জওহর আদেশ নিয়ে রওয়ানা দেয় এবং হুমায়ুন বিদ্যুৎচমকের ভিতরে কোনমতে বৈরাম খানের যযাদ্ধাদের যুদ্ধের বিন্যাসে বিন্যস্ত হতে দেখে। যুদ্ধ এখন আসন্ন হয়ে উঠায়, হুমায়ুন অনুভব করে তার ভিতরে কোনো ভয় কাজ করছে না কেবল তার অনুভূতিগুলো যেন অতিমাত্রায় সজাগ হয়ে উঠেছে যা প্রতিটা মুহূর্তকে একটা মিনিটের, একেকটা মিনিটকে এক ঘন্টার দ্যোতনা দান করেছে এবং তার দৃষ্টিশক্তিও যেন প্রখর হয়ে উঠেছে যার ফলে জওহর তাঁর কাছে এসে বৈরাম খানের প্রস্তুতির কথা তাঁকে বলার পূর্বেই যেন গাঢ় অন্ধকারের ভিতরে সে দেখতে পায় বৈরাম খান তার উদ্দেশ্যে ইশারা করছে।
হুমায়ুন তার হাতের চামড়ার দাস্তানা আরেকবার ভালোকরে টেনে নেয় এবং সহজাত প্রবৃত্তির বশে তার পাশে রত্নখচিত ময়ানে আবদ্ধ অবস্থায় ঝুলন্ত তার আব্বাজানের তরবারি আলমগীর স্পর্শ করে। সে তারপরে রেকাবে তার পদযুগল ভালোকরে পুনরায় ভালো করে স্থাপন করে যাতে সেগুলো পিছলে না যায় এবং অবশেষে নিজের বিশাল কালো ঘোড়ার পাজরে গুঁতো দিয়ে আহমেদ খানের সাথে যেখানে বৈরাম খান অপেক্ষা করছে সেদিকে এগিয়ে যায়। আহমেদ খান তাঁর ছয়জন গুপ্তদূতের সাথে নিজে আক্রমণের নেতৃত্ব দেবেন যারা আগেই তথ্যানুসন্ধানী অভিযানে অংশ নিয়েছিল। পথ প্রদর্শক দলের প্রত্যেকের সাদা সুতির কাপড় জড়ান রয়েছে যাতে করে আলো আধারির মাঝে তাদের সহজেই অনুসরণ করা যায়।
আল্লাহ আমাদের সহায় হোন, হুমায়ুন বলে। আহমেদ খান, আল্লাহর নামে যাত্রা শুরু করেন।
আহমেদ খান কেবল মাথা নাড়ে এবং সামনে এগিয়ে যায়। অন্য ছয়জন গুপ্তদূত দ্রুত তাকে অনুসরণ করে তারপরেই থাকে বৈরাম খান আর তার তরুণ সহকারী কর্চি তাঁর অল্পবয়সী মুখে আগের চেয়ে এখন দৃঢ় আর প্রতিজ্ঞবদ্ধ অভিব্যক্তি ফুটে থাকায় তাকে এখন পুরোপুরি প্রস্তুত দেখায়। হুমায়ুনও ঘোড়ার মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে তাঁদের সাথে গাঢ় অন্ধকার আর বৃষ্টির ভিতর দিয়ে সিকান্দার শাহের শিবিরের দিকে এগিয়ে যায়।
পারিপার্শ্বিক অবস্থার কারণে তারা অর্ধবল্পিত বেগের চেয়ে দ্রুত গতিতে ঘোড়া ছোটাতে পারে না। ঘোড়ার খুরের সাথে এরপরেও কাদামাটির বিশাল চাই আর পানি শূন্যে নিক্ষিপ্ত হতে থাকে এবং পেছনের অনুসরণকারীদের মাখামাখি করে দেয়। তারা রওয়ানা দেবার পরে দুই কি তিন মিনিটও অতিবাহিত হয়নি এমন সময় আহমেদ খান নীচু বোল্ডারের একটা জটলার পাশে নিজের ঘোড়ার লাগাম টেনে ধরলে হুমায়ুন তাঁর পাশে গিয়ে দাঁড়ায়।
সুলতান, আহমেদ খান মৃদু কণ্ঠে কথা বলতে শুরু করে, এই পাথরগুলো শেষ গুরুত্বপূর্ণ নিশানা। আমাদের ঠিক সামনে এখান থেকে প্রায় ছয়শ গজ দূরে সিকান্দার শাহের শিবিরের দেয়াল অবস্থিত।
মই বহনকারী জোড়া অশ্বারোহীদের ডেকে পাঠাও।
যূথবদ্ধ অবস্থায় অশ্বারোহীরা এগিয়ে আসলে দেখা যায় তাঁদের দুই ঘোড়ার মধ্যবর্তী স্থানে চামড়র ফালি দিয়ে বাঁধা রুক্ষ মইগুলো ঝুলছে, বৃষ্টির বেগ ধরে আসে এবং প্রায় অলৌকিক একটা ব্যাপারের মতো আকাশে মেঘের দলের মাঝে তৈরী ফাঁকে ধুসর আর পানি পানি আবহ নিয়ে চাঁদ উঠে। কয়েক মুহূর্ত পরে পুনরায় মেঘের আড়ালে চাঁদটা হারিয়ে যাবার আগে হুমায়ুন সিকান্দার শাহের শিবিরের বিরোধক দেয়ালের একটা ঝলক দেখতে পায়। আহমেদ খানের কথা অনুযায়ী দেয়ালটা প্রায় আট ফিট উঁচু হবে এবং মাটির তৈরী যা কয়েক জায়গায় মনে হয় ধ্বসে গিয়ে সেখানটায় মাটির একটা টিলার মতো রূপ নিয়েছে।
তার লোকেরা কিছুক্ষণ পরেই দেয়ালের দিকে এগিয়ে গিয়ে দ্রুত ঘোড়া থেকে নেমে মইগুলো জায়গামতো স্থাপণ করে এবং সেগুলো বেয়ে তড়বড় করে। দেয়ালের উপরে উঠে যাওয়া পর্যন্ত প্রহরীদের কোনো চিহ্ন দেখা যায় না। মাটির দেয়ালের উপর উঠেই তার লোকেরা কেউ কেউ খালি পায়ে মাটির উপর লাথি মেরে কেউবা পিঠে বেঁধে নিয়ে নিয়ে আসা কোদাল দিয়ে মাটি আলগা করতে শুরু করে। শীঘ্রই দেয়ালের প্রায় ত্রিশ ফিটের মতো জায়গা ধ্বসে গিয়ে নীচু একটা ঢিবিতে পরিণত হয় আর বৈরাম খান পেছনে অনুগত কর্চিদের নিয়ে নিরবে অশ্বারোহী যোদ্ধাদের নেতৃত্ব দিয়ে শিবিরের ভিতরে প্রবেশ করে। বৃষ্টি আবার মুষলধারে শুরু হয়েছে এবং হুমায়ুন আর তাঁর দেহরক্ষীরা দেয়ালের অবশিষ্টাংশ অতিক্রম করে ভেতরে প্রবেশ করার পরেও কোথাও কোনো হুশিয়ারির সংকেত দেখতে পায় না।
সহসা হুমায়ুনের সামনে কোথাও থেকে অবশ্য বিস্মিত চিল্কারের একটা আওয়াজ ভেসে আসে। শত্রু, হুশিয়ার! আরেকটা ক্ষীণ চিৎকারের শব্দ সামনে মাটির দেয়ালের কাছ থেকে ভেসে আসে, তারপরেই একই দিক থেকে উচ্চনাদে শিঙ্গার শব্দ শোনা যায়। প্রহরীকক্ষের কোনো তন্দ্রাচ্ছন্ন সৈন্য সম্ভবত তাঁদের চারপাশে ঘটতে থাকা বিপর্যয়ের মাঝে হয়ত জেগে উঠেছিল এবং সেই হুশিয়ারি ধ্বনিত করেছে। শিবিরের কেন্দ্রস্থল থেকে তূর্যনাদের মাধ্যমে প্রত্যুত্তর ভেসে আসতে শুরু করে।
বিস্ময়ের মেয়াদ উত্তীর্ণ হবার পরে হুমায়ুন এখন অনুভব করে যে তার এবং তার লোকদের এবার দ্রুত অগ্রসর হয়ে যদ্রুত সম্ভব শত্রুদের নিশ্চিহ্ন করতে হবে যাতে তারা অস্ত্র সজ্জিত হয়ে প্রতিরক্ষা ব্যুহ বিন্যাস করার সময় না পায়। হুমায়ুন শিবিরের কেন্দ্রস্থলের দিকে অগ্রসর হবার আদেশ দেবার জন্য বৈরাম খানের দিকে ঘোড়া নিয়ে এগিয়ে যাবার চেষ্টা করতেই প্রহরীদের অবস্থানের দিক থেকে বৃষ্টির ফোঁটার সাথে তীর্যকভাবে তীরের বিশৃঙ্খলভাবে নিক্ষিপ্ত একটা ঝাঁক এসে তাঁদের অবস্থানের উপরে আছড়ে পড়ে। একটা তীর হুমায়ুনের পর্যানে বিদ্ধ হয়। আরেকটা বৈরাম খানের বক্ষস্থল রক্ষাকারী বর্মে নিরীহ ভঙ্গিতে ঠিকরে যায় কিন্তু তৃতীয় আরেকটা তীর বৈরাম খানের তরুর কচির উরুতে বিদ্ধ হয়। ছেলেটা মরীয়া ভঙ্গিতে নিজের পা খামচে ধরে এবং তার আঙ্গুলের ফাঁক দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়তে শুরু করলে তার গলা চিরে একটা চাপা কান্নার শব্দ ভেসে আসে।
