কী করে এসব সৈন্যদলের মাথা উঁচু করা সাহস এবং জাতীয়তাবাদে বিশ্বাস একটা ফুকারে নির্ভিয়ে দেওয়া হয়েছিল?
কিভাবে তাদের প্রচারকার্য এবং জনসাধারণকে সচেতন করার সুন্দর পদ্ধতিটাকে কাজে না লাগিয়ে যুদ্ধে নিশ্চিত জয়ী সৈন্যদের মাথার ওপরে খড়গাঘাত হেনেছিল।
ইতিমধ্যে আমাদের লোকেরা সেই জায়গায় কি করছিল? কিছুই নয়। বারে বারে আমি রোষান্বিত এবং ক্রদ্ধ হয়ে পড়েছিলাম, বিশেষ করে শেষের দিকের সংবাদপত্রগুলো পড়ে যা’তে বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া ছিল কিভাবে তা জনসাধারণ এবং সৈন্যদের মধ্যে জড়তা জাগিয়ে তুলে নিধন যন্ত্র চালিয়ে চলেছে। এ চিন্তায় যন্ত্রণাবিদ্ধ হয়েছি যে জার্মানদের প্রচারকার্যের ভার যদি আমার হাতে থাকত, (এসব অনুপযুক্ত অপরাধী বিশেষ নির্বোধ ব্যক্তি এবং দুর্বল প্রাণীদের হাতে না থেকে), তবে হয়ত সম্পূর্ণ চিত্রটাই অন্যরকম হত।
সেই মাসগুলোতে আমি অনুভব করেছিলাম যে আমাকে সীমান্তে যুদ্ধরত রেখে ভাগ্য আমার প্রতি বিরূপ খেলা খেলছে; এবং সেখানে দাঁড়িয়ে আমাকে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হচ্ছে, সেখানে একটা নিগ্রো বা যে কারোর গুলি এসে আমাকে ইহকালের মত স্তব্ধ করে দিতে পারে, অথচ পিতৃভূমির জন্য অন্য জায়গাতে অনেক বেশি কাজ করতে সক্ষম। আমার নিজেরও যথেষ্ট পরিমাণে আত্মবিশ্বাস বর্তমান যে প্রচারকার্যের ব্যাপারটা আমি সাফল্যের সঙ্গে পরিচালনা করতে পারি।
কিন্তু আমার পরিচিত বলতে তো কিছু ছিল না, আট লক্ষ্য সৈন্যের মধ্যে আমি সাধারণ একজন সৈনিক মাত্র। সুতরাং আমার পক্ষে চুপচাপ মুখ বন্ধ রেখে আমাকে যে কর্তব্য সম্পাদনা করতে দিয়েছে সেটা করে যাওয়াই যুক্তিযুক্ত।
১৯১৫ সালের গ্রীষ্মে আমাদের পরিখায় শত্রুপক্ষের প্রথম প্রাচীরপত্র পড়ে; তাদের প্রায় সবই এক ধাচের গল্প। শুধু আঙ্গিকেই যা কিছু একটু পরিবর্তন। গল্পটা হল জার্মানির দুঃখ দিনে দিনে জয়ের সম্ভাবনাটাও মলিন হয়ে আসছে। ঘরের লোকদের শান্তি এবং সন্ধির ইচ্ছা তীব্র হয়ে উঠেছে; কিন্তু সামরিক কর্তৃপক্ষ এবং কাইজারের জন্য তা বোঝার উপায় নেই। সমস্ত পৃথিবী জানত এ যুদ্ধ জার্মান জনসাধারণের জন্য শুধু হয়নি, হয়েছে কাইজারের ইচ্ছায়। তার জন্য জার্মান জনসাধারণও দায়ী নয়। দায়ী যদি কাউকে করতে। হয় তবে সে হল কাইজার; এবং যতদিন না পর্যন্ত পৃথিবীর শান্তির এ শত্রু কাইজারকে দূর করা হবে — ততদিন পর্যন্ত শান্তি আসার কোন উপায়ই নেই।
কিন্তু যুদ্ধ শেষ হলেই উদার এবং গণতান্ত্রিক দেশগুলো জার্মানিকে বন্ধু হিসেবে পৃথিবীতে শান্তি স্থাপনের কাজে সহযোগী করে নেবে। এ কাজটা করা হবে যে মুহূর্তে প্রুশিয়ার সামরিক বাহিনী শেষমেষ সমূলে ধ্বংস হবে।
এসব বক্তব্যকে সচিত্রিত এবং প্রমাণ করার জন্য, সেইসব প্রাচীরপত্রের প্রায়ই ‘বাড়ির চিঠি’ থাকত–যেগুলো শত্রুপক্ষের প্রচারকার্যের যথার্থতা প্রমাণের সহায়ক স্বরূপ। সত্যি বলতে কি, এত সব প্রয়াস দেখে আমরা হাসতাম। প্রাচীরপত্রগুলো পড়ে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পাঠিয়ে দিতাম, তারপরে পুরো ব্যাপারটাই ভুলে যেতাম–যতদিন পর্যন্ত ভাল একটা হাওয়া আবার পরিখার ভেতরে প্রবাহিত না হত। এসব প্রাচীরপত্রগুলো বিশেষ করে বিমান থেকে ফেলা হত এবং তার জন্য বিশেষ ধরনের বিমানের ব্যবহার করা হত।
এ প্রচারকার্যের একটা মুখাবয়ব অত্যন্ত চমকপ্রদ। ব্যাভেরিয়ান সৈন্যদলের ভেতরে শদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ গড়ে তোলার ক্রমাগত একটা প্রচেষ্টা চলছিল; প্রুশিয় এবং প্রুশিয়ার সৈন্যরাই নাকি এ যুদ্ধ বাধাবার এবং এটাকে জিইয়ে রাখার জন্য মূলত দায়ী। এবং সে কারণেই শত্রুপক্ষের ব্যাভেরিয়ার সৈন্যদলের প্রতি কোনরকম বিরূপতা নেই। কিন্তু তাদের সাহায্য করারও কোন পথ খোলা ছিল না। যতক্ষণ পর্যন্ত তারা প্রশিয়ানদের স্বার্থরক্ষা করে চলেছে এবং আগুন থেকে তাদের জন্য বাদাম তোলার কাজে নিযুক্ত।
এ ক্রমাগত প্রচারকার্যের ফলাফল ১৯১৫ সালে আমাদের সৈন্যদের ওপর সুদূর প্রসারী হয়। ব্যাভেরিয়ার সৈন্যদের মধ্যে প্রুশিয়ার বিরুদ্ধে যথেষ্ট পরিমাণে বিক্ষোভ দানা বেঁধে ওঠে। কিন্তু যারা স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, তারা এর কোনরকম প্রতিবাদ করতে সচেষ্ট হয়নি। পুরো ব্যাপারটা একটা ভয়ঙ্কর রকমের অপরাধ বিশেষ। কারণ তৎক্ষণাৎ বা পরে শুধুমাত্র প্রশিয়ানদের কপালেই লাঞ্ছনা জোটে না, সমস্ত জার্মান জাতিকেই সেই দুর্ভাগ্যের অংশ বাধ্য হয়ে বরণ করে নিতে হয়।
এভাবে ১৯১৬ সালের পর থেকে শত্রুপক্ষের প্রচারকার্য অভাবনীয় সফলতা লাভ করতে শুরু করে।
ঠিক এভাবে সৈনিকদের বাড়ি থেকে যেসব চিঠিপত্রাদি আসতে থাকে তার ফলাফল হয় সুদূর প্রসারী। সমস্ত ব্যাপারটা এমন এক অবস্থায় এসে দাঁড়ায় যে শত্রুপক্ষের আর এভাবে প্রচারপত্র ছড়ানোর প্রয়োজন পড়ে না। এবং ঘরের থেকে সাধারণ সৈনিকদের ওপর আসা চাপ কমাতে মুখ শাসকবর্গ কয়েকটা মামুলী সতর্কবাণী উচ্চারণ করা ছাড়া আর কিছুই করেনি। বাড়ির থেকে সেন্টিমেন্টাল বৌ-দের লেখা চিঠির মাধ্যমে বয়ে আনা বিষ সমস্ত সীমান্তটাকে বিষাক্ত করে তোলে। একবারও তারা ভাবেনি যে এর দ্বারা শত্রুপক্ষের জয়ের পথই প্রশস্ত করা হচ্ছে বা তাদের নিজেদের পুরুষদের কাজ প্রলম্বিত এবং দিনে দিনে কষ্টকর হয়ে উঠছে। জার্মান দ্রমহিলাদের লেখা এসব বোকা চিঠিগুলোর মূল্য শয়ে শয়ে বা হাজারে হাজারে প্রাণের বিনিময়ে দিতে হয়।
