পোয়ারোর যুক্তি যে অকাট্য, মনে মনে আমিও সেটা স্বীকার করে নিই–তাহলে এখন পিস্তলটা তার কি কাজে লাগবে?
আমার প্রশ্নে পোয়ারো কাধ বাকায়–এই মুহূর্তে আমি সে সম্পর্কে নিশ্চিত নই। তবে আমি বা তুমি হলে কি করতাম? বিশাল ওই সমুদ্রকে কাজে লাগাতে না? শুধু হাত ঘুরিয়ে গভীর জলে জিনিসটাকে ছুঁড়ে দাও। চিরকালের জন্য সেটা হরিয়ে যাবে, কেউ কোনওদিন খুঁজে পাবে না।
আমার শরীরে পোয়ারোর কথাগুলো মৃদু কম্পন জাগায়–তোমার কি মনে হয়, খুনী বুঝতে পেরেছে যে সে ভুল মানুষকে খুন করেছে?
আমি নিশ্চিত যে এখনও সেটা বুঝে উঠতে পারেনি। ব্যাপারটা অবশ্যই ওর কাছে অসুস্থজনক এক বিস্ময় এবং তিক্ত অভিজ্ঞতা হবে। যখন আসল সত্যিটা সে জানবে। নিজের বিস্ময়ে এবং হতাশা গোপন করা, আসলে কে মিথ্যে শিকার হল তার জানবার কৌতূহল, সেগুলো অবদমন করা সহজ কাজ হবে না।
আর ঠিক তখনই আচমকা আমার মনে পড়ল বিদ্যুৎ চমকের মতো, নিকের বাড়ির পরিচারিকা এলিনের অদ্ভুত আশ্চর্য রকমের কৌতূহলী এবং বিভ্রান্তকর ব্যবহার। আমি দেরি না করে পোয়ারোকে সবিস্তারে ঘটনাটা জানালাম। ব্যাপারটা শুনে পোয়ারোর ভ্রুযুগল অতিমাত্রায় কুঞ্চিত হয়ে উঠল।
ও, অবাক হয়েছিল, তাই তো? ম্যাগি মারা গেছে শুনে অবাক হয়েছিল, অদ্ভুতভাবে আচরণ করছিল।
শুধু অবাক হয়েছিল বললে খুবই কম বলা হবে। নিঃসন্দেহে যথেষ্ট কৌতূহলী ও উদ্দীপক ছিলেন। এরকম একটা দুঃখজনক ঘটনার কথা জেনে, মহিলা আতঙ্কিত বা দুঃখিত হলেন না, বরং কে মারা গেছেন তা নিয়ে দ্বিধায় দুললেন, এমন কি অন্য কেউ মারা গিয়েছেন নাকি সে বিষয়ে সংশয় প্রকাশ করেলন। খুবই কৌতূহলকর ব্যাপার।
কে সে? অন্য সময় সে যথেষ্ট দায়িত্বশীল, শান্ত, তাহলে কি…… এই সে? যাকে… পোয়ারো আচমকা থেমে যায় এবং হঠাৎ করেই গুম মেরে যায়। ধীর পায়ে সারাটা ঘর পায়চারি করতে শুরু করে। ওর মুখ চিন্তার কুঞ্চনে ভারাক্রান্ত। যে যে কাল রাতে এন্ড হাউসে ছিল, তাদের কেউই সন্দেহের উর্ধে নন। তবে……. অতিথিরা, নাহ, আমার মনে হয় না তারা কেউ জড়িত। সত্যি কথা বলতে কি বাড়ির মালকিনের সঙ্গে ওদের কারোরই খুব একটা অন্তরঙ্গতা ছিল না। থমথমে মুখে বলে পোয়ারো।
আর চালর্স ভ্যাইস?
হ্যাঁ, অবশ্যই ওনার কথাগুলো আমাদের ভুললে চলবে না। সত্যি কথা বলতে কি, যুক্তির বিচারে উনি আমাদের একজন প্রবল সন্দেহভাজন- ধীর পায়ে এসে আমার উল্টো দিকের চেয়ারটায় বসে পোয়ারো।
মোটিভ, প্রিয় হেস্টিংস, যাবার আগে আমাদের মোটিভটাকে বুঝতে হবে যদি আমরা এই অপরাধকে সঠিকভাবে বুঝতে চাই। বারবার আমি একটা জটিল গোলক ধাঁধায় ঢুকে পড়েছিলাম। মাদাম জোয়েল নিককে খুন করার কারও কি মোটিভ থাকতে পারে? আমি কোন রকমের সম্ভাবনাকেই বাদ দিই নি। সব কিছু নেড়েচেড়ে দেখেছি।
পোয়ারো একটু থামে। যেন দম নেবার অছিলায় কিছু ভাবে। তারপর আবার বলতে শুরু করে–এমন কি, লাজারুম সিনিয়র যে পুরানো তৈল চিত্রটা কিনতে চেয়েছেন, সেটা কোনও দুর্মূল্য পেন্টিং নয় তো? আমি একজন বিশেষজ্ঞকে দিয়ে ছবিটা পরীক্ষাও করিয়েছি। তোমার মনে আছে নিশ্চয়ই, তোমার হাত দিয়ে মাদাম জোয়েলকে আমি একটি চিরকুট পাঠিয়েছিলাম একজন আসবেন তিনি যা করতে চাইবেন বিনা বাধায় ও বিনা প্রশ্নে তাকে যেন তা করতে দেওয়া হয়। কিন্তু সেই বিশেষজ্ঞ রায় দিয়েছেন ছবিটা মোটেই কয়েকশো পাউন্ডের বেশি দাম হবে না।
লাজারুম? তার মত একজন ধনী……তুমি নিশ্চয়ই সত্যি তা বিশ্বাস কর না।
সত্যি সে ধনী তো? দর্শনধারী হলেই কিন্তু সবকিছু প্রমাণ হয় না। আমরা কোনও কিছুকেই যেমন নিশ্চিতভাবে ধরে নিতে পারি না, আবার সামান্যতম কিছুকেও উপেক্ষা করতে পারি না। কারণ কোনটা যে আমাদের সত্যের কাছাকাছি নিয়ে যাবে আমরাই নিশ্চিত করে জানি না।
পোয়ারো টেবিলের ওপর পড়ে থাকা বস্তুগুলোকে আঙুল দিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে খুব শান্ত গলায় বলে–থাক, আবার ফিরে যাওয়া যাক আসল কথায়। শুরু করা যাক মোটিভ নিয়ে। একটা খুনের কি মোটিভ হতে পারে? কি কি কারণ থাকতে পারে যার জন্য একজন মানুষ আর একজনকে প্রাণে মেরে ফেলতে পারে?
পোয়ারো একটা গভীর শ্বাস নেয়। জামার হাতার ভঁজে আঙুল ঘষে সেটাকে সোজা করতে করতে বলে–বিকারগ্রস্থ খুনীদের আমরা এখানে বাদই দিচ্ছি। কারণ আমি ভাল ভাবেই জানি যে আমাদের বর্তমান সমস্যার ক্ষেত্রে এদের ভূমিকা হতে পারে না। তাছাড়া রাগের মাথায় বা আকস্মিক উত্তেজনার বশে খুন হলে এর লক্ষণ অন্যরকম হবে। না এটাকেও গ্রহণযোগ্য বলে মনে হচ্ছে না। এটা খুব ঠান্ডা মাথায়, পরিকল্পিত ভাবে খুন। এছাড়া আর কি হতে পারে?
এবার আমি মুখ খুলি–প্রথমত, লাভের জন্য খুন। মাদাম বার্কলি খুন হলে যাঁরা কোনও ভাবে লাভবান হবেন, সেটা প্রত্যক্ষ ভাবেই হোক বা অপ্রত্যক্ষভাবেই হোক। সেক্ষেত্রে আমার মনে হয় চার্লস ভ্যাইসকে আমরা বাদ দিতে পারি। কারণ উত্তরাধিকারী সূত্রে তার এমন কোনও লাভের বা প্রাপ্তি যোগের সম্ভাবনা নেই যে সে খুনের মত অপরাধে প্ররোচিত হতে পারে।
হ্যাঁ, মাত্র একজন আছেন, যিনি মাদাম জোয়েল বার্কলির মৃত্যুতে লাভবান হবেন। তিনি ওঁরই বান্ধবী, মিসেস রাইস। কিন্তু সেক্ষেত্রে লাভের অঙ্কটা এতই কম যে খুনের মত অপরাধের কথা কেউ ভাবতেও রাজি হবে না।
