ছেলেটার ক্ষতস্থানটা শক্ত করে বেঁধে দাও, হুমায়ুন চিৎকার করে বলে। তাকে দ্রুত আমাদের শিবিরের হেকিমের কাছে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা কর। সে অল্পবয়সী আর দারুণ সাহসী। তার বেঁচে থাকার একটা সুযোগ পাওয়া উচিত। হুমায়ুনের দেহরক্ষীদের একজন দ্রুত এগিয়ে যায় তাঁর আদেশ পালন করতে।
আরেক পশলা তীর এসে আছড়ে পড়ে কিন্তু এবার সংখ্যায় অনেক কম। এই দফা হতাহতের ভিতরে রয়েছে কেবল একজন অশ্বারোহীর মাদী ঘোড়া যা গলায় দুটো কালো পালকযুক্ত তীর বিদ্ধ অবস্থায় মাটিতে আছড়ে পড়ে। ঘোড়ার আরোহী, গাট্টাগোট্টা দেখতে এক তাজিক, ঘোড়াটা মাটিতে পড়ার সময় লাফিয়ে উঠে সরে যায় ঠিকই কিন্তু ভারী দেহ নিয়ে মাটিতে পরার সময় সে পিছলে গেলে তার বুকের সব বাতাস বের হয়ে যাওয়া কিছুক্ষণ মাটিতে শুয়ে থেকে তারপরে টলমল করতে করতে উঠে দাঁড়ায়।
বৈরাম খান চল্লিশজন যোদ্ধার একটা দল পাঠান এইসব তীর নিক্ষেপের অবস্থান সনাক্ত করতে এবং শত্রুপক্ষের তীরন্দাজদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে। আর বাকী যারা এখানে রয়েছে আমাকে বিজয়ের পথে অনুসরণ কর।
বৈরাম খান দ্রুত প্রহরী অবস্থানের দফারফা করতে যখন তোক বাছাই করছে হুমায়ুন সেই ফাঁকে আলমগীর ময়ান থেকে আজ রাতে প্রথমবারের মতো বের করে আনে। তরবারিটা নিজের সামনে টানটান করে ধরে রেখে আর দেহরক্ষী পরিবেষ্টিত অবস্থায় এবং মুস্তাফা আর্গুন আর তাঁর ভাড়াটে যোদ্ধাদের পেছনে নিয়ে সে তার কালো ঘোড়ার পাঁজরে গুঁতো দিয়ে কাদার উপরে যতটা জোরে তাঁকে ছোটান সম্ভব সেই গতিতে সামনের দিকে ছুটতে শুরু করে শিবিরের অভ্যন্তরভাগ তার লক্ষ্য। ইতিমধ্যে পূর্বাকাশে ভোরের পূর্বাভাষ হয়ে আলো কিঞ্চিত ফুটতে শুরু করেছে কিন্তু ঘোড়ার কাঁধের কাছে মাথা নীচু করে রেখে ধেয়ে যাবার সময়ে বৃষ্টির কারণে এখনও হুমায়ুন খুব ভালো করে চারপাশের কিছুই দেখতে পায় না। তারপরে, মিনিটখানে পরে সে তার সামনে ঘন সন্নিবদ্ধ কালো কালো তাবুর সারি দেখতে পায় এবং একই সময়ে সিকান্দার শাহর লোকেরা তাবুর ভেতর থেকে বের হয়ে এসে ময়ান থেকে অস্ত্র বের করতে শুরু করলে তাদের সম্মিলিত চিৎকারের শব্দ তার কানে ভেসে আসে।
তাবুগুলো উপরে ফেলো শত্রুদের ভেতরেই আটকে রাখতে। যারা ইতিমধ্যে বের হয়েছে তাঁদের ঘোড়ার পায়ের নীচে পিষ্ট করে দাও। নিজেই নিজের আদেশ অনুসরণ করে হুমায়ুন তার পর্যাণ থেকে সামনের দিকে ঝুঁকে আসে এবং একটা বিশালাকৃতি তাবুকে টানটান করে ধরে রাখা দড়ি লক্ষ্য করে তরবারি চালায়, যা তাসের ঘরের মতো মাটিতে দুমড়ে পড়ে যায়। তারপরে সে দ্বিতীয় আরেকটা আবছা অবয়ব লক্ষ্য করে তরবারি চালায় যে পরের তাবু থেকে বের হয়ে এসেই নিজের দুই মাথাযুক্ত ধনুকে তীর জুড়তে আরম্ভ করেছিল। হুমায়ুন টের পায় আলমগীর লোকটার অরক্ষিত বুকের মাংসের গভীরে কেটে বসে গিয়ে বেচারার হাড়ে কামড় দেয়। তীরন্দাজ লোকটা ছটফট করে উঠে এবং হুমায়ুনের আগুয়ান এক অশ্বারোহীর ঘোড়ার খুরের নীচে পিষে যায় আর ছিটকে শূন্যে ভাসে।
হুমায়ুনের অন্য সৈন্যরা তার চারপাশে ঘোড়া থেকে লাফিয়ে নামতে শুরু করে আরও ভালো করে তাবু বিধ্বস্ত করে শত্রুর সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষে অবতীর্ণ হতে। হুমায়ুন অচিরেই লোকদের মাটিতে গড়াতে গড়াতে কেবল একে অন্যের সাথে লড়তে আর আঘাত করা দেখতে পায়। সে তার এক যোদ্ধাকে চিনতে পারে, কোকড়ানো দাড়ির পেষলদেহী এক বাদখশানি যে প্রতিপক্ষের কাঁধের উপরে বসে মুখে একটা চওড়া হাসি নিয়ে তার মাথাটা গায়ের জোরে পেছনের দিকে টানছে। হুমায়ুন তাকিয়ে রয়েছে দেখে, সে লোকটার মাথাটা এবার সজোরে সামনে দিকে ঠেলে দিয়ে জলকাদায় ভর্তি একটা গর্তে ঠেসে ধরে। সে সেখানেই মাথাটা কয়েক মিনিট ঠেসে ধরে থাকে তারপরে প্রাণহীন দেহটা একপাশে ছুঁড়ে ফেলে দেয়।
তার আরেকজন জন পায়ে দড়ি বাধা একপাল ঘোড়ার দিকে দৌড়ে গিয়ে সেগুলোর পায়ের দড়ি কাতে শুরু করে। সে তাদের পায়ের দড়ি কাটার সময়ে প্রত্যেকের পাছায় সজোরে একটা করে থাপ্পড় দিতে থাকলে ঘোড়াগুলো আবছা আলোর ভিতরে সামনের দিকে দৌড়ে হারিয়ে যায়। বেশ বেশ, হুমায়ুন মনে মনে ভাবে ঘোড়াগুলো সদ্য ঘুম ভেঙে জেগে উঠা শত্রুদের ভিতরে কেবল বিভ্রান্তি আর আতঙ্কই বাড়িয়ে তুলবে। তার সৈন্যদের আরেকজন একটা বিধ্বস্ত তাবুর বাইরে বর্শা রাখার স্থান থেকে একটা বর্শা তুলে নিয়ে সেই তাবুর ভাঁজের নীচে ধ্বস্তাধ্বস্তি করতে থাকা দুটো অবয়বকে বর্শার ফলা দিয়ে খোঁচাতে আরম্ভ করে। কাতরাতে থাকা দেহ দুটো শীঘ্রই শান্ত হয়ে যায় এবং তাবুর কাপড়ের গায়ে একটা গাঢ় দাগ দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
এদিকে এসো, হুমায়ুন মুস্তাফা আর্গুনকে চিৎকার করে ডাকে, আলো ফুটতে আরম্ভ করেছে। আমরা এখন অনেক ভালোমতো দেখতে পাব এবার সিকান্দার শাহের ব্যক্তিগত আবাসন স্থান খুঁজে দেখা যেতে পারে। বৈরাম খান আপনিও আপনার লোকদের নিয়ে আমায় অনুসরণ করুন।
দ্রুত জোরাল হতে থাকা আলোর মাঝে প্রায় আধ মাইল দূরে হুমায়ুন অচিরেই একটা নীচু ঢালের উপরে একটা ফাঁকা আয়তাকার স্থানের চারপাশে বিশাল কিছু তাবুর জটলা সনাক্ত করে যেখানে- আয়তাকার স্থানের কেন্দ্রে একটা বিশাল তাবুর বাইরে একটা বিশাল নিশান ঝাণ্ডার মাথায় ভেজা আর ভারী অবস্থান ঝুলছে নিঃসন্দেহে সিকান্দার শাহর নিজস্ব তাবু। হুমায়ুন ঘোড়া নিয়ে কাছাকাছি পৌঁছাতে দেখে বেশ কিছু সংখ্যক লোক তাবুর চারপাশে জটলা করছে। তাদের অনেকেই ইতিমধ্যে বক্ষস্থল রক্ষাকারী বর্ম আর শিরোস্ত্রাণ ধারণ করেছে, অন্যেরা তাদের ঘোড়ার পিঠে পৰ্যান ছুঁড়ে দিয়ে হাত পায়ের সাহায্যে অরক্ষিত অবস্থায় কোনোমতে সেগুলোর পিঠে চড়ে বসে নিজেদের রক্ষা করতে প্রস্তুতি গ্রহণ করছে।
