আমি মুগ্ধ আওরঙ্গজেব। তোমার গৃহশিক্ষক জানিয়েছেন যে তুমি কতটা বিদ্যানুরাগী, কিন্তু আমি বুঝতে পারেনি যে কতটা। হয়ত কোন দিন তুমি অনেক বড় বিদ্বান হয়ে উঠবে। জানালেন শাহজাহান।
একজন বিদ্বান? না–আমি আপনার মতন যোদ্ধা হব।
হয়ত।
আমি সত্যিই তাই চাই, পিতা। জ্বলে উঠল আওরঙ্গজেবের তরুণ চেহারা। আমি যা পড়ি সেখানে লেখা আছে যে, মোগলরা হিন্দুস্তান জয় করেছে কলমের জোরে নয়, তলোয়ারের জোরে। এভাবেই আমরা এগিয়ে যাবো।
হাসি চাপলেন শাহজাহান। আওরঙ্গজেবের কৌতুকবোধ তেমন তীক্ষ্ণ নয়, তার অনুভূতিতে সহজেই আঘাত লাগে–এই ব্যাপারটা আর ভাইয়েরাও ভালোই জানে যারা তাকে প্রায়শই খ্যাপায়। আমি নিশ্চিত তুমি তাই হবে যা তুমি হতে চাও।
নিজের পরিবারের দিকে তাকালেন শাহজাহান, সবাই একসাথে বসে আছে। চোখ পড়ে গেল মমতাজের চোখে। ছোট্ট করে প্রায় না বোঝার মতই মাথা নাড়লেন মমতাজ ইশারা করে বুঝালেন যে মধ্যরাতে নিজেদের মাঝে হওয়া বিষয়ে অবতারণা করতে।
দারা শুকোহ্, তুহিন রায় পারস্যে তোমার কৌশলের প্রশংসা করেছে। নিজেকে একজন পুর্ণবয়স্ক মানুষ হিসেবে প্রমাণ করেছ তুমি, বালক হিসেবে নয়। এ ব্যাপারে তোমার মা একটি পরামর্শ দিয়েছেন যে কীভাবে এ সংবাদ পৃথিবীর কাছে প্রকাশ করা যায়।
আপনি কী বলতে চান, জাহাপনা? দারা শুকোহর পরিষ্কার পিঙ্গল বর্ণের চোখ ঘুরে তাকাল শাহজাহান থেকে মমতাজের দিকে।
এখন তোমার সময় হয়েছে বিবাহ করার। তোমার মা এক্ষেত্রে পরামর্শ দিয়েছে বধূ হিসেবে তোমার চাচাতো বোন নাদিরা হবে উপযুক্ত। তিনি খেয়াল করেছেন যে তুমি তাকে কতটা পছন্দ কর…
দারা শুকোহ্ লজ্জামাখা আনন্দের অভিব্যক্তি দেখে বোঝা গেল যে মমতাজ সঠিক বলেছেন। একই ভাবে সবজান্তার হাসি ফুটে উঠল শাহ সুজা আর আওরঙ্গজেবের মুখেও। এখন পর্যন্ত যদিও তিনি এই সখ্যতার কথা জানাতেন না, খুশিই হলেন শাহজাহান। যদি কোন এক সময় রাজবংশের প্রয়োজনে দারাকে একাধিক পত্নীর পাণি গ্রহণ করতে হয়, সে ক্ষেত্রেও এটাই ভালো হবে যে প্রথম স্ত্রী এমন কেউ থোক যাকে সে ভালোবাসে। তিনি নিজেও দারার চেয়ে খুব বেশি বয়সী ছিলেন না, যখন তিনি মমতাজের সাথে আবদ্ধ হয়েছিলেন। আর রাজবংশের জন্যও এ সম্বন্ধ উপযুক্ত। নাদিরা তাঁর সন্তাই মৃত পারভেজের কন্যা, কিন্তু অতিরিক্ত মদপান ও আফিম আসক্তির কারণে অল্প বয়সেই মাত্র আটত্রিশ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করে পারভেজ। সে সময়টাতে দ্বন্দ্বে বিভক্ত হয়ে পড়েছিল এ রাজবংশ। নাদিরা আর দারা শুকোহ্র এই মিলনে অতীতের কিছু ক্ষতে প্রলেপ তো অন্তত লাগবে আর বিশাল রাজকীয় পরিবারও বাঁধা পড়বে একসূত্রে। মেয়েটা সুন্দরীও–খাটো কিন্তু সুদর্শনা আর ইতিমধ্যে বিভিন্ন পারিবারিক অনুষ্ঠানে দারার চঞ্চলতার বিপরীতে বিভিন্ন উপস্থিত বুদ্ধিরও পরিচয় দিয়েছে যেখানে মমতাজ ঠিকই লক্ষ্য করেছেন তাদের পারস্পরিক আগ্রহ।
তো দারা, তোমার কী মত?
নাদিরাকে বিবাহ করতে পারলে আমি খুশিই হবো। কণ্ঠস্বরে আনন্দ আর অস্বস্তি নিয়ে উত্তর দিল দারা। শেষোক্ত অনুভূতি নির্ঘাত ভাইদের উসকানিমূলক কথাবার্তা শুনে।
আমিও খুশি হয়েছি যে তুমি মত দিয়েছ। আমি এখন থেকেই পরিকল্পনা শুরু করে দিচ্ছি তোমার বিয়ে নিয়ে। এই শেষ কয়েক সপ্তাহে আমরা অপেক্ষা করছি তোমার ভাই অথবা ভগ্নির আগমনের জন্য। নিজের স্ফীত মধ্যভাগের দিক তাকিয়ে উত্তর দিলেন মমতাজ।
কুশনে হেলান দিয়ে বসলেন শাহজাহান। এরই মাঝে কল্পনা করে ফেলেছেন কেমন হবে বিবাহ শোভাযাত্রা। বিজয়ীর বেশে আগ্রায় ফিরে যাবার সাথে সাথে শুরু হবে অনুষ্ঠান। এটি শুধুমাত্র প্রিয় পুত্র বা একজন রাজকীয় শাহজাদার বিবাহের চিহ্ন নয় বরঞ্চ তার নিজের রাজত্বকালেরও সত্যিকারের সূচনা হবে। দক্ষিণের বিদ্রোহ প্রশমিত হলেই কেবলমাত্র তিনি নতুন অভিযানের মাধ্যমে মোগল সাম্রাজ্যকে সমৃদ্ধির দিকে নিয়ে যেতে পারবেন।
*
জাহাপনা! রায় সিং ত্রিশ মাইল দূরে পশ্চিম দিকে বিজাপুর সৈন্যদলের এক বিশাল অবস্থান জানতে পেরেছে। বার্তাবাহকের ঘামে ভেজা শরীর দেখেই স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়ে উঠল যে সে কতটা দ্রুতগতিতে বোরহানপুরে ছুটে এসেছে।
উত্তেজনা অনুভব করলেন শাহজাহান। অবশেষে এটাই হতে পারে সেই সুযোগ যার মাধ্যমে তাঁর শত্রুর উপর আঘাত হানা সম্ভব হবে। ঝড়ের গতিতে চিন্তা করে সিদ্ধান্ত নিলেন সম্রাট।
তরতাজা একটি ঘোড়া নিয়ে ফিরে যাও রায় সিংহের কাছে। জানাও যে আমি অশ্বারোহী দল আর কামান ও যন্ত্রপাতিসহ হাতির দল নিয়ে আসছি তার সাথে যোগ দিতে। কী বলেছ বিজাপুরের সৈন্যরা ত্রিশমাইল দূরে? যদি আমি ঘোড়সওয়ারদের নিয়ে দ্রুতগতিতে ছুটে যাই তাহলে তিন ঘণ্টার মাঝে দেখা হবে রায় সিংয়ের সাথে।
প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে হেরেমের দিকে স্তেপায়ে ছুটতে ছুটতে আসলেন শাহজাহান। একজন শৃঙ্খল শত্রু যে কিনা কখনো এখানে আর কখনো সেখানে দেখা দিয়ে, আক্রমণ করে পালিয়ে যায়, তার সাথে খেলতে খেলতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন।
একটি টুলের উপর বসে আছেন মমতাজ আর লম্বা কেশরাজি আঁচড়ে দিচ্ছে সাত্তি আল-নিসা। কাছেই বসে মমতাজের প্রিয় পারস্যের কবি ফেরদৌসের কবিতা পড়ে শোনাচ্ছে জাহানারা। দারা আর আওরঙ্গজেবের মতই বিদ্বান জাহানারা, ভাবলেন শাহজাহান।
