প্রচারকার্যের সংগঠন বা পরিচালন এমন হওয়া উচিত নয় যাতে এটা অনেক প্রকারের বৈজ্ঞানিক অস্ত্রশস্ত্রের সমন্বয়ে গঠিত বলে মনে হয়।
জনসাধারণের ধারণ ক্ষমতা অত্যন্ত সীমাবদ্ধ; এবং তাদের বোঝার ক্ষমতাও দুর্বল। অপরদিকে তাদের স্মৃতিশক্তি প্রচণ্ডরকমের কম থাকার দরুন তারা সবকিছুই দ্রুত ভুলে যায়। এ কারণে সমস্ত রকমের প্রয়োজনীয় ব্যাপারেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। এবং সেগুলোকে যতখানি সম্ভব একই প্রকারে পুনরাবৃত্তি করা উচিত। এসব ধ্বনি ক্রমাগত পুনরাবৃত্তি করে যেতে হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না শেষ ব্যক্তিটি এ প্রচারকার্যের উদ্দেশ্যের কজায় এসে ধরা দেয়। এ আদর্শ ভুলে গেলে এ প্রচারকার্যের সমস্ত রকম উদ্দেশ্যই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হবে। কারণ জনসাধারণের পক্ষে তাকে যা বলা হয়েছে তা হজম করা বা মনে রাখা সম্ভব হয়ে উঠবে না। সুতরাং প্রচারকার্যের গুরুত্ব বুঝে নিয়ে তাকে। এমনভাবে প্রচার করা উচিত যাতে জনসাধারণের মনস্তত্ত্বের দিকটাকে এটা সম্পূর্ণভাবে আকর্ষণ করতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, শক্রদের মূল্যায়ণ ব্যাঙ্গাত্মক উপায়ে করা ভুল, যা অস্ট্রিয়ায় জার্মানদের পত্রিকাগুলো প্রচারকার্যের উদ্দেশ্য বলে গ্রহণ করেছিল। এ আদর্শগত দিকটাই হল ভুল; কারণ যখন তারা যুদ্ধের সময় শত্রুর মুখোমুখি দাঁড়ায়, তখন আমাদের সৈন্যদের ধ্যান-ধারণা আলাদা ছিল ওদের সম্পর্কে। সুতরাং শেষ পর্যন্ত ওই ভুলের মাশুল বিধ্বংসের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। যখন জার্মান সৈন্যরা বুঝতে পারে যে তাদের বিরোধী পক্ষের সৈন্যরা যথেষ্ট পরিমাণে সুশিক্ষিত, তখন তারা উপলব্ধি করে যে ভুল সংবাদ দ্বারা তাদের প্রতারণা করা হয়েছে। তাই তাদের সংগ্রাম শক্তিকে উদ্বুদ্ধ এবং শক্তিশালী করে তোলার চেয়ে এ সংবাদের কার্যকারীতা বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। সমস্ত উৎসাহটা ভেঙে পড়ে।
অপরদিকে বৃটিশ এবং আমেরিকান যুদ্ধের প্রচারকার্যের মনস্তত্ত্বের দিকটা যথেষ্ট পরিমাণে অভিজ্ঞ ছিল। জার্মান সৈন্যদের বর্বর এবং হুণদের মত নিষ্ঠুরভাবে চিত্রিত করে তাদের নিজেদের সৈন্যদের যুদ্ধের বর্বরতা এবং নির্দয়তার বিরুদ্ধে সুযোগ্য করে তুলেছিল। যার জন্য তাদের মধ্যে মিথ্যা স্বপ্ন বলতে কিছু ছিল না। যুদ্ধক্ষেত্রে যেসব ভয়াবহ অস্ত্রের মুখোমুখি তাদের হতে হয়েছে–তার সংবাদ নিজেদের সরকারের মাধ্যমে আগেই তারা পেয়েছে। সুতরাং সরকারের সততায় তারা আরো অধিক পরিমাণে আস্থা রেখেছে। এ প্রকারে তাদের প্রচণ্ড ক্রোধ এবং ঘৃণা এ কুখ্যাত বিরুদ্ধপক্ষের সৈন্যদের ওপর গিয়ে পড়েছে। জার্মান যুদ্ধাস্ত্রর যে ভয়াবহ ফলাফল হয়েছে, যা তাদের কাছে জার্মানদের এ হুণ এবং বর্বর রূপেই প্রতিফলিত হয়েছে, যেটা সরকারের প্রচারকার্যের মাধ্যমে তাদের আগে থেকেই জানা ছিল। অপরদিকে বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে মৈত্রীভাবের কারণে তাদের অস্ত্রে যে ভয়াবহতা সৃষ্টির পক্ষে সক্ষম তা মিথ্যা। দুর্ভাগ্যবশতঃ, জার্মানদের ক্ষেত্রে ঠিক তার উল্টোটা ঘটেছে–যারা শেষ পর্যন্ত ঘরের সংবাদকে দলবাজী আর প্রতারণা বলে বাতিল করে দিয়েছে। এ ধরনের ফলাফল সম্ভব হয়েছিল কারণ দেশের সরকার এ প্রচারকার্যকে গর্দভ মস্তিষ্কের বেশি মূল্য দেয়নি এবং তাদের ধারণাই ছিল না যে প্রচারকার্যের জন্য নিপূণ বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজন যা খুঁজে বের করতে হয়।
কিভাবে প্রচারকার্য চালাতে নেই–জার্মান যুদ্ধের প্রচারকার্য হল তার অতুলনীয় উদাহরণ এবং মনস্তত্বের দিক থেকে এটা একটা চরম ব্যর্থতার উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্তও বটে।
তবে যাদের চোখ খোলা ছিল, তারা শত্রুদের নিকট এ বিষয়ে অনেক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পেয়েছিল; যাদের ইন্দ্রিয় গ্রাহ্যরূপ তখনো কঠিন হয়ে ওঠেনি এবং যারা সুদীর্ঘ সাড়ে চার বছর ধরে শক্রর প্রচারকার্যের অভিজ্ঞতা লাভ করেছিল।
সবচেয়ে দুঃখের বিষয় আমাদের লোকেরা প্রচারকার্যের সেই প্রথম কারণগুলোই বুঝতে পারেনি, যা প্রতিটি প্রচারকার্যের পরিপূর্ণতার জন্য প্রয়োজন। বিশেষ করে প্রচারিত প্রতিটি সমস্যার শুধু একদিকটাকেই তুলে ধরতে হবে। কিন্তু এ বিষয়ে এত বিস্তর ভুল করা হয়েছে যুদ্ধের শুরু থেকেই যে সন্দেহাতীতভাবে এ বোকামী আমাদের লোকের মুখামীকে সরাসরি প্রমাণ করে।
উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, কয়েকটি নতুন ধরনের সাবানের বিজ্ঞাপনের অভিপ্রায়ের জন্য আমরা যে প্রাচীরপত্রের ব্যবহার করে থাকি, তাতে বিশেষ করে সাবানের চমৎকার দিকটা অবশ্যই তুলনামূলকভাবে অন্য ছাপ মারা সাবানের থেকে তুলে ধরা হয়ে থাকে না। এ বিষয়ে আমরা সবাই একমত হব; এবং রাজনৈতিক প্রচারকার্যও ঠিক এক ধারাতে চলে। প্রচারকার্যের লক্ষ্য সত্যকে সোজাসুজি উদঘাটিত করা নয়, কারণ তা তো অপর পক্ষের দিকে যাবে–আপাতদৃষ্টিতে যা তত্ত্বের দিক থেকে বিচার হয়ে থাকে। এটা শুধু সত্যের সেই দিকটাকেই প্রকাশ করবে যা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় সাহায্য করবে।
কে যুদ্ধের উদ্যোক্তা, এ প্রশ্নের আলোচনায় যাওয়াটা হল গোড়াতেই ভুল এবং সেইসঙ্গে একক জার্মানির ঘাড়ে সব দোষ চাপিয়ে দেওয়াটাও উচিত নয়–এটাকে প্রমাণ করতে যাওয়াটাও বোকামী। কোনরকম আলোচনা ছাড়াই যুদ্ধ শুরু করার পুরো দোষটা শর্কর ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া উচিত।
