ঠিক আছে, আমি তার কথায় সায় দিই। তার পরের পর্যায়, মনস্তত্ব। মস্তিষ্কের ধূসর কোষগুলোকে তুখোড়ভাবে খেলাতে হবে। হেস্টিংস এবার তোমার শুতে যাওয়া উচিত।
পোয়ারোর আচমকা প্রসঙ্গান্তরে সরে যাওয়ার ব্যাপারটা আমাকে কিছুটা হতচকিত করে তুললেও আমি দৃঢ় গলায় প্রতিবাদ করি। আমি বলি যতক্ষণ না তুমি শুতে যাচ্ছো আমিও তোমাকে ছেড়ে যাচ্ছি না।
খুব ভালো কথা। প্রকৃত বন্ধুর মতো কথা বললে। কিন্তু হেস্টিংস, তুমি তো আমাকে আমার চিন্তায় সাহায্য করতে পারবে না। আর সেই কাজটাই আমাকে জরুরি ভিত্তিতে করতে হবে।
চিন্তা। আমি তবুও মাথা নাড়ি। তোমাকে চিন্তায় সাহায্য করতে যদিও না পারি, তুমি হয়তো কোনও সূত্র ভেবে বার করতে পারলে সে বিষয়ে আমার সঙ্গে আলোচনা করতে পারো।
তুমি সত্যিই আমার বিশ্বস্ত বন্ধু। তাহলে এখন এক কাজ করো ওই আরাম কেদারায় গিয়ে বসো।
আমি তাতে আপত্তি করি না। আমি আরাম কেদারায় বসে দোল খেতে থাকি। কখন যে আমার চোখ বুজে আসে আমি নিজেই জানি না।
টেবিলের সামনে চেয়ারটায় হেলান দিয়ে বসে দুচোখ বন্ধ করে গভীর মনোসংযোগে কি যেন ভেবে চলেছিল পোয়ারো। সামনের খোলা খাতাটায় কি সব আঁকিবুকি কাটছিল আর মাঝে মাঝেই সেই খাতা থেকে পাতা ছিঁড়ে ওয়েস্টপেপার বক্সে ছুঁড়ে ফেলছিল। ওইসব দেখতে দেখতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বুঝতে পারি নি।
১০. নিক এর গোপন কথা
১০. নিক এর গোপন কথা
ঘুম যখন ভাঙল তখন সকাল হয়ে গেছে। কিন্তু গতরাতে পোয়ারোকে ঠিক যে জায়গায় যেভাবে বসে থাকতে দেখেছিলাম সেইভাবেই সে বসে আছে। কিন্তু ওর মুখের অভিব্যক্তিতে ব্যাপক বদল ঘটেছে। ওর চোখদুটো যেন জ্বল জ্বল করছে। আমি সোজা হয়ে বসলাম। জনতে চাইলাম পোয়ারোর কাছে তুমি কিছু খুঁজে পেয়েছে তাই না?
সে মাথা নাড়ে। সামনের টেবিলটায় আঙুল ঠুকে তাল বাজায়। হেস্টিংস, আমার তিনটে প্রশ্নের ঠিক ঠিক মতো উত্তর দেবে।
তিনটে প্রশ্ন! (১) মাদাম জোয়েল বার্কলি সম্প্রতি কেন ঠিক ঘুমোতে পারছিলেন না? (২) কালো রং ওনার পছন্দ নয়, তবু কেন তিনি সেই কালো রঙের পোষাক কিনেছিলেন অনুষ্ঠানের দিন পরবার জন্য? (৩) গতরাতে কেন তিনি বললেন, আমার এখন বেঁচে থাকার কোনও অর্থ নেই?
আমি বিস্ময়ের চোখে পোয়ারোর দিকে তাকাই। প্রশ্নগুলো নিতান্তই অপ্রাসঙ্গিক বলে মনে হল।
উত্তর দাও হেস্টিংস, প্রশ্নগুলোর উত্তর দাও।
প্রথম প্রশ্নটার উত্তরে বলা যায়, সম্প্রতি উনি খুবই উদ্বিগ্ন, দুশ্চিন্তাগ্রস্থ ছিলেন হয়তো। আর কালো রঙ-এর পোক? সব মানুষই তো একটু বদল চায়, হয়তো উনিও তাই চেয়েছিলেন।
আঃ হেস্টিংস, একজন বিবাহিত পুরুষ হয়েও মানবী মনস্তত্ত্ব সম্বন্ধে তোমার কণামাত্রও স্বচ্ছ ধারণা নেই। যদি কোনও মহিলা একবার ভেবে নেয় কোনও বিশেষ রঙ তাকে মানায় না, কখনোই সে সেই রঙ স্পর্শ পর্যন্ত করবে না। আর তৃতীয় প্রশ্ন? সেই ভয়ঙ্কর রাতের অভিজ্ঞতার পর এধরনের কথা স্বাভাবিক বলেই আমার মনে হচ্ছে তাই নয় কি?
না, আমার কাছে মোটেই সেটা স্বাভাবিক বলে মনে হচ্ছে না। নিজের সম্পর্কিত বোনের মৃত্যুর পর সেই ভয়াবহতায় আক্রান্ত হয়ে কেউ নিজেকে সেই ঘটনার জন্যে দায়ী ভাবতেই পারে। সেটা স্বাভাবিক ব্যাপার। উনি ক্লান্ত ভাবেই জীবনের কথা বলেছিলেন। যেটা তার কাছে তত প্রিয় নয় তেমন।
এরকম মানসিকতা ওর আগে ওর মধ্যে কখনও আমরা দেখিনি। এর আগে ওর নানা ভঙ্গী, মানসিকতা আমরা দেখেছি। অবিশ্বাসী, একগুঁয়ে, তুড়ি মেরে সব উড়িয়ে দেওয়া, ভয়ার্ত, সবরকম। কিন্তু সেসব মুহূর্তে জীবন ওনার কাছে ছিল মধুরতম। তিনি মৃত্যুকে ভয় পেয়েছিলেন সেসব মুহূর্তে। কিন্তু জীবন ওনার কাছে ক্লান্তিকর হয়ে ওঠেনি কখনও। না, কখনও নয়। মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন। হেস্টিংস, বড়সড়, মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন চরম বিস্মিত করেছে তাকে। কি এমন ঘটেছিল সে রাতে, যাতে মাদাম জোয়েলের দৃষ্টিভঙ্গীতে এত বিরাট একটা পরিবর্তন ঘটে যায়। কিন্তু মনে রেখো হেস্টিংস মিস ম্যাগির মৃত্যুটাকে ধরা ছিল না, আমি সেই পরিবর্তনের কারণ হিসাবে। কি হতে পারে সেটা?
নাহ, আমার তো কিছুই মাথায় ঢুকছে না।
ভাব হেস্টিংস, ভাব, মস্তিষ্কের গ্রে সেলগুলোকে ব্যবহার করো।
সত্যি কথা বলতে কি……… আমার অসহায় ভঙ্গি দেখেই, কথা শেষ করতে না দিয়েই পোয়ারো বলে ওঠে, শেষবার আমরা ওনাকে ভালভাবে, খুব কাছ থেকে লক্ষ্য করার সুযোগ পেয়েছিলাম?
সম্ভবত রাতে খাওয়া-দাওয়ার সময়।
ঠিক তাই। তারপর আমরা ওনাকে অতিথিদের অভ্যর্থনা করতে, তাদের স্বাগত জানাতে ব্যস্ত থাকতে দেখেছি। পুরোপুরিই গৃহকর্ত্রীর ভূমিকায়। রাতের খাওয়া-দাওয়ার মধ্যে কি ঘটেছিল তোমার মনে আছে হেস্টিংস?
হ্যাঁ, একটা টেলিফোন এসেছিল, উনি সেটা ধরতে গিয়েছিলেন।
যাক, শেষ পর্যন্ত ব্যাপারটা তাহলে তুমি ধরতে পেরেছে। মাদাম জোয়েল টেলিফোনটা রিসিভ করতে উঠে গিয়েছিলেন তা অন্তত পক্ষে মিনিট কুড়ি হবে। আর সেই সময়টা একটা টেলিফোনের জন্য যথেষ্ট বেশি সময় নয় কি? এতসময় টেলিফোনে ওনার সঙ্গে কে কথা বলেছিল এবং সে কি বলেছিল। আদৌ কি সত্যিই টেলিফোন এসেছিল? তুমি কি নিশ্চিত? কিন্তু আমি নিশ্চিত হতে পারছি না। এখন আমাদের কাছে প্রধান কাজ ব্যাপারগুলো ভালভাবে নিরীক্ষণ করে দেখতে হবে যে ওই সময় অর্থাৎ ওই কুড়ি মিনিটে ঠিক কি ঘটেছিল?
