত্যন্ত ধনী মানুষ। আমাকে এটা গিলতে বাধ্য করা হয়েছে….
আমি পোয়ারোর কথা শুনে অবাক চোখে তাকাই তার দিকে। জঘন্য, জঘন্য ব্যাপার তাহলে সেটা। না বলে পারি না।
সবসময় ভুল জায়গায় সঠিক প্রতিক্রিয়াটা দেখানোর ব্যাপারে তোমার জুড়ি নেই হেস্টিংস। আসলে তুমি যা বলতে চাইছে, লাজারুমের অর্থের প্রসঙ্গ তুলে মাদাম সঠিক রুচির পরিচয় দেন নি, এ মুহূর্তে আমাদের সেটা বিচার করার সময় নয়। ভেবে দেখো হেস্টিংস, যদি মিসেস রাইসের একজন ধনী বন্ধু থাকেন যে তার সব চাহিদাই পূরণ করতে সক্ষম, তাহলে নিশ্চিতভাবেই মাদাম রাইস তার প্রিয়তম বন্ধুকে সামান্য কিছু অঙ্কের অর্থ প্রাপ্তির লোভে খুন করার চেষ্টা করতে হবে না নিশ্চয়ই।
হ্যাঁ, ঠিকই তো।
আমার মাথায় এ ব্যাপারটা তো আসেই নি। যদিও এটা একটা সম্ভাবনা মাত্র। কিন্তু পোয়ারো, তুমি ওকে নার্সিংহোমে যেতে বাধা দিলে না কেন?
বোকার মতো বলো না হেস্টিংস। আমি কেন তাকে বাধা দিতে যাব। আমার ভূমিকাটা ওর কাছে প্রকাশ করে দিতে যাব কোন দুঃখে শুনি? যদি আমি বাধা দিতে যাব তাহলে নার্সিংহোমের ডাক্তার, নার্সরা রয়েছেন কেন? ভুল আইডিয়া, তুমি তো জানো, হাসপাতালের ওইসব অক্লান্ত নার্সেরা নিয়ম কানুনের ব্যাপারে খুব কড়া এবং কর্তব্যনিষ্ট হয়।
যদি ওরা ওকে যেতে দেয়? সেই আশাঙ্কাটা কিন্তু থেকেই যায়। হয়তো নিকই তার প্রিয় বান্ধবীকে ভিতরে যাবার জন্য জেদ ধরে বসে, তখন?
সে ব্যাপারে নিশ্চিত থাকো হেস্টিংস। শুধু তুমি আর আমি ছাড়া আর কেউই সে সুযোগ পাবে না হেস্টিংস। হ্যাঁ, আমাদের আর দেরি না করে এবার হাসপাতালের, দিকে রওনা হওয়া উচিত। পোয়ারোর কথা শেষ হয়নি আর ঠিক তখনই আমাদের বসবার ঘরের দরজাটা খুলে গেল। দেখলাম জর্জ শ্যালিঙ্গার হুড়মুড় করে ঘরের ভেতরে ঢুকে এলেন।
মিঃ পোয়ারো, এসব কি ব্যাপার? ওই বিদঘুঁটে, হতচ্ছাড়া নার্সিংহোম, যেখানে নিক ভর্তি আছে। আমি ওকে দেখতে চাইলাম, ওরা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করল, ডাক্তারের নাকি বারণ আছে। একটু থেমে রাগে গজগজ করতে করতে তিনি আবার বললেন, এসবের মানে কি? আমি জানতে চাই? নিক সত্যিই কি খুব মানসিক আঘাত পেয়ে অসুস্থ?
দুঃখিত মঁসিয়ে, এ ব্যাপারে আমি কি করতে পারি? আমারি কিছু করার নেই। নার্সিংহোমের নিজস্ব আইন, রীতিনীতির মধ্যে আমি নাক গলাতে পারি না।
দেখুন মিঃ পোয়ারো, আমাকে ওসব বোঝাতে আসবেন না। আমার কাকা হারলে স্ট্রীটের একজন ডাক্তার, স্নায়ু বিশেষজ্ঞ এবং মনোবিশ্লেষক। নিয়ম-কানুন আমিও কম জানি না। মিষ্টি মিষ্টি কথা বলে আত্মীয়-বন্ধুদের দূরে সরিয়ে রাখা এটা কি কোনও কারণ হতে পারে? আমি বিশ্বাস করিনা যে নিক এতটাই অসুস্থ যে আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব কারও সঙ্গে দেখা পর্যন্ত করতে পারবে না। আসলে এসবের পিছনে রয়েছেন আপনি মিঃ পোয়ারো।
পোয়ারো খুব নরম ভঙ্গিতে হাসল।
আমি বরাবরই পোয়ারোকে লক্ষ্য করে দেখেছি পোয়ারো প্রেমিকদের প্রতি অতিশয় সহানুভূতিশীল। কখনও কখনও পক্ষপাতিত্ব করে বসে। পোয়ারো সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে বলে শুনুন, আমার কথা মন দিয়ে শুনুন–যদি একজন দর্শনার্থীকে ভেতরে যেতে দিতে হয়, তাহলে সবাইকেই যেতে দিতে হবে, তাই নয় কি?
বুঝতে পেরেছি, আপনার কথা বুঝতে পেরেছি, ধরা গলায় বলে শ্যালিঙ্গার। কিন্তু তবুও……..
পোয়ারো হঠাৎ ওর জোড়া দু ঠোঁটের ওপর আঙুল সোজা ভাবে চেপে ধরে বলে, শো-স-স, আর কোনও কথা নয়, এতক্ষণ আমাদের মধ্যে যে কথাবার্তা হয়েছে সেটা ভুলে যাব আমরা। তাই তো?
ঠিক আছে, আমার মুখ দিয়ে আর একটা কথাও বের হবে না। শ্যালিঙ্গার দৃঢ় গলায় বলে।
