সে একটু অস্থির হয়ে প্রশ্ন করল–কী দেখছ বল?
বললাম-রহস্যময়ী রমণী। এঁর সম্বন্ধে সব কথা আমাকে বল।
সে বলল–ডিনারের পরে।
ডিনার শেষ হলে হোটেলের চাকর যখন কফি আর সিগারেট দিয়ে গেল তখনই আমি জিরাকে তার প্রতিজ্ঞার কথা স্মরণ করিয়ে দিলাম। চেয়ার থেকে উঠে ঘরময় দু’চার বার পায়চারি করে একটা চেযারের ওপরে বসে পড়ল সে; তারপরে বলে গেল তার কাহিনি
একদিন বিকেলে পাঁচটার সময় বন্ড স্ট্রিটের দিকে আমি হেঁটে যাচ্ছিলাম। রাস্তার ওপরে একটা দুর্ঘটনা ঘটার ফলে চারপাশের সব গাড়িই জটলা পাকিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিল। ফুটপাতের একেবারে ধারে হলদে রঙের একটা ব্রোহাম দাঁড়িয়েছিল। কী জানি কেন তার দিকে আমার দৃষ্টি আকৃষ্ট হল। সেই গাড়িটার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় একটি মুখ তার ভেতর থেকে কিছুটা বাইরে বেরিয়ে এল। যে মুখটি এইমাত্র তুমি দেখলে সেটি হচ্ছে সেই মুখ। দেখামাত্র আমি চমকে উঠলাম। সারা রাত্রি আর তার পরের সারাটা দিনই সেই মুখটির কথা আমি ভাবতে লাগলাম। সেই পথের ধারে ধারে আমি অনেকবার আসা-যাওয়া করলাম, প্রতিটি গাড়ির ভেতরে দেখলাম, সেই হলদে রঙের ব্রোহামটি দেখতে পাব আশা করলাম; কিন্তু আমার সেই অজ্ঞাতনামা সুন্দরীর দেখা আর পেলাম না। ভাবতে লাগলাম তাঁকে আমি স্বপ্নেই দেখেছি প্রায় সপ্তাহ খানেক পরে মাদাম দি রাসটেল-এর সঙ্গে ডিনার খাওযার আমার একদিন আমন্ত্রণ দিল। সময় ছিল রাত্রি আটটা, কিন্তু সাড়ে আটটা বেজে গেল। তখনো আমরা বসার ঘরে বসে রয়েছি এমন সময় দরজা খুলে দিযে চাকরটি জানাল যে। লেডি অ্যালবয় উপস্থিত হয়েছেন। এই মহিলাটিকেই আমি খুঁজে বেডিচ্ছিলাম। ধীরে ধীরে ভেতরে ঢুকে এলেন তিনি। আমার সরচেয়ে আনন্দ হল যখন তাঁকে ডিনারে নিয়ে যাওয়ার জন্যে মাদাম আমাকেই নির্দেশ দিলেন। খেতে বসার পরে নিরপরাধ মন্তব্য করলাম আমি–লেডি অ্যালবয়, মনে হচ্ছে দিন কয়েক আগে বনড স্ট্রিটে আপনাকে একবার আমি দেখেছিলাম। হঠাৎ কেমন যেন ম্লান হয়ে গেলেন তিনি আমাকে নীচু গলায় বললেন–অনুগ্রহ করে এত জোর কথা বলবেন না। অন্য কেউ শুনতে পেতে পারে। শুরুতেই এই ধরনের মন্তব্য শুনে আমি একটু দুঃখিত হলাম। তারপরেই মরিয়া হয়ে ফরাসি নাটকের আলোচনায় মেতে উঠলাম। তিনি কথা বললেন কমই যেটুকু বললেন তাও শুনতে লাগল মৃদু গুঞ্জনের মতো মনে হল, কেউ পাছে তাঁর কথা শুনতে পায় এই ভয়ে তিনি সন্ত্রস্ত। সত্যি কথা বলতে কি নিতান্তু মুখের মতোই আমি তাঁর প্রেমে পড়ে গেলাম। তাঁর চারপাশের রহস্য আমার কৌতূহলকে আরো বাড়িয়ে দিল। ডিনার শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি যখন উঠে পড়লেন তখন আমি জিজ্ঞাসা করলাম আমি কি তাঁর বাড়ি গিয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে পারি? তিনি একটু ইতস্তত করলেন, তাঁর কথা কেউ শুনছে নাকি চারপাশে একবার তাকিযে। দেখলেন; তারপরে বললেন–আসুন, কাল বিকেল পৌনে পাঁচটার সময়।
তাঁর সম্বন্ধে কিছু বলার জন্য মাদামকে আমি অনুরোধ করলাম। কিন্তু যেটুকু সংবাদ পেলাম তা হচ্ছে এই যে ভদ্রমহিলা বিধবা, এবং পার্কলেনের একটি সুন্দর বাড়িতে তিনি বাস করেন। এই শুনে বাড়ি ফিরে এলাম আমি।
পরের দিন যথাসময়ে আমি তাঁর বাড়িতে হাজির হলাম; কিন্তু তাঁর বাটলার আমাকে জানাল যে তিনি সেইমাত্র বেরিয়ে গিয়েছেন। খুব দুঃখ আর বিভ্রান্তির সঙ্গে আমি ক্লাবে চলে গেলাম; তারপরে অনেক ভেবেচিন্তে একটা চিঠি দিয়ে জানতে চাইলাম অন্য কোনো বিকালে তাঁর ওখানে আমি যেতে পারি কিনা। কয়েক দিন তার কোনো উত্তর এল না। তারপরে ছোটো একটা চিরকুট এল একদিন। তাতে লেখা ছিল যে রবিবার বেলা চারটের সময় তিনি বাড়িতে থাকবেন। সেই সঙ্গে ছিল অদ্ভুত একটি পুনশ্চ–অনুগ্রহ করে এই ঠিকানায় আর আমাকে চিঠি পাঠাবেন না। দেখা হলে এর কারণটা আমি আপনাকে জানাব। রবিবার দিন তাঁর সঙ্গে দেখা হল। তিনি আমাকে সাদরেই অভ্যর্থনা জানালেন। কিন্তু আমি যখন উঠে আসছি সেই সময় তিনি বিনীতভাবে আমাকে বললেন–যদি কোনোদিন আমাকে চিঠি দেওযার প্রযোজন ইয তাহলে আমার এই ঠিকানা দেবেন-মিসেস নকস, কেয়ার অফ দুইটাকার লাইব্রেরি, গ্রিন স্ট্রিট। আমার বাড়িতে আমার নামে কোনো চিঠিপত্র আসতে দিতে যে আমি চাইলে তার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে।
তারপরে অনেক দিনই তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, কিন্তু কোনো দিনই তাঁর রহস্য আমার কাছে উন্মোচিত হয়নি। মাঝে-মাঝে আমার মনে হয়েছে অন্য কোনো পুরুষের কবলে পড়েছেন তিনি। কিন্তু তাঁর সান্নিধ্যে আসা যে কোনো মানুষের পহেই এতই কষ্টসাধ্য ছিল যে সেরকম কোনো সম্ভাবনাকে আমি আমল দিতে পারিনি। তাঁর সম্বন্ধে বিশেষ কোনো সমাধানে আসা আমার পক্ষে কষ্টকর হয়ে পড়েছিল–কখনো তাঁকে মনে হত পরিষ্কার ঝরঝরে, আবার কখনো মনে হত দারুণ অস্পষ্ট। শেষকালে একদিন আমি মনস্থির করে ফেললাম–তাঁকে আমার স্ত্রী হওয়ার প্রস্তাব দেব। লাইব্রেরির ঠিকানায় তাঁকে একটি পত্র দিলাম আমি–পরের সোমবার ছ’টায় সময় তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হতে পারে কিনা। জানতে চাইলাম। রাজি হলেন তিনি। চিঠি পেয়ে আমি আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেলাম। আমি তাঁকে দেখে পাগল হয়েছিলাম। রহস্যময়ী তখনকার তাঁকে দেখে তো বটেই–এবং এখনো। ওই রহস্যটাই আমাকে অস্থির করে তুলেছিল, উন্মত্ত করেছিল আমাকে। হঠাৎ তাঁর চলার পথে আমি এসে দাঁড়ালাম কেন?
