রকেট বলল–হারিয়েছে সেকথা বলছি নো বলছি, যদি হারায। হারালে, তার জন্যে দুঃখ করে লাভ নেই। যারা পড়ে যাওয়া দুধের জন্যে দুঃখ করে তাদের আমি ঘৃণা করি। কিন্তু তারা তাদের একমাত্র সন্তানকে হারাতে পারে এই ভেবে আমি দুঃখিত।
বেঙ্গল লাইট চিৎকার করে বলল–নিশ্চয়। আসল কথা হচ্ছে তোমার মতো চিরদুঃখী প্রাণী আমি আর কখনো দিখিনি।
রকেট বলল–তোমার মতো অভদ্র প্রাণীও আমি আর কখনো দেখিনি। আমার মধ্যে যে। বন্ধুত্বের আবেগ রয়েছে তা তুমি বুঝতে পারবে না।
রোমান ক্যানডাল দাঁত খিঁচিয়ে বলল–তুমি তো তাকে এখনো চেনই না হে।
রকেট বলল–চিনি যে সে কথা তো আমি বলিনি। চিনলে তো তার সঙ্গে আমার বন্ধুত্বই হত না। বন্ধুদের চেনা বড়ো বিপজ্জনক।
ফায়ার বেলুন বলল–তুমি বরং নিজেকে শুকনো রাখ হে। ওইটাই সবচেয়ে প্রয়োজনীয়।
রকেট বলল–ওটা নিঃসন্দেহে তোমার কাছে প্রয়োজনীয়। কিন্তু ইচ্ছে হলে আমি কাঁদব তো বটেই।
এই বলেই সে ভেউ-ভেউ করে কেঁদে ফেলল।
ক্যাথারিন হুইল বলল–লোকটা সত্যিকারের রোমান্টিক। যেখানে কাঁদার কিছু নেই সেখানেও কাঁদছে।
কিন্তু রোমান ক্যানডাল আর বেঙ্গল লাইট বিরক্তির সঙ্গে বেশ চেঁচিয়েই বলল–এ একটা হামবাগ!
এরা দুজনেই অত্যন্ত বাস্তবপন্থী। যা ওরা অপছন্দ করত তাকেই হামবাগ বলে চিহ্নিত করত।
ঠিক বারোটার সময় রাজা, রাজকুমার, রাজকুমারী, সভাসদবর্গ এবং অন্যান্য সবাই বেরিয়ে এলেন আতশবাজির খেলা দেখতে। রাজা বললেন–এবার শুরু করা
রাজার আতশবাজিকর মাথাটা নীচু করে অভিবাদন জানিয়ে বাগানের শেষ প্রান্তে চলে। গেল। তার সঙ্গে দু’জন সহকারী। তাদের প্রত্যেকেরই হাতে একটি করে জ্বলন্ত টর্চ লম্বা লাঠির ডগাঘ বাঁধা।
সত্যই বড়ো চমৎকার–বড়ো অদ্ভুত এইসব আতশবাজির খেলা।
হুইজ! উঠে গেল ক্যাথারিন হুইল। ওঠার সময় বন-বন করে ঘুরতে লাগল। বুম! বুম! করতে-করতে উড়ে গেল রোমান ক্যানডালা পুচকে পটকাটা চারপাশে ঘুরবার মতো নাচতে লাগল। বেঙ্গল লাইটগুলি চারপাশ লালচে করে দিল। ছোটো ছোটো নীল রং-এর আভা। ছড়িয়ে ফায়ার বেলুন আকাশে উড়ে যাওয়ার সময় বিদায় জানিয়ে গেল সবাইকে ব্যাও। ব্যাঙ! শব্দে ক্র্যাকাররা ফাটতে লাগল। মনে হল তাদের খুব মজা লাগছে। একমাত্র সেই অত্যাশ্চর্য রকেট ছাড়া আর সবাই বেশ সাফল্যের সঙ্গে সকলকে আনন্দ দিল। কেঁদে-কেঁদে রকেটটি এতই ভিড়ে গিয়েছিল যে তাকে কিছুতেই ওড়ানো গেল না। তার মধ্যে যেটা সবচেয়ে সেরা জিনিস ছিল সেটা হচ্ছে বারুদ। তার সব দরিদ্র বন্ধুবান্ধব যাদের সঙ্গে ঘৃণা ছাড়া আর কিছুর মাধ্যমেই সে কথা বলতে না তারা সবাই আকাশে সোনালি ফুলের রোশনাই জ্বেলে সুন্দর ভাবে সফল হল। সভাসদেরা ‘হুডা, হুজা’ বলে আনন্দে চিৎকার করে উঠল। খুদে রাজকুমারী আনন্দে হাসতে লাগলেন।
রকেট বলল–আমার ধারণা আরো কোনো জাঁকজমকপূর্ণ পরিবেশের জন্যে ওরা আমাকে মজুত রেখেছে। নিঃসন্দেহে এর কারণটা হল তাই। এই ভেবে আগের চেয়ে সে বেশি দম্ভ অনুভব করল।
পরের দিন ভাযগাটা পরিষ্কার করার জন্যে বাগানে মজুররা হাজির হল। রকেট মনে করল। এরাই হচ্ছে প্রতিনিধি দল। আমি এদের বেশ ভারিক্কি চালে অভ্যর্থনা জানাব। এই ভেবে সে বাতাসে নাকটা উঁচিয়ে দিল; তারপর কটমট করে তাকিয়ে রইল তাদের দিকে, মনে হল সে সিরিয়াস কিছু একটা ভাবছে। চলে যাওয়ার আগে পর্যন্ত তারা তার দিকে কোনো নজরই দিল না। তারপরে একজনের চোখ তার ওপরে পড়তেই সে বলে উঠল–এটা একেবারে বাজে। এই
বলে সেটা তুলে নিয়ে দেওয়াল টপকে পাশের খানায় ফেলে দিল সে।
বাতাসের মধ্যে দিযে ঘুরতে-ঘুরতে সে বলল–বাজে-রকেট বাজে-রকেট? অসম্ভব! লোকে আমাকে আশ্চর্য রকেট বলে সম্বোধন করেছে। ও দুটো শব্দের অর্থ প্রায় একই। এই বলে সে। কাদার মধ্যে পড়ে গেল।
কাদার মধ্যে পড়ে সে মন্তব্য করল–জায়গাটা বেশ ভালো লাগছে না তো। এটা বোধ হয় উচ্চ সমাজের ভলকেলি করার জাযগা। স্বাস্থ্য উদ্ধার করার জন্যে তারা হয়তো আমাকে এখানে পাঠিযেছে। আমার স্নায়ুগুলোও কেমন যেন দুর্বল হয়ে পড়েছে। আমারও বিশ্রামের দরকার।
তারপরে একটা বাচ্চা ব্যাঙ সাঁতরে উঠে এল। চকচক করছে তার চোখ দুটো।
ব্যাঙটা বলল–নতুন আমদানি বলে মনে হচ্ছে! যাই তোমরা বল, কাদার মতো জিনিস আর নেই। আমাকে বৃষ্টির জল আর খানা দাও। তাহলেই আমি খুশি।
রকেট বলল–’আহেম, আহেম’। তারপরেই সে কাশতে আরম্ভ করল।
চিৎকার করল ব্যাঙ-তোমার স্বরটা কী চমৎকার! ঠিক ব্যাঙের ডাকের মতো। সত্যি কথা বলতে কি ব্যাঙের ডাকের মতো মধুর সঙ্গীত পৃথিবীতে আর কিছু নেই। আমাদের ক্লাবে। আজ সন্ধেতে যে জলসা বসবে তা তুমি শুনতে পাবে। চাষীর বাড়ির পাশের যে পুরনো। ডাক-পুকুর রয়েছে সেখানে আমরা বসে থাকি আর চাঁদ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে গা জুড়ে দিই। আমাদের গান এতই মধুর যে সবাই ডেগে-জেগে সেই গান শোনে। সত্যি কথা বলতে কি গতকালই আমার কানে গেল চাষীর মেযেটা বলছে আমাদের জন্যে রাত্রে তার এ হয়নি। এইভাবে জনপ্রিয় হওয়াটা সত্যিই বড় সন্তোষজনক।
রকেট রেগে বলল–আহেম! আহেম!
তার বিরক্তির কারণ হচ্ছে কথা বলার একটুও সুযোগ সে পাচ্ছে না।
ব্যাঙ বলেই চলল-বড়ো মিষ্টি স্বর তোমার। আশা করি একদিন তুমি ডাক পুকুরে আসবে। আমার ছটা সুন্দরী মেয়ে রয়েছে। তাদের খুঁজতে যাচ্ছি। মিষ্টিজলের মাছটাকেই বড়ো ভয় করে। এও একটা দৈত্য বিশেষ। তাদের ধরে ধরে ব্রেকফাস্ট করতে ওর এতটুকু দ্বিধা হয় না। আচ্ছা, চললাম। আমি তোমাকে নিশ্চিত করে বলতে পারি আমাদের আলোচনাটা বেশ ভালোই লাগল।
