রাজা বললেন–ঈশ্বরের স্থানে বসে আপনি এই সব কথা বলছেন?
এই কথা বলে বিশপের পাশ দিয়ে উঠে গেলেন তিনি, যে বেদীর ওপরে যীশুখৃস্টের মূর্তি রয়েছে সেইখান গিয়ে দাঁড়ালেন। দু’পাশে তাঁর ঐশ্বর্যের প্রাচুর্য-অদ্ভুত অদ্ভুত স্বর্ণ পাত্র, যীশুর শেষ নৈশ ভোজনের সবুজ মদে বোঝাই কার স্মরণ পাত্র-ইত্যাদি। যীশুর মূর্তির কাছে তিনি হাঁটু মুড়ে বসলেন-বিরাট-বিরাট বাতিগুলি জ্বলতে লাগল; ধূপের ধোঁয়া পেঁচিয়ে-পেঁচিয়ে উঠতে লাগল; তাঁর চারপাশে প্রার্থনার জন্যে মাথা নীচু করলেন তিনি, ধোপদুরস্ত পোশাক পরা পাদরিয়া তাঁর কাছ থেকে পালিয়ে গেল।
হঠাৎ বাইরে একটা গণ্ডগোল উঠল; তার সঙ্গে সঙ্গে অভিজাত সম্প্রদায় তাদের তরোয়াল খুলে মাথার মুকুট নাড়িয়ে চেঁচাতে লাগল–সেই উন্মাদ লোকটা কোথায়? ভিক্ষুকের পোশাকধারী সে রাজা কোথায় গেল? সেই ছোকরা কোথায় যে আমাদের রাজত্বে কলঙ্ক লেপন করেছে? আমরা তাকে হত্যা করব। আমাদের শাসন করার যোগ্যতা তার নেই।
এই সব কথা শোনার পরেও রাজা প্রার্থনা করার জন্যে মাথা নোয়ালেন; প্রার্থনা শেষ করে উঠলেন তিনি; ঘুরে বিষণ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন তাদের দিকে।
আর সেই সঙ্গে চিত্রিত ডানালার ভেতর দিয়ে সূর্যের কিরণ ঝরে পড়ল তাঁর ওপরে। সেই সূর্যকিরণমালা তাঁর দেহে এমন একটি স্বর্গীয় পোশাক পরিয়ে দিল যার কাছে তাঁর রাজকীয় পোশাক ম্লান বলে মনে হল। শুকনো ফুল আবার ফুটল; লিলি ফুল মুক্তোর চেয়ে সাদা হয়ে দেখা দিল। শুকনো কাঁটা উঠল ফুটে; নিরাভরণ গোলাপ ফুলি রুবির চেয়েও লাল হয়ে গেল।
রাজার সেই পোশাকেই তিনি দাঁড়িয়ে রইলেন। মুক্তামন্দিরের দ্বার গেল খুলে–এই রহস্যময় আলোর দ্যুতিতে ভরে গেল চারপাশে। ঈশ্বরের মহিমা ছড়িয়ে পড়েছে চারপাশে-সেন্টরাও যেন জীবন্ত হয়ে উঠলেন। সঙ্গীতের সুর উঠল, ঢাকের শব্দ পড়ল ছড়িয়ে। ভজন গাইতে লাগল ছেলেরা।
ভয়ে আর বিস্ময়ে সবাই তাঁর কাছে নতজানু হলেন; সভাসদেরা খাপের মধ্যে তাদের তরোয়াল রাখল ঢুকিযে-অভিবাদন জানাল তাঁকে। বিশপের মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল-হাত কাঁপতে লাগল তাঁর। তিনি বললেন–যাকে আমি অভিষিক্ত করছি তার চেয়েও তুমি অনেক বড়ো। এই কথা বলে তিনি রাজার কাছে তার মাথাটা নীচু করলেন।
রহস্যহীনা মহিলা
The Sphinx Without a Secret
কোনো এক অপরাহ্নে কাফে দি লা পেইক-এর বাইরে বসে পারস্যের বিলাসবহুল আর দুঃখভারাক্রান্ত জীবনযাত্রার মিছিল দেখছিলাম, আর মদের গ্লাস মুখে নিয়ে অবাক হয়ে। ভেবেছিলাম কেমন করে দম্ভ আর দারিদ্র্য এভাবে পাশাপাশি নিজেদের অস্তিত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে বজায় রাখতে পারে। এমন সময় কে যেন আমার নাম ধরে ডাকল। পেছন ফিরে দেখি লর্ড মাচিশন। কলেজ ছাড়ার পরে আর আমাদের দেখা হয়নি; সেও প্রায় বছর দশেক হবে। তার সঙ্গে দেখা হতেই আমি খুব খুশি হয়ে উঠলাম; করমর্দন করলাম দুজনে। অক্সফোর্ডে আমাদের মধ্যে বেশ একটা বন্ধুত্ব ছিল। মানুষটি দেখতে সুন্দর, সাহসী, আর সম্ভ্রান্ত। তাকে আমার খুবই ভালো লাগত। আমরা সবাই বলাবলি করতাম সব সময় সত্যি কথা না বললে সে যশের শিখরে উঠতে পারবে। আমার ধারণা তাকে যে আমরা অত প্রশংসা করতাম তার একমাত্র কারণ হচ্ছে সে সব খোলাখুলিই বলত। সেদিন দেখলাম তার মধ্যে কিছু পরিবর্তন। দেখা দিযেছে। কেমন যেন উদ্বিগ্ন হতচকিত দেখাচ্ছে তাকে। কোনো একটা বিষয়ে তার যেন একটা সন্দেহ জেগেছে। আমার মনে হল এর পেছনে আধুনিক নৈরাশ্যবাদ নেই। সেই জন্যেই আমি নিশ্চিন্ত হলাম যে নিশ্চয় কোনো নারীঘটিত ব্যাপারে সে জড়িয়ে পড়েছে। তাই তাকে জিজ্ঞাসা করলাম–তুমি বিয়ে করেছ?
সে বলল–মেয়েদের আমি ভালোভাবে বুঝতেই পারি নে।
বললাম–বৎস জিরাল্ড, মেযেদের জন্মই হয়েছে ভালোবাসা পাওয়ার জন্যে, বোঝার জন্যে নয।
যাকে আমি বিশ্বাস করতে পারি নে তাকে আমি ভালোবাসতে পারি নে।
বললাম-তোমার জীবনে নিশ্চয় কোনো রহস্য রয়েছে, জিরান্ড। আমাকে সব খুলে বল।
সে বলল–চল, মোটরে করে একটু বেরিয়ে পড়ি। এই জায়গাটি বড়োই জনবহুল। নানা ওই গাড়িটা নয–অন্য রঙের কোনো গাড়ি নাও-ওই ওখানে যে ঘন সবুজ একটা গাড়ি রয়েছে–ওতেই হবে।
কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা বুলেভার্ডের পাশ দিয়ে মেদেলিনের দিকে ছুটতে লাগলাম।
কোথায় যাবে?
সে বলল–যেদিকে তোমার ইচ্ছে। বয়-এর কোনো রেস্তোরাঁয় চল। সেখানে ডিনার খেযে তোমার কাহিনি বলবে।
বললাম-তোমার কাহিনি আমি প্রথম শুনতে চাই। তোমার গোপন কথাটা কি বল।
রুপোর ঢাকনি দেওয়া একটা মরক্কো চামড়ার ব্যাগ বার করে সেটি সে আমার হাতে দিল। খুলে দেখলাম তার ভেতরে একটি মহিলার ফটো রয়েছে। মহিলাটি দীর্ঘাজিলী, ক্ষীণতন্বী: তাঁর সেই ভাষা-ভাষা চোখ আর খোলা চুলে অপরূপা দেখাচ্ছিল তাঁকে দেখে মনে হচ্ছিল তিনি অতীন্দ্রিয় জগতের; দামি পশমে ঢাকা ছিল তাঁর দেহ।
সে বলল–মুখটা দেখে কী মনে হয় তোমার? সত্যবাদিনী?
বেশ ভালোভাবেই পরীক্ষা করলাম আমি। মনে হল এ মহিলার মধ্যে কোনো গাপন রহস্য রয়েছে, কিন্তু সেটা ভালো কি মন্দ তা আমি বুঝতে পারলাম না তাঁর সৌন্দর্য অনেক রহস্য মিশিয়ে অনেকটা মনস্তাত্ত্বিক বাস্তুব নয; এবং তাঁর ঠোঁটের ওপরে হাসির যে মৃদু রশ্মিটি ছড়িয়ে পড়েছে সেটি অনেক গভীর, সত্যিকার মিষ্টি বলে চিহ্নিত হওয়ার পথে যথেষ্ট বাধা। রয়েছে তার।
