তাতে কি লাভ? আমার এই সুন্দর স্টুডেন্ট হোমের এখন বদনাম হবে। কেউ আর এখানে আসবে না। সোফায় বসে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ল মিসেস নিকোলেটিস। কেউ আমার কথা চিন্তা করে না। কাল যদি আমি মরে যাই, কেই বা তোয়াক্কা করবে?
বুদ্ধিমতীর মতো তার এই সব অবান্তর প্রশ্ন অনুত্তর রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো মিসেস হার্বার্ড। ঈশ্বর আমাকে ধৈর্য ধরার ক্ষমতা দাও। নিজের মনে বলে রান্নাঘরে ঢুকল মিসেস হার্বার্ড, রাঁধুনী মারিয়ার সাক্ষাৎকার নেওয়ার জন্য। মারিয়ার মুখ সবসময় গোমড়া ও অসহযোগী মনোভাব। পুলিশ-এর কথা হাওয়ায় তার কানে ভেসে এসে থাকবে।
দেখছি এবার আমাকেও অভিযুক্ত করা হবে। আমাকে আর গেরোনিমোকে। বিদেশে আমরা কি সুবিচার আশা করতে পারি? আমি আর এখানে রান্নার কাজ করতে পারব না।
বেশ, তুমি যা খুশী করতে পার। রাগত স্বরে বলে, রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল মিসেস হার্বার্ড।
সেদিন সন্ধ্যা ছটায় মিসেস হার্বার্ড আর একবার তার দক্ষতার পরিচয় দিলেন। ছাত্রছাত্রীদের জানিয়ে দিল, তারা যেন নৈশভোজের আগে তার সঙ্গে দেখা করে। তার আহ্বানে সবাই যখন সাড়া দিতে হাজির হল, সে তখন তাদের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলে, সিলিয়া তাকে হারানো জিনিষগুলো কেনার ব্যবস্থা করতে বলেছে, আগাম একটা চেকও দিয়েছে সে। এ খবর শুনে সবাই খুশী। এমনকি একগুঁয়ে স্বভাবের জেনেভিভও তার হারানো পাউডার ফিরে পাওয়ার আনন্দে বলল, আমি জানি সিলিয়ার আর্থিক সচ্ছলতা আছে, ওর মতো মেয়ে কখনো চুরি করতে পারে না। এটা একটা দুর্ঘটনা মাত্র। মঁসিয়ে ম্যাকনার ঠিকই বলেছিলেন।
নৈশভোজের ঘন্টা বাজতেই সবাই ডাইনিংরুমে আসলো। সিলিয়া তখনও আসেনি। লেন বেটসন মিসেস হার্বার্ডকে বলল, হলের বাইরে আমি সিলিয়ার জন্য অপেক্ষা করব। আমি তাকে নিয়ে আসব। যাতে সে দেখতে পায় সব ঠিকঠাক চলছে।
সে তোমার বদান্যতার পরিচয় দেয়।
ঠিক আছে মা, চললাম।
ঠিক সময়ে নৈশভোজের টেবিলে স্যুপ পরিবেশিত হল। আর ঠিক এসময়েই সিলিয়ার গলার আওয়াজ পাওয়া গেল।
এসো সিলিয়া। বন্ধুরা সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।
কলিন ম্যাকনার সবার শেষে এল। নৈশভোজ শেষ হওয়ার ঠিক আগে সে উঠে দাঁড়িয়ে ধরা গলায় বলল, একজনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলাম, তাই দেরি হল। যাহোক, প্রথমে আমি তোমাদের একটা শুভ সংবাদ দেই–আগামী বছর আমার কোর্স শেষ হলে আশা করছি আমি আর সিলিয়া বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হব।
খবরটা শুনে সবাই লাফিয়ে উঠলো, বন্ধুদের অভিনন্দন আর ভালোবাসায় ডুবে গেল কলিন। সবাই তাকে ধন্য ধন্য করতে থাকলো তার এই নির্ভীক সিদ্ধান্তের জন্য। শেষ পর্যন্ত তাদের আলিঙ্গন থেকে কোনোরকমে ছাড়া পেয়ে পালিয়ে বাঁচলো সে, ভয়ঙ্কর লজ্জা তাকে পেয়ে বসেছিল। আর সিলিয়ার মুখটা তখন রক্তিমাভা ধারণ করেছিল। ওর মুখ দেখে মনে হল, বুঝি ওর শরীরের সমস্ত রক্ত উঠে এসেছে ওর সারা মুখে।
সিলিয়ার পক্ষে ও বিপক্ষে ভালো ও মন্দ মেশানো বন্ধুদের নানান মন্তব্যের উত্তরে সিলিয়া ম্লান স্বরে বললো, ওহো আমার মনে হয়, আমি এ কাজ করেছি–তবে আশা করি আগামীকাল সব পরিষ্কার হয়ে যাবে। আমাদের মনের সন্দেহের সব জমা মেঘ সরে রৌদ্র ঝলমলিয়ে উঠবে। সত্যিই আমি তাই মনে করি। এলিজাবেথ, তোমার নোটে কালি ছেটানো পিঠে ঝোলানো ব্যাগ টুকরো টুকরো করে ছেঁড়া, এসব কুকাজ যে করেছে আমার মতো এগিয়ে এসে সেও যদি দোষ স্বীকার করে তো সব কিছুই পরিষ্কার হয়ে যায়।
খুশীর হাসিতে ফেটে পড়ল ভ্যালেরি। তারপর আমরা আবার একসঙ্গে মিলেমিশে সুখে শান্তিতে বাস করতে পারব।
তারপর সবাই মিলে কমনরুমে গিয়ে বসল। সবার মধ্যে প্রতিযোগিতা শুরু হল কে সিলিয়াকে কফির পেয়ালা এগিয়ে দেবে। কফি খাওয়া হলে সবাই কমনরুম ছেড়ে চলে গেল। তারপর ২৪ ও ২৬ নম্বর হিকরি রোডের বাসিন্দারা যে যার মতো ঘুমিয়ে পড়ল।
ওদিকে ক্লান্ত দেহটা বিছানায় এলিয়ে দিয়ে মিসেস হার্বার্ড মনে মনে বলল, এই শুভ সূচনার জন্য ধন্যবাদ। এখন আমরা সব চিন্তা উদ্বেগ কাটিয়ে উঠেছি।
.
০৭.
মিস লেমনের খুবই কদাচিত দেরি হয়। দশ মিনিট দেরিতে অফিসে ঢোকামাত্র সে ক্ষমা চাইল।
আমি অত্যন্ত দুঃখিত মঁসিয়ে পোয়ারো। অফিসে আসার জন্য বেরোতে যাব হঠাৎ ঠিক সেসময়ই বোন ফোন করল।
আহ, আমার বিশ্বাস, শারীরিক ও মানসিক দিক দিয়ে নিশ্চয়ই সুস্থ সে।
নাঃ মাথা নাড়ল মিস্ লেমন। সত্যি কথা বলতে কি, অত্যন্ত বিপর্যস্ত সে। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে একজন আত্মহত্যা করেছে।
পোয়ারোর দৃষ্টি স্থির, পলক ফেলতে বুঝি ভুলে গেছে সে। আচ্ছা, তার নাম কি বলো তো?
সিলিয়া অস্টিন।
কি করে?
ওদের ধারণা মরফিয়া নিয়ে থাকবে সে।
এটা কি দুর্ঘটনা বলে মনে হয়?
ওহো না, মনে হয় নোট সে লিখে গেছে।
এমনটা আশা করিনি। তবে এটা সত্যি যে আমি কিছু একটা আশা করেছিলাম। পোয়ারো বলল।
পেন্সিল আর প্যাড নিয়ে বসল মিস্ লেমন।
না, আজ আর কোনো নোট দেওয়া নয়। সকালের ডাকগুলো খুলে দেখ। চিঠিগুলো ফাইল করে দিও। উঠে দাঁড়ালো পোয়ারো, ফোন এলে যাহোক কিছু বলে দিও। আমি এখন হিকরি রোডে চললাম।
.
পোয়ারাকে আহ্বান করলো গেরোনিমো। আগের দুরাতের সম্মানিত অতিথিকে সে চিনতে পারল। সঙ্গে সঙ্গে ফিসফিস করে স্বচ্ছন্দে বললো, আঃ সিনিয়ার, আপনি এসে গেছেন? আমরা এখানে একটা ভীষণ গণ্ডগোলের মধ্যে পড়েছি। সিলিয়া অস্টিনকে আজ সকালে মৃত অবস্থায় তার বিছানায় পাওয়া গেছে। প্রথমে ডাক্তার, তারপর পুলিস ইনসপেক্টরও তার দলবল নিয়ে এসে গেছে উপরে। কেন যে তিনি আত্মহত্যা করলেন? গতকাল রাতে আনন্দ উৎসবে তার বাগদান পাকা হল।
