ঠিক আছে, বুঝেছি। সেই প্রাণহীনতাই এখনও বেজে চলেছে ওর গলায়।
আপনার নিজেকে দোষী ভাববার কোনও কারণ নেই। আমার মনে হয় আপনার পক্ষে যা করা সম্ভব ছিল, সবকিছুই আপনি করেছেন। আমি নিশ্চিত। অন্য কেউ এর থেকে বেশি কিছু করতে পারত না। সুতরাং বিনা কারণে মন খারাপ করবেন না।
আপনি খুব সহৃদয় মাদাম জোয়েল। পোয়ারো বিনীত গলায় বলে।
না, আমি….. কথা শেষ হতে না হতেই দরজাটা প্রায় দড়াম করে খুলে যায়। শ্যালিঙ্গার ঝড়ের গতিতে ঘরে ঢোকে–আমি এই মাত্র এসে পৌঁছলাম। সদর দরজায় একজন পুলিস কর্মীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তার কাছ থেকেই পুরো ঘটনাটা জানতে পারি। নিক…….. নিক…….. তুমি এখন পুরোপুরি সুস্থ তো, তুমি ঠিক আছে তো?
ওর গলায় আতঙ্ক, রাগ মিলে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। ভয়ঙ্কর শোনাচ্ছিল তার কণ্ঠস্বর। নিকের কোনও ক্ষতি হয়নি তো?
পোয়ারো এবং ডাক্তার কম্যান্ডার-এর দৃষ্টিপথ আটকে রেখেছিল। এবার তারা সরে যেতেই শ্যালিঙ্গার-এর নজর পড়ল মিস বার্কলির দিকে। কেমন একটা অদ্ভুত ঘঘারলাগা চোখে তিনি তাকিয়ে রইলেন কয়েকমুহূর্ত। আমার মনে হয় কেমন যেন নেশাতুর মদ্যপের দৃষ্টি। তারপর প্রায় ছুটে গিয়ে নিকের পাশে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লেন। হঠাৎ, আচমকা নিকের মুখটাকে নিজের দুহাতের মধ্যে তুলে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠলেন কম্যাণ্ডার শ্যালিঙ্গার, নিক…. নিক…….. প্রিয়তমা আমার, আমি…… আমি ভেবেছিলাম তুমি মারা গেছ।
মিস বার্কলি ধীরে ধীরে সোফার ওপর উঠে বসলেন–সব ঠিক আছে জর্জ। বোকামি কর না। দেখছ আমি তো সুস্থ, ঠিক আছি।
শ্যালিঙ্গার মাথা তোলেন, উদভ্রান্তের মতো চারপাশে তাকান–কিন্তু, কেউ একজন মারা গেছে, কে? কে সে? পুলিশ কর্মীটি তো বলল-।
নিক এবার বিষণ্ণ, নিচু গলায় বলে–হ্যাঁ, ম্যাগি। বেচারা ম্যাগি…
ওঃ……… এক তীব্র দুঃখে, যন্ত্রণায় ওর মুখের রেখায় ভাঙ্গাচুর ঘটায়। ডাক্তার এবং পোয়ারো এগিয়ে আসেন। ডাক্তার ওর হাত ধরেন, ওকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করেন। তারপর পোয়ারো এবং ডাক্তার দুপাশ থেকে দু’জনে ধরাধরি করে ওকে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যান।
আপনি ডাক্তারের গাড়িতে গিয়ে বসুন, আমি মিসেস রাইসকে বলছি আপনার জরুরী কিছু জিনিসপত্র গুছিয়ে দিতে।–পোয়ারো শান্ত গলায় বলে।
ওরা বেরিয়ে যায় ঘর থেকে। শ্যালিঙ্গার এবার আমার কব্জি চেপে ধরেন হেস্টিংস, ওরা ওকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? আমি সংক্ষেপে পুরো ব্যাপারটা ওকে বললাম।
ওঃ, কি ভয়ঙ্কর ঘটনা। আমার মাথা ঝিমঝিম করছে। কি ভয়ঙ্কর।
আসুন কম্যান্ডার একটা ড্রিঙ্ক নিন, সব ঠিক হয়ে যাবে। আমার মনে তখন আর কোনও দ্বিধা বা সংশয় নেই, থাকার কথাও নয়। নিক সম্পর্কে কম্যান্ডার জর্জ শ্যালিঙ্গারের মনোভাব বিষয়ে, ব্যাপারটা তখন জলের মত স্বচ্ছ।
.
০৯.
এ থেকে জে
আমার মাঝে মাঝে মনে হয়েছিল–যদি আমি সেই রাতটাকে ভুলে যেতে পারতাম, তারপর সেই রাতে যা ঘটেছিল। পোয়ারো অত্যন্ত দুঃখে কাতর হয়ে পড়েছিল–এই শাস্তিটা বোধহয় আমার প্রাপ্য ছিল। আমি অত্যন্ত বেশি মাত্রায় আত্মবিশ্বাসী হয়ে পড়েছিলাম–আমি এরকুল পোয়ারো, নিজের সম্পর্কে অত্যন্ত নিশ্চিত হয়ে পড়েছিলাম।
না, না, ওরকম ভাবে কেন ভাবছো? আমি বাধা দিয়ে বলি।
কিন্তু কেউ কি করে ভাবতে পারে, একজন কি করে ভাবতে পারে–অকল্পনীয়, অতুলনীয় স্পর্ধা। আমি ভেবে নিয়েছিলাম, নিশ্চিত হয়েছিলাম যে আমি যত রকমভাবে সম্ভব সতর্কতা অবলম্বন করেছি। আমি খুনীকে পর্যন্ত সতর্ক করে দিয়েছিলাম।
সতর্ক করে দিয়েছিলে? কি ভাবে? অবাক হয়ে প্রশ্ন করি আমি।
পোয়ারো সশব্দে নিজের হাতের তালুতে জোরাল চাপড় মারে–সমস্ত নজর আমি নিজের দিকে এনে নিয়েছিলাম এবং আমি বুঝিয়ে দিয়েছিলাম কাউকে, কোনও একজনকে সন্দেহ করছি এবং আমি নিজেও বুঝিনি পরিস্থিতি কতখানি জটিল করে তুলেছিলাম। কি ভয়ঙ্করভাবে মরীয়া করে তুলেছিলাম নিজেকে। আমি মাদাম জোয়েলকে ঘিরে একটা বৃত্ত রচনা করেছিলাম এবং তিনি তা থেকে পিছলে বের হয়ে গেলেন। আর আমাদের চোখের সামনেই পিছলে গেলেন অন্যজন। আমরা থাকা সত্ত্বেও, সবাই সতর্ক থাকা সত্ত্বেও। খুনী সে লক্ষ্য পূরণে সম্ভব হল।
না, তা সে পারেনি। আমি ওকে মনে করিয়ে দিই।
আহ, সেটা একটা পরিবর্তন মাত্র। আমার কাছে ব্যাপারটা একই। হেস্টিংস আমার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে ব্যাপারটা একই। একটা মানুষের প্রাণ চলে গেল, যার যাওয়াটা একেবারেই সঙ্গত নয়।
হ্যাঁ, নিশ্চয়ই, সেটা ঠিক। আমি সে কথা বলতে চাইনি।
কিন্তু তুমি যা বলেছ সেটা আমাদের পক্ষে আরও ভয়ঙ্কর, ইঙ্গিতবাহী। হেস্টিংস মনে রেখো, খুনী তার কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছোতে পারেনি। সে আবার আঘাত হানবার জন্যে তৈরি হচ্ছে। বুঝতে পারছ বন্ধু। অবস্থা বদলে গেছে এখন। আরও খারাপের দিকে এগোচ্ছে।
তার মানে, একমাত্র অর্থ হচ্ছে–একটা নয়, দু-দুটো জীবন উৎসর্গ হতে চলেছে।
না, তুমি যতক্ষণ রয়েছ কিছুতেই সেরকম কিছু ঘটা উচিত নয়। দৃঢ় গলায় আমি বললাম।
পোয়ারো আমার হাতটা আলতো করে ধরে–এই বুড়ো মানুষটার ওপর তোমার এখনও ভরসা আছে? বিশ্বাস আছে? তুমি আমায় নতুন করে সাহস দিলে বন্ধু। এরকুল পোয়ারো বারবার ব্যর্থ হবে না। না, এই দ্বিতীয় জীবনের সুযোগটা আমি পুরোপুরি ব্যবহার করব। আমি আমার ভুল শুধরে নেব। একটু থেমে কি যেন ভাবে পোয়ারো।
