আকাশে যেদিন আমাকে ছুঁড়ে দেওযা হবে ঠিক সেইদিন রাজকুমারের বিযে। কী ভাগ্যবান তিনি!…কিন্তু রাজকুমাররা চিরকালই সৌভাগ্যবান!
পুঁচকে পটকাটা বলল–যা বাব্বা! আমি ভেবেছিলাম ব্যাপারটা ঠিক উল্টো। রাজকুমারের সম্মানে আমাদেরই ফাটানো হচ্ছে–এই ছিল আমার ধারণা।
রকেট বলল–ওটা তোমার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হতে পারে। হতে পারে বলছি কেন, হয়েছে; কিন্তু আমার বিষয়টা স্বতন্ত্র। আমি একটি অত্যাশ্চর্য রকেট; আমার পূর্বপুরুষরাও সত্যিকারের। অভিজাত। আমার মা ছিলেন সে-যুগের সবচেয়ে বিখ্যাত ক্যাথারিন হুইলা সুষম নৃত্যের জন্যে তিনি প্রসিদ্ধ ছিলেন। যেদিন তিনি প্রকাশ্যে বিরাট নাচের আসরে নামলেন সেদিন তিনি আকাশযাত্রা করার আগে উনিশ বার ঘুরে ঘুরে নেচেছিলেন, তিনি প্রতিবার বাতাসে সাতটি পাটলবর্ণের নক্ষত্র ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। তাঁর কটিদেশের পরিমাণ ছিল সাড়ে তিন ফিট, আর শরীরটা ছিল সেরা গান-পাউডারে তৈরি। আমার বাবাও আমারই মতো রকেট ছিলেন; কিন্তু তাঁর ধমনীতে ছিল ফরাসি রক্ত। তিনি এত উঁচুতে উঠে যেতেন যে লোকেদের
ভয় হত আর বুঝি তিনি নামবেন না। কিন্তু তিনি নামতেন; আর নামার সময় সোনালি রঙের বৃষ্টিতে ভরিয়ে দিতেন চারপাশ। খবরের কাগডোর সংবাদদাতারা তো মুহ্যমান হয়ে পড়তেন–তার সম্বন্ধে লম্বা লম্বা প্রশস্তি বার করতেন কাগডে। রাজার গেজেটেও বলা হত। পলিটেকনিক আর্টের বিজয় অভিযান ছিলেন তিনি।
বেঙ্গল লাইট বলল–কী বললে? ও; পাইরোটেকনিক বলছ বুঝি!
রকেট বেশ রুঢ় কণ্ঠে বলল–আমি বলেছি পলিটেকনিক।
এই শুনে বেঙ্গল লাইট এতই ঘাবড়ে গেল যে সে সঙ্গে সঙ্গে পুঁচকে পটকাটাতে দাঁত খিঁচোতে লাগল। নইলে, তার যে কিছু মূল্য রয়েছে তা বোঝানো যাবে কেমন করে?
রকেট শুরু করল–আমি বলছিলাম-কী বলছিলাম?
রোমান ক্যানডাল বলল–নিজের কথা বলছিলে।
নিশ্চয় নিশ্চয়। বেশ মনে পড়েছে আমি যখন একটি চিত্তাকর্ষক কাহিনি নিয়ে আলোচনা করছিলাম এমন সময় আমাকে অসভ্যের মত বাধা দেওয়া হয়েছিল। আমি এসব আদৌ পছন্দ করি নে; কারণ, বিশ্বের মধ্যে সপর্শকাতরতার দিক থেকে আমার জোড়া নেই।
রোমান ক্যানডালকে জিজ্ঞাসা করল ক্র্যাকার–স্পর্শকাতর কাকে বলে হে?
রোমান ক্যানডাল নীচু গলায় বলল–যে লোক নিজের পায়ে কড়া হয়েছে বলে ইচ্ছে করে অন্য লোকের পাযের কড়া মাড়িয়ে দেয়।
এই শুনে আর একটু হলে ক্র্যাকার হো-হো হেসে উঠত। খুব সামলে নিল সে।
রকেট জিজ্ঞাসা করল–তুমি হাসছ কেন? আমি তো হাসছি নে।
ক্র্যাকার বলল–আমি সুখী বলেই হাসছি।
বেশ রাগ করেই রকেট বলল–আচ্ছা স্বার্থপর তো। সুখী হওয়ার কী অধিকার তোমার রয়েছে শুনি? অপরের কথা তোমার চিন্তা করা উচিত, অর্থাৎ, আামার কথাই তোমার চিন্তা করা উচিত। আমি সব সময়েই আমার কথা ভাবি: আমি আশা করি সবাই সেই কাজই করবে। এটা বড়ো সুন্দর গুণ। আমার মধ্যে এই গুণ অনেক পরিমাণে রয়েছে। ধর, আজ রাত্রেই আমার যদি কিছু একটা হয়ে যায় তাহলে সেটাকে কি তোমরা নিজেদের দুর্ভাগ্য বলে মনে করবে না! রাজকুমার আর রাজকুমারী কেউ সুখী হবেন না। তাঁদের বিবাহিত জীবনটা নষ্ট হয়ে যাবে। মহারাডংও এই শোক ভুলতে পারবেন না। সত্যি কথা বলতে কি নিজের এই উঁচু মানের কথা আমি যখন ভাবি তখন আমারই চোখে জল আসে।
রোমান ক্যানডাল বলল–তুমি যদি অন্যদের আনন্দ দিতে চাও তাহলে নিজের পাউডার যাতে শুকনো থাকে সে বিষয়ে অবহিত হও।
এতক্ষণে বেঙ্গল লাইটের আগেকার অবস্থা ফিরে এসেছে। সে সমর্থনের স্বরে বলল–একশবার। এইটাই হচ্ছে কমনসেন।
ঘৃণার সঙ্গে রকেট বলল–তাই বটে! তুমি ভুলে যাচ্ছ যে আমি একডনি অসাধারণ আর অত্যাশ্চর্য প্রাণী। যার চিন্তা করার মতো ক্ষমতা নেই সে ছাড়া আর কারো কমনসেনস থাকবে কেন? কিন্তু আমার চিন্তা করার, কল্পনা করার শক্তি রয়েছেকারণ যা রয়েছে তার কথা আমি কোনোদিনই চিন্তা করি নো…আর শুকনো থাকার কথা যদি বল তাহলে একথা আমি বলতে পারি যে এখানে এমন কেউ নেই অনুভূতিপ্রবণতা কাকে বলে তা সে জানে। সৌভাগ্যবশত, আমি তা গ্ৰহ্য করি নে। আমাকে কেবল একটা জ্ঞানই সারা জীবন বাঁচিযে রেখেছে, সেটা হচ্ছে এই যে আমি ছাড়া অন্য সবাই যে নীচুস্তরের সেটা আমি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করি তোমাদের কি হৃদয় বলে কোনো বস্তু রয়েছে! তোমরা সবাই হাসছ, আনন্দ করছ–যেন মনে হচ্ছে রাজকুমার আর রাজকুমারীর এই মাত্র বিয়ে হয়নি।
ছোটো একটা ফায়ার-বেলুন বলল–কেন নয়? আয়োজনটা তো আনন্দ করারই মতো। আমি যখন আকাশে উঠব তখন নক্ষত্রদেরও আমি এই আনন্দের কথাই তো বলব।
রকেট বলল–জীবনের সম্বন্ধে তোমার ধারণা কী তুচ্ছ! কিন্তু এছাড়া তোমার কাছে আর কীই বা আশা করব? তুমি শূন্যগর্ভ ভেতরে তোমার কিছু নেই। হয়তো একদিন রাজকুমার সস্ত্রীক কোনো গ্রামাঞ্চলে বেড়াতে যাবে। সেখানে হয়তো একটা নদী রয়েছে। নাম হয়তো তাদের একটি মাত্র পুত্রকে নিয়ে ঘুরতে বেরোবে; তারপর তাকে ছেড়ে দিয়ে গাছের তলায় ঘুমোবে; আর সেই সুযোগে ছেলেটা নদীতে ডুবে মারা যাবে! হতভাগ্যেরা তাদের একমাত্র সন্তানকে হারাবে। অহো! কী দুর্দৈব! কী ভয়ঙ্কর! আমি কোনো দিনই তা ভুলতে পারব না।
রোমন ক্যানডাল বলল–কিন্তু তারা তো তাদের কোনো সন্তানকে হারায়নি।
