জিজ্ঞাসা করলাম-তাহলে তুমি তা আবিষ্কার করতে পেরেছিলে?
সে বলল–মনে হচ্ছে যেন। তুমিই তা বিচার করে দেখা
সোমবার দিন কাকার সাথে আমি লাঞ্চ খেতে গিয়েছিলাম। চারটে নাগাদ আমি মেরিলিবোন স্ট্রিটে এসে দাঁড়ালাম। তুমি বোধ হয় ভান আমার কাকার বাডি হচ্ছে রিজেন্ট। পার্কে। আমার যাওয়ার কথা পিকাডেলিতে। অনেক নোংরা ছোটো রাস্তা দিয়ে পথটা সংহেপ। করার জন্যে আমি হাঁটতে শুরু করলাম। হঠাৎ দেখলাম কালো ঘোমটার মুখ ঢেকে আমার। সামনে দিয়ে লেডি অ্যালবয় হনহন করে এগিয়ে যাচ্ছেন। রাস্তাটার শেষ বাড়ির কাছে এসে তিনি সিঁড়ি দিয়ে উঠতে লাগলেন। একটা ল্যাচ-কী বার করে ভেতরে ঢুকে গেলেন। দেখে মনে হল বাড়িটা হচ্ছে ভাড়াটেদের। মনে-মনে বললাম-রহস্যটা এইখানে। দরজার কাছে দেখি তাঁর রুমালটা পড়ে রয়েছে। আমি সেটা তুলে নিযে পকেটে রেখে দিলাম। তারপরে কী করা উচিত সেইটাই ভাবতে লাগলাম আমি। পরিশেষে আমি এই সমাধালে এলাম যে তাঁর ওপরে। গোয়ান্দাগিরি করার কোনো অধিকার আমার নেই। এই ভেবে ক্লাবে গেলাম। সেখান থেকে ছ’টার সময় আমি তাঁর সঙ্গে দেখা করতে গেলাম সোফার ওপরে বসেছিলেন তিনি। সুন্দর দেখাচ্ছিল তাঁকে। তিনি বললেন–আপনাকে দেখে আমি খুশি হয়েছি। সারাদিনই আমি বাড়ি থেকে বেরোইনি।
কথাটা শুনে অবাক হয়ে তাঁর দিকে আমি তাকিয়ে রইলাম। তারপরে, পকেট থেকে রুমালটা বার করে তাঁর হাতে দিয়ে বললাম–আজ বিকালে কুমনর স্ট্রিটে আপনি এটা ফেলে। গিয়েছিলেন।
শান্তভাবেই কথাটা বললাম আমি। আমার দিকে বিহ্বল ভাবে তাকিয়ে রইলেন তিনি। কিন্তু রুমালটা নেওয়ার কোনো চেষ্টাই করলেন না। জিজ্ঞাসা করলাম-ওখানে গিয়েছিলে কেন? তিনি জিজ্ঞাসা করলেন–ওই প্রশ্ন করার আপনার অধিকার কী? আমি বললাম–তোমাকে আমি ভালোবাসি–আমার অধিকার সেইটুকু। আমাকে তুমি বিয়ে কর এই প্রস্তাব নিয়েই আমি আজ এসেছি। এই শুলে দু’হাতে মুখ ঢেকে তিনি হু-হুঁ করে কেঁদে ফেললেন।
আমি বললাম-আমাকে বলতেই হবে সব কথা।
তিনি দাঁড়িয়ে উঠে বললেন–লর্ড মাৰ্টিশন, আপনাকে বলার মতো কিছুই আমার নেই।
আমি চিৎকার করে উঠলাম–নিশ্চয় তুমি কারও সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলো এইটাই তোমার রহস্য।
হঠাৎ কেমন যেন সাদা হয়ে গেলেন তিনি; বললেন–কারো সঙ্গে দেখা করতে আমি যাইনি।
তুমি কি সত্যি কথা বলতে পার না?
আমি সত্যি কথাই বলছি।
উন্মত্ত হয়ে উঠলাম আমি। সেদিন কী যে বলেছিলাম তা আমার মনে নেই। তবে নিশ্চয় কিছু। ভয়ঙ্কর কথা। শেষকালে ঘর থেকে দৌড়ে বেরিয়ে এসেছিলাম। পরের দিনই তিনি আমাকে একটা চিঠি দিয়েছিলেন। সে চিঠি না খুলেই আমি ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছি। তারপরেই আমি। অ্যালেন কোলভিলের সঙ্গে নরওয়ের দিকে চলে গেলাম। মাসখানেক পরে ফিরে এসেই মর্নিং পোস্ট-এ পড়লাম যে লেডি অ্যালবয় মারা গিয়েছেন। অপেরায় যাওয়ার ফলে তাঁর ঠান্ডা লেগেছিল; তারই ফলে ফুসফুস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল তাঁর। খবরটা পেযেই ঘরের মধ্যে নিজেকে আমি পুরে রাখলাম। কারো সঙ্গে দেখা করলাম না। আমি তাঁকে খুব ভালোবাসতাম। হ ইশ্বর! তাঁকে আমি এত ভালোবাসলাম কেমন করে?
জিজ্ঞাসা করলাম-তুমি সেই রাস্তায়, সেই বাড়িতে আর গিয়েছিলে?
সে বলল–হ্যাঁ। একদিন আমি কুমনর স্ট্রিটে গিয়েছিলাম। না গিয়ে পারিনি। একটা সন্দেহ আমাকে কেবলই পীড়া দিচ্ছিল। দরজার ধাক্কা দেওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে একটি সম্ভ্রান্ত মহিলা দরজা খুলে দিলেন। ভাড়া দেওয়ার জন্যে তাঁর কোনো ঘর খালি রয়েছে কিনা আমি তা জানতে। চাইলাম। তিনি বললেন–সম্ভবত ড্রয়িং রুমটা ভাড়া দেওযা চলতে পারে। যে ভদ্রমহিলা। ওইটা ভাড়া নিয়েছিলেন তাঁকে তিন মাস আমি দেখতে পাইনি। তাঁর কাছে তিন মাসের ভাড়া আমার বাকি রয়েছে। সেটা আপনি নিতে পারেন।
তাঁর ফটোটা দেখিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম-ইনিই কি তিনি?
তিনি চিৎকার করে বললেন–ঠিক, ঠিক। তিনি কবে ফিরছেন স্যার?
বললাম–তিনি মারা গিয়েছেন।
ভদ্রমহিলা অবাক হয়ে বললেন–কী বলছেন? তিনি ছিলেন আমার সেরা ভাড়াটে। মাঝে-মাঝে এখানে এসে বসার জন্যে তিনি আমাকে সপ্তাহ তিল গিনি করে দিতেন।
জিজ্ঞাসা করলাম–আর কেউ কি এখানে তাঁর সঙ্গে দেখা করতে আসত?
তিনি আমাকে নিশ্চিত করে বললেন–কেউ আসত না–একটি প্রাণীও নয়।
আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম-তাহলে তিনি এখানে এসে করতেন কী?
তিনি বললেন–চুপচাপ বসে বই পড়তেন। মাঝে-মাঝে চা খেতেন।
কী যে বলব তা আমি বুঝতে পারলাম না। একটা ভারেল তাঁর হাতে দিয়ে আমি মি এলাম। এখন বল তো, এসবের অর্থ কী? ম নিশ্চয় বিশ্বাস কর না যে মহিলাটি আমাকে সত্যি কথা বলেছেন?
বিশ্বাস করি।
তাহলে লেডি অ্যালবয় সেখানে যেতেন কেন?
প্রিয় জিরালড, লেডি অ্যালবয়-এর রহস্যের ওপরে একটা ঝোঁক ছিল, ওই যাকে তোমরা বল বাতিক। মাথায় ঘোমটা দিয়ে তিনি ওখানে যেতেন–নিজেকে সেই রহস্যের একটি নায়িকা বলে মনে করতেন। গোপন রহস্যের প্রতি তাঁর একটা উদ্দাম কৌতূহল ছিল; কিন্তু নিজের রহস্য বলতে কিছু ছিল না।
তুমি কি সত্যিই তা মনে কর?
সত্যই মনে করি।
মরোক্কোর ব্যাগটা খুলে সেই ফটোটার দিকে সে চেয়ে রইল-তারপর শেষকালে বলল–অবাক কাণ্ড!
লর্ড আর্থার সেভাইল-এর অপরাধ
Lord Arthur Savile’s crime
ইস্টারের আগে লেডি উইনডারমিয়ারের এইটাই হচ্ছে শেষ ভোজের আয়োজন। বেনটি হাউস-এ এইসব আসরের সাধারণত যত অতিথি আসেন এবারে এসেছেন তার চেয়ে অনেক বেশি। সরকারি তকমা এঁটে আর জাঁকজমক পোশাক পরে এসেছেন ছ’জন কেবিনেট মন্ত্রী। সুব সুন্দরী মহিলাই তাঁদের সেরা পোশাক পরেছন। আর পিকচার গ্যালারির শেষ প্রান্তে প্রিনসেস সোফিযা দাঁড়িয়ে রয়েছেন। চার্লসরুহীর রাজকুমারী তিনি। দেখতে বেশ মোটা ভারী তাতার রমণীর মতো ছোটো ছোটো কালো চোখ; তিনি বেশ জোরে ডোরে বিকৃত উচ্চারণে ফরাসী ভাষায় কথা বলছিলেন। তাঁকে লক্ষ করে যাই বলা হোক না কেন তাই শুনে তিনি অশালীন ভাবে হাসছিলেন। কত বিভিন্ন প্রকৃতির মানুষেরই না সমাবেশ হয়েছিল এখানে। শৌখিন পোশাক পরে পিয়ারসরা অমায়িকভাবে উগ্রপন্থী ব্র্যাডিক্যালদের সঙ্গে গল্প। করছিলেন, জনপ্রিয় ধর্মপ্রচারকরা প্রথিতযশা নাস্তিকদের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী হয়ে বসেছিলেন, নিয়মনিষ্ঠ রুচিশীলা মহিলা পাদরির দল বেশ স্বাস্থ্যবতী নর্তকীদের সঙ্গে ঢলাঢলি করছিলেন। কলাবিদের বেশ ধরে কয়েকজন রয়্যাল অ্যাকাডেমিসিয়েনরা সিড়িঁর ওপরে দাঁড়িয়েছিলেন। শোনা যায় একসময় খাবার ঘর প্রথম শ্রেণির জিনিযাসে একেবারে গিজগিজ করত। সত্যি কথা বলতে লেড উইনডারমিয়ারের এটি হচ্ছে একটি উৎকৃষ্ট ভোজসভা। প্রিনসেস প্রায় রাত্রি সাড়ে এগারটা পর্যন্ত সেখানে ছিলেন।
