*
জওহর সকাল দুইটার দিকে সন্তর্পণে হুমায়ুনের তাবুতে প্রবেশ করে তাঁকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতে কিন্তু সে এসে দেখে যে হুমায়ুন ইতিমধ্যেই জেগে গিয়েছে। বেশ কিছুক্ষণ আগেই তার ঘুম ভেঙেছে। তাঁর তাবুর উপরে একঘেয়ে সুরে পড়তে থাকা বৃষ্টির শব্দ শুনতে শুনতে সে মনে মনে যুদ্ধের পরিকল্পনাটা বার বার খুটিয়ে দেখে আগে যদি কিছু তাঁর দৃষ্টি এড়িয়ে গিয়ে থাকে সেটা খুঁজে দেখতে। একটা সময় সে নিজেকে নিশ্চিত করে যে কোনো কিছুই তার দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি।
তার ভাবনার গতিপথ এরপরে অনিচ্ছাকৃতভাবেই সতের বছর পূর্বে শেরশাহকে মোকাবেলার জন্য প্রথমবারের মতো আগ্রা ত্যাগ করার পরে তাঁর জীবনের ঘটনাবলীর দিকে ধাবিত হয়। সেই সময়ে- সে এখন অনুধাবন করে- সে অনেক অপরিণত ছিল, বিশ্বাস করতে মুখিয়ে ছিল যে সাফল্যে তার ন্যায়সঙ্গত অধিকার এবং সেই কারণে সাফল্য অর্জনের জন্য নিজের ভিতরের সবশক্তি প্রয়োগে যথেষ্ট প্রণোদনা ছিল না। সে অবশ্য কখনও নিজের এবং নিজের নিয়তির উপর বিশ্বাস হারায়নি এবং কোনো বিপর্যয় যতই ভয়ঙ্কর হোক তাঁর মাত্রা কখনও বিশ্বাস করেনি যে তার চূড়ান্ত পরাজয় ঘটেছে। সে ভীষণভাবে কৃতজ্ঞ যে দ্বিতীয় একটা সুযোগ পেয়েছে এবং এজন্য সে জানে জন্মে সময় তাঁর নাম হুমায়ুন সৌভাগ্যবান রাখা হয়েছিল। অসংখ্য মানুষ। এমনকি রাজারাও একবারই মাত্র সুযোগ লাভ করে এবং তারা যদি সেটা গ্রহণ না করে তাহলে ইতিহাসের গর্ভে তারা এমনভাবে হারিয়ে যায় যেন তাদের কোনো অস্তিত্বই ছিল না, তাঁদের সমস্ত প্রতিশ্রুতি, তাঁদের সমস্ত আশা আর আকাঙ্খা সবই অনন্ত বিস্মরণের আবর্তে হারিয়ে যায়। সে তার রাজত্বকালে একটা বিষয় ভালোভাবে শিখেছে যে যুদ্ধক্ষেত্রে সাহসিকতার ন্যায় সবসময়ে একটা অদম্য মনোভাব পোষণ করাটা শাসকের জন্য অতীব জরুরী। আজ, অবশ্য যুদ্ধের দিন এবং সে জানে তাকে আরো একবার নিজের সাহসিকতার পরীক্ষা দিতে হবে।
ভাবনাটা মাথায় আসবার সাথে সাথে, সে যুদ্ধের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে শুরু করে, এই কাজটা যেটায় জওহর এখন তাকে সাহায্য করছে তাকে তার হাঁটু পর্যন্ত লম্বা হলুদ বুট জুতা পরতে এবং সেই সাথে হুমায়ুনের রত্নখচিত, কারুকার্যময় ইস্পাতের বর্মস্থল আবরণকারী বর্মের বাঁধনগুলো আটকে দেয়- এই কাজগুলো তাঁরা তাঁদের অল্প বয়স থেকে একত্রে করে আসছে। জওহর অবশেষে যখন তার আব্বাজানের মহান তরবারি আলমগীর তার হাতে তুলে দেয়, হুমায়ুন তার দিকে তাকিয়ে হাসে এবং তার বাহু স্পর্শ করে বলে, আমার বিপদের সময়ে তোমার অনুগত সেবার জন্য তোমায় ধন্যবাদ। আমরা শীঘ্রই আগ্রায় আমাদের মনোরম আবাসন কক্ষে ফিরে যাব।
সুলতান, সেটা নিয়ে আমার মনে কোনো সন্দেহ নেই, জওহর, তাবুর পর্দা তুলে ধরে হুমায়ুনকে বাইরে রাতের ভেজা বাতাসে বের হবার পথ করে দেয়ার ফাঁকে, কথাটা বলে।
আকবর বাইরে তার আব্বাজানের জন্য অপেক্ষা করছিল এবং তারা পরস্পরকে আলিঙ্গণ করে। আকবর তারপরে জানতে চায়, আমি কি আক্রমণে যোগ দিতে পারি না? আমার দুধ-ভাই আধম খানের সৌভাগ্য দেখে আমি ঈর্ষান্বিত যে আক্রমণকারী দলের পুরোভাগে অবস্থান করবে। প্রশিক্ষকের নিকটর যখন আবার আমাদের দেখা হবে যে যুদ্ধে নিজের অংশগ্রহণের বিষয়ে বড়াই করবে যখন আমি…
না, তুমি আমাদের রাজবংশের ভবিষ্যত, হুমায়ুন কথার মাঝে তাঁকে থামিয়ে দিয়ে বলে। আল্লাহ না করুন, যুদ্ধক্ষেত্রে আধম খানের মৃত্যু হলে মাহাম আগা তাঁর জন্য কাঁদবে কিন্তু তাঁর মৃত্যুটা হবে একান্তভাবে তাঁর পরিবারের ব্যাপার। আমি আর তুমি যদি একসাথে যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত হই তাহলে আমাদের বংশই নির্বংশ হয়ে যাবে। আমি সেটা ঘটতে দেবার ঝুঁকি নিতে পারি না তাই তুমি অবশ্যই পেছনে অবস্থান করবে।
হুমায়ুন বুঝতে পারে আকবরের যুদ্ধক্ষেত্রে যাবার অনুমতি চাওয়া সময়ে তাঁর কণ্ঠে প্রত্যাশার চেয়ে আশার আধিক্য ছিল আর ব্যাপারটা সে মনে মনে প্রশংসা না করে পারে না। আকবরের কাছ থেকে সে খানিকটা দূরে বৈরাম খান আর তার অন্যান্য সেনাপতিরা যে নিম গাছের নীচে দাঁড়িয়ে তার প্রতীক্ষা করছে সেদিকে হেঁটে এগিয়ে যাবার সময় আকাশ ক্রমাগত আলোকিত করতে থাকা বিদ্যুচ্চমকের ফলে চারপাশ আলোকিত করা অশরীরি আলোয় সে দেখে যে কয়েক গজ দূরে বৈরাম খানের তরুণ কৰ্চি- তাঁর সহকারী বৃষ্টিতে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার কারণে নিজের আর তার প্রভুর ঘোড়ার লাগাম ধরে দাঁড়িয়ে থাকার সময়ে নুয়ে রয়েছে। হুমায়ুন ঘুরে গিয়ে তাঁর দিকে এগিয়ে যায়। তাঁকে এগিয়ে আসতে দেখে তরুণ সহকারী প্রাণপন চেষ্টায় সোজা হয়ে দাঁড়ায় এবং একটা রুমাল দিয়ে মুখটা মোছে।
তুমি কি সন্ত্রস্ত, .. বা সামান্য ভীত? হুমায়ুন জিজ্ঞেস করে।
সুলতান, বোধ হয় দুটোই, তরুণ সহকারী, যার মুখের মসৃণ ত্বক দেখে বোঝা যায় তার বয়স আকবরের সামনই হবে, অপ্রস্তুত হয়ে বলে।
সেটাই স্বাভাবিক, হুমায়ুন তাকে আশ্বস্ত করে। কিন্তু পানিপথের যুদ্ধের আগে আমার আব্বাজান আমাকে একটা কথা বলেছিলেন, সেটা সবসময়ে মনে রাখতে চেষ্টা করবে। ভয় পাওয়া সত্ত্বেও ঘোড়া নিয়ে যুদ্ধযাত্রা করাই সত্যিকারের সাহসিকতার পরিচায়ক।
