কোথায় একটা ভুল হয়েছে। আমার পদ্ধতি, সিদ্ধান্ত বিচারে কোথাও একটা ভুল ঘটেছে, যার জন্য এই পরিণতির শিকার হয়েছি। নাহ আমি আবার নতুন করে শুরু করব। আর এবার আমি ব্যর্থ হব না। পোয়ারো দৃঢ় গলায় বলে।
তার মানে তুমি মনে করছ, নিক বার্কলির এখনও প্রাণ সংশয় রয়েছে। আমি একটু বিস্মিত গলায় প্রশ্ন করি।
পোয়ারো অবাক হয়ে আমার দিকে তাকায়–নিশ্চয়ই, তা না হলে আমি হঠাৎ করে ওকে ডাক্তারের সঙ্গে নার্সিংহোমে পাঠালাম কেন? সেটা ওর মানসিক আঘাতের শুশ্রূষার জন্য নয়?
মানসিক আঘাত?
হেস্টিংস, একজন তার নিজের বাড়িতে থেকে অনায়াসে মানসিক আঘাত, স্নায়ু দৌর্বল্য সারিয়ে উঠতে পারেন। বস্তুতপক্ষে, নার্সিংহোমের থেকে বাড়িতেই সেটা অনেক ভালভাবে হয়। ওখানকার লাল বা সবুজ লিনোলিয়াস মেঝে, উজ্জ্বল আলো, ট্রে-তে করে আসা খাবার, অথবা নার্সদের বকবকানি, কোনওটাই উত্তমভাবে স্নায়ু দৌর্বল্যের ধকল সামলানোর কোনও বাড়তি কারণ হয় না, হতে পারে না। না, হেস্টিংস একমাত্র নিরাপত্তা সুরক্ষা ছাড়া মাদাম জোয়েলকে ওখানে পাঠাবার আমার আর কোনও কারণ ছিল না। আমি ডাক্তারকে আমার পরিকল্পনা বুঝিয়ে বলতেই সৌভাগ্যবশত উনি রাজি হয়ে গেলেন, তাই সব বন্দোবস্ত হয়ে গেল। যেখানে কেউই ওনার সঙ্গে দেখা করতে পারবে না, এমন কি ওর নিকটতম আত্মীয় পর্যন্তও পারবে না। শুধুমাত্র আমরা কয়েকজন ছাড়া।
পোয়ারো হাসে–ডাক্তারের অনুমতি নেই। বেশি কথাবার্তা ওনার দুর্বল স্নায়ুর পক্ষে ক্ষতি হতে পারে, এটাই সবার ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা জারী থাকবে।
কিন্তু পোয়ারো এভাবে কতদিন? আমি সংশয়গ্রস্থ হয়ে প্রশ্ন করি।
হ্যাঁ, খুবই স্বাভাবিক অনুধাবন। কিন্তু এই মুহূর্তে সাময়িকভাবে এই ব্যবস্থাটা আমাদের শ্বাস নেবার সুযোগ দেবে। আর তুমি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ, আমাদের তদন্তের চরিত্র এবার বদল ঘটবে।
সেটা কি রকম?
এখন থেকে আমাদের প্রাথমিক এবং অবশ্যই সর্বপ্রথম কাজ হবে মাদাম জোয়েলের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা এবং একইসাথে সমান গুরুত্বপূর্ণ কাজ হবে খুনীকে ধরবার চেষ্টা করা।
আহ্ পোয়ারো, প্রিয় বন্ধু, এমনভাবে তুমি কথাটা বলছ যেন সেটা খুব সহজ কোন কাজ।
নিশ্চয়ই হেস্টিংস, নিশ্চয়ই খুব সহজ কাজ।
পোয়ারো গভীর চোখে আমার দিকে তাকায়–আমি তোমাকে বলেছিলাম নিশ্চয়ই তোমার মনে আছে? খুনী অপরাধের ওপর তার নাম সই করে দিয়েছে। সে এখন অন্ধকারের আড়াল ছেড়ে প্রকাশ্যে বের হয়ে আসছে, তা খুব শীঘ্রই আসতে চলেছে।
আমি পোয়ারোর অভিব্যক্তিকে খুঁটিয়ে নিরীক্ষণ করি। তারপর সামান্য ইতস্তত করে বলি–তুমি নিশ্চয়ই ভাবছ যে পুলিশ ঠিক কথাই বলেছে, এটা কোনও বদ্ধ উন্মাদের কাজ? একজন লুনাটিক, হোমিসিডেল ম্যানিয়াক-এর কাজ এটা?
আমি এ বিষয়ে একেবারে নিশ্চিত যে, এটা সেরকম কারও কাজ নয়, হতেই পারে না।
তুমি সত্যিই ভাব… আমি থমকে যাই, পোয়ারো আমার কথার শেষটা থেকে বলতে শুরু করে–খুনী মাদাম জোয়েলের খুব কাছের মানুষদের মধ্যে কেউ একজন, সে ব্যাপারে আমি সম্পূর্ণ নিশ্চিত।
কিন্তু গত রাতের ঘটনাটা কি সেই তত্ত্ব খারিজ করে দিচ্ছে না? আমরা সবাই-ই তো এক জায়গায় জড়ো হয়েছিলাম, সে ক্ষেত্রে….
পোয়ারো এবার আমাকে বাধা দেয়–তুমি কি শপথ করে বলতে পারো হেস্টিংস যে বিশেষ কোনও একজন ব্যক্তি আমাদের সেই বৃত্ত থেকে আচমকা সরে যায়নি, সামান্য সময়ের জন্য হলেও সে সরে গেছে আমাদের বৃত্ত ছেড়ে যেটা তার কাজ সারার পক্ষে যথেষ্ট সময়। তুমি কি এমন একজনের নাম হলফ করে বলতে পারো যে অনুষ্ঠান শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সব সময়ের জন্য তোমার চোখের সামনে ছিল?
না, ওর কথার গূঢ় অর্থের অভিঘাতে আমি বাস্তবতা খুঁজে বেড়াই, কই আমার সেরকম তো মনে হয় না, তাছাড়া আলো অন্ধকারে কারও ওপর সেভাবে নজর রাখা সম্ভব নয়। সবাই তো প্রায় আসে পাশে ঘোরাঘুরি করছিল তারই মধ্যে কে যে কখন কোথায় সরে যাচ্ছে সেভাবে তো নজর রাখিনি, সম্ভবও নয়।
পোয়ারো মাথা নাড়ে সম্মতিবাচক ভঙ্গিতে–একেবারে ঠিক কথা বলেছ। আর ভেবে দেখ, কিছু ঘটানোর জন্য মাত্র কয়েক মিনিটই যথেষ্ট ছিল তার পক্ষে।
পোয়ারো থামে কিছুক্ষণ, তারপর আমাকে বোঝানোর ভঙ্গিতে দু’হাত নেড়ে বলতে শুরু করে–মহিলা দু’জন বাড়ির দিকে রওনা হলেন। খুনী সবার নজর এড়িয়ে ওদের অনুসরণ করল। গাছের আড়াল থেকে খুনী সবকিছুই লক্ষ্য করছে, মহিলারা বাড়িতে ঢুকলেন, তারপর কালো শাল গায়ে দিয়ে মিস বার্কলি দরজার বাইরে এলেন। খুনী আড়াল থেকে সবকিছুই দেখল এবং গাছের আড়াল থেকে লক্ষ্যস্থির করে সে সফলভাবে তিনটি গুলি ছুঁড়ল।
তিনটে? আমি বাধা দিয়ে বলি।
হ্যাঁ, প্রথমবারের ভুল এবার আর করতে চায়নি সে। কোনও ঝুঁকি নেয়নি খুনী। আমরা ম্যাগির শরীরে তিনটে বুলেট পেয়েছি।
কিন্তু পোয়ারো, সেটা তো খুবই ঝুঁকির কাজ হয়েছে, তাই না?
না, সেরকম কিছু নয়। মাউজার পিস্তলে খুব একটা সেরকম আওয়াজ হয় না। তাই খুব যে ঝুঁকি নিয়েছিল খুনী তা বলা যাবে না।
পিস্তলটা পাওয়া গেছে?
না, আর ঠিক সেখানেই আমার সন্দেহটা ঘোরতর বাস্তব চেহারা নিচ্ছে যে কাজটা বহিরাগত কারও পক্ষে করা সম্ভব নয়। আমরা তো আগেই জেনে গেছি যে নিক বার্কলির পিস্তলটা চুরি করা হয়েছে খুনটাকে আত্মহত্যা হিসাবে প্রমাণ করানোর জন্য। এখন তো আর আত্মহত্যার থিয়োরি খাটালে চলবে না। খুনী খুব ভালভাবেই জেনে গেছে যে আমরা সব জেনে গেছি তাই খুনের ব্যাপারটাকে আর আত্মহত্যা বলে চালানো সম্ভব হবে না।
