তুমি সত্যি–এরকম কিছু ভাবছ?
হ্যাঁ, ভাবছি।
হেস্টিংস, আমি তোমাকে আগেই বলেছি না মাদাম জোয়েল সব কথা আমাদের বলেন নি, একটা কিছু গোপন করে গেছেন–আসলে উনি যে কথাগুলো চেপে গেছেন তার সঙ্গে এই খুন বা আগের খুনের প্রচেষ্টার সম্পর্ক রয়েছে তা তিনি আদৌ বুঝতে পারছেন না বলেই হয়তো বলেন নি। কিন্তু আমি পুরোপুরি অনুমান করছি যে গতকাল খুন এবং আগের খুনের প্রচেষ্টার সঙ্গে সেই কথাগুলোর যোগসাজস অবশ্যই রয়েছে।
একটু থেমে আবার বলতে শুরু করে, সত্যি যদি মাদাম জোয়েলের না বলা কথাগুলোর সঙ্গে এই রহস্যের কোনও যোগাযোগ না থাকত তাহলে ঘটনাটা আমার কাছে ব্যাখ্যা করা খুবই সরল হয়ে উঠত। ওই মিসিং ফ্যাক্টরটাই আসলে আমার কাছে সদর দরজা খোলার আসল চাবি। কিন্তু দুঃখের কথা, মাদাম জোয়েল সেটা বুঝতে পারছেন না। কিন্তু আমি জানি হেস্টিংস, আমি ঠিকই বলছি।
পোয়ারো কিছুক্ষণ নিশ্চুপ থাকে। সামনের চেয়ারটায় হেলান দিয়ে বসে দুচোখ বুজে কি যেন ভাবতে থাকে। খানিকক্ষণ পরে বলে ওঠে।
আমাকে প্রথমে ওই তিনটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব। তাহলে…… তাহলে……
আমি তড়িঘড়ি আরাম কেদারা ছেড়ে উঠে দাঁড়াই। গতকাল এই আরাম কেদারায় কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বুঝতে পারিনি। সারাটা রাত এখানে কেটে গেছে আমার। ঘাড় থেকে মেরুদণ্ড বেয়ে একটা অস্বস্তিভাব হচ্ছে। পোয়ারোকে একলা বসে ভাববার সুযোগ করে দিয়ে আমি সোজা বাথরুমে ঢুকে প্রাতঃকর্মের সঙ্গে স্নানপর্বও শেষ করে নিলাম।
স্নান সেরে সোজা ব্রেকফাস্ট টেবিলে এসে বসলাম। খবরের কাগজটায় চোখ বোলাতে শুরু করলাম। না, নতুন সেরকম কোনও খবর নেই। শুধু একটা খবর ছেপেছে, মাইকেল, সেটনকে এখন মৃত বলেই ধরে নেওয়া হচ্ছে। সম্ভবত আর ওনার জীবিত ফিরে আসবার কোনও সম্ভাবনা নেই। আর মাঝের পাতায় ছেপেছে–সমুদ্রতীরবর্তী অনুষ্ঠানে রহস্যজনকভাবে যুবতী খুন। মনযোগ সহকারে রিপোর্টটা পড়লাম। সেরকম কোনও তথ্য পেলাম না। অনুমান ভিত্তিক আষাঢ়ে গল্প জুড়ে দিয়ে ছেপেছে। ততক্ষণে প্রাতরাশ এসে গেছে। আমি প্রাতরাশে মন দিলাম। আমার খাওয়া প্রায় শেষের দিকে তখনই মিসেস রাইসের উদয় ঘটল। তিনি সোজা এসে আমার টেবিলেই বসলেন। আমি কৌতূহলী চোখে তাকাতে উনি বললেন, আপনি কি জানেন, উনি এখন ঘুম থেকে উঠেছেন কিনা?
হ্যাঁ, চলুন, আমি আপনাকে ওর কাছে নিয়ে যাচ্ছি।
ধন্যবাদ।
পোয়ারোর কাছে নিয়ে যাবার পথে আমি প্রশ্ন করলাম, অপনি কি খুন হওয়া মেয়েটিকে চিনতেন?
একবার মাত্র দেখেছিলাম স্কারবরোঘ-তে। নিকের সঙ্গে দুপুরের খাবার খেতে এসেছিল একদিন।
যদিও মহিলার কথা বলার ভঙ্গিতে আমার মনে হচ্ছিল না যে উনি খুব একটা শক্ পেয়েছেন বলে। মহিলা আসলে খুবই আত্মকেন্দ্রিক।
পোয়ারো ইতিমধ্যেই ঘরেই ওর প্রাতরাশ সেরে নিয়েছিল। ফ্রেডরিকাকে দেখে সে সাদর অভ্যর্থনার সঙ্গে বসবার জন্যে চেয়ার এগিয়ে দিল। মৃদু হেসে এবং ধন্যবাদ জানিয়ে ফ্রেডরিকা আসন গ্রহণ করল।
বলুন, আমি আপনার জন্য কি করতে পারি।
মঁসিয়ে পোয়ারো, আমি একটা কথা সুনিশ্চিত ভাবে জানতে চাই–গতকাল রাতে যে দুঃখজনক ভয়ঙ্কর ঘটনাটা ঘটল তার আসল লক্ষ্য কি নিক ছিল?
কোনও সন্দেহের অবকাশ নেই। কথা শেষ হবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই মাথা নাড়ে পোয়ারো।
স্থির চোখে পোয়ারোর দিকে তাকিয়ে উনি বললেন, নিক তো সবসময় হাসিখুশি, প্রাণোচ্ছল ভাবে বাঁচতে চেয়ে এসেছে।
হ্যাঁ, ভাগ্যের খেলায় ওপর নীচ তো আছেই। জীবন সর্বদা মসৃণ নয়। পোয়ারো নিজের মতো করে বলে।
আমার মনে হচ্ছে, এসবের বিরুদ্ধে লড়াই করাটা অর্থহীন।
বিষাদ ছাড়াও ফ্রেডরিকার এই কথাগুলোর মধ্যে একটা চোরা স্রোতটান ছিল যা আমি স্পষ্টই অনুভব করতে পারলাম। ওর মধ্যে একটা দুঃশ্চিন্তার ছাপও লক্ষ্য করলাম।
দু’এক মুহূর্ত নীরব থেকে সে আবার বলে, আমি আপনার কাছে ক্ষমা চাইছি মঁসিয়ে পোয়ারো। আমার তরফে তো বটেই, নিকের হয়েও। সত্যি কথা বলতে কি, গতকাল রাতের ওই ভয়ঙ্কর ঘটনার আগে আমরা কেউই পরিস্থিতির ভয়ঙ্করতা বুঝে উঠতে পারিনি। বিশেষ করে আমি তো স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি যে পরিস্থিতিটা এতোটাই গম্ভীর।
তাই বুঝি? পোয়ারো হাসলেন।
ওর চোখে খুশির চেয়ে চঞ্চলতা বেশি জাগ্রত রয়েছে এটাও লক্ষ্য করলাম।
আমি এবার খুব স্পষ্ট ভাবে বুঝতে পারছি, নিকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনদের যে বৃত্তটা রয়েছে তাদের মধ্যে নয়। ব্যাপারটা খুবই হাস্যকর, বিরক্তিজনক, কিন্তু বাস্তব। আমি ঠিক বলছি তো মঁসিয়ে পোয়ারো?
আপনি অত্যন্ত বুদ্ধিমতী। পোয়ারো সংক্ষিপ্ত ভাষায় মন্তব্য করে।
আপনি আগে একদিন আমাকে টাকিস্টক নিয়ে প্রশ্ন করেছিলেন না মিঃ পোয়ারো। আমি বুঝতে পারছি, আজ নয়তো কাল আসল সত্যিটা আপনি জেনে যাবেন, কিন্তু আসল সত্যিটা হচ্ছে আমি টাকিস্টকে ছিলাম না।
তাহলে কোথায় ছিলেন?
আমি আর মিঃ লাজারুম গত সপ্তাহের প্রথমদিকে এই অঞ্চলে এসেছিলাম। শেলকম্বে নামের ছোট্ট একটা জায়গায় আমরা ছিলাম।
ওহ, এখান থেকে সাত মাইল দূরে। তাই তো?
হাঁ, ঠিক ধরেছেন।
এবার হঠাৎ পোয়ারো প্রশ্ন করে, মিঃ লাজারুমের সঙ্গে আপনার বন্ধুত্ব কতদিনের ম্যাডাম?
