রকেট বলল–আলোচনাই বটে! সারাক্ষণ তো তুমিই কথা বলে গেলো একে কি কথাবার্তা বলে?
ব্যাঙ বলল–একজনকে তো শুনতেই হবে। আমি নিজেই নিজের কথা বলতে ভালোবাসি। এতে সময় বাঁচে-তর্কের কচকচানিও শুনতে হয় না।
রকেট বলল–কিন্তু তুমি তর্ক ভালোবাসি।
ব্যাঙ সন্তুষ্ট মনে বলল–তর্কাতর্কি জিনিসটাই হচ্ছে অশালীন। কারণ ভদ্র সমাজে সকলেরই মতামত একই ধরনের। আবার বলছি বিদায। দুরে মেযেদের দেখতে পাচ্ছি।
এই বলে ব্যাঙ সাঁতার দিয়ে চলে গেল।
রকেট নিজের ভাবেই মাতোয়ারা হয়ে বলতে লাগল–তুমি একটি বিরক্তিকর অসভ্য জীব। যারা তোমার মতো নিজের কথাই বলে যখন অপরে আমার মতো নিজের কথা বলতে চায় তাদের আমি ঘৃণা করি। এইটাকেই আমি স্বার্থপরতা বলি। এটা আমার মতো লোকের কাছে খুব ঘৃণ্য কারণ আমার মনটাই হচ্ছে সংবেদনশীল। আমার কাছ থেকেই তোমার। শিক্ষালাভ করা উচিত…অবশ্য এসবের তুমি কিছুই জান না, কারণ তুমি একটি গেঁয়ো ভূত।
তামাটে রঙের লম্বা ঘাসের ওপরে একটা ফডিং বসেছিল। সে বলল–তার সঙ্গে কথা বলে আর লাভ কী? সে তো চলে গিয়েছে।
রকেট বলল–তাতে ক্ষতি তারই হয়েছে। সে আমার কথা শুনল না বলেই আমি তার সঙ্গে কথা বলা বন্ধ করতে পারি নে। নিজের সঙ্গে কথা বলতে আমি সব সময়েই ভালোবাসি। মাঝে-মাঝে অনেকহণ ধরে নিজের সঙ্গেই আমি নিজে কথা বলি; আর আমি এতই বুদ্ধিমান যে মাঝে-মাঝে আমি নিজে যা বলি তার একটি বর্ণও বুঝতে পারি নে।
তাহলে নিশ্চয় তোমার দর্শনশাস্ত্রের ওপর বক্তৃতা দেওয়া উচিত–এই বলে দুটি ডানা মেলে ফড়িংটা উড়ে গেল।
রকেট বলল–কী বোকা! চলে গেল। আমি নিশ্চিত যে নিজেকে উন্নত করার এরকম সুযোগ সে খুব একটা বেশি পাবে না। মরুক গে; আমার প্রতিভা একদিন না একদিন স্বীকৃত হবেই।–এই বলে কাদার মধ্যে আর একটু ডুবে গেল সে।
অনেকক্ষণ পরে সাঁতরাতে-সাঁতরাতে একটা সাদা পাতিহাঁস সেখানে এসে হাজির হল। তার পা দুটি হলদে, তার চলার বা ভাসার গতিটা বড়োই সুন্দর।
কোয়াক, কোয়াক, কোয়াক! কী অদ্ভুত চেহারা গো তোমার? জন্ম থেকেই কি তোমার এইরকম চেহারা? না, কোনো দুর্ঘটনায় পড়ে এইরকম হয়েছে?
রকেট বলল–তোমার কথা শুনে বেশ বোঝা যাচ্ছে যে চিরকালই তুমি পাড়াগাঁয়ে বাস কর, তা না হলে, আমি কে তা তুমি বুঝতে পারতো যাই হোক, তোমার এই অজ্ঞতাকে আমি ক্ষমা করলাম। শুনলে তুমি খুশিই হবে যে আকাশে আমি উড়ে যেতে পারি; আর নেমে আসার সময় চারপাশে ছড়িয়ে দিই সোনালি বৃষ্টির ধারা।
পাতিহাঁস বলল–ওসব কথার খুব একটা দাম আমার কাছে নেই কারণ ওর কোনো প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে আমি মনে করি লো তুমি যদি ষাঁড়ের মতো লাঙল চষতে পারতে, অথবা ঘোড়ার মতো গাড়ি টানতে পারতে, অথবা কুকুরের মতো ভেড়ার দল পাহারা দিতে পারতে–তাহলেও তবু একটা কথা ছিল।
বেশ রাগত কণ্ঠেই রকেট বলল–বৎস, দেখতে পাচ্ছি তুমি নীচ জাতীযা। আমার মতো প্রাণীর কতকগুলি উঁচু ধরনের গুণ রয়েছে। সেগুলিই যথেষ্ট। উৎপাদক ডাতীয় কোনো জিনিসের ওপর আমার কোনো সহানুভূতি নেই; বিশেষ করে যে সব জিনিসের কথা তুমি। এইমাত্র বললে। আমার ধারণা, কঠোর পরিশ্রমের আড়ালে তারাই আশ্রয় নেয় যাদের আর কিছু করার নেই।
পাতিহাঁসের কারও সঙ্গেই কোনো বিরোধ নেই। সে বড়ো শান্তিপ্রিয় জীব। সে বলল–ঠিক আছে, বিভিন্ন মানুষের রুচি বিভিন্ন। যাই হোক, আশা করি এখানেই তুমি থেকে যাচ্ছ?
রকেট বলল–না, না। আমি এখানে একটি সম্মানিত অতিথিমাত্রা সত্যি কথা বলতে কি জায়গাটা আমার মোটেই ভালো লাগছে না। এখানে সমাড বা নিউলতা কোনোটাই নেই। সম্ভবত আমি রাজসভাতেই ফিরে যাব। কারণ আমি জানি বিরাট একটা আলোড়ন সৃষ্টি করতেই আমার জন্ম হয়েছে
পাতিহাঁস বলল আমি নিজে একবার পাবলিক লাইফ-এ ঢোকার চেষ্টা করেছিলাম। দেখলাম সেখানে অনেক কিছু সংস্কার করার প্রযোজনীয়তা রয়েছে। একবার একটা সভায়। সভাপতি হয়েছিলাম। আমরা যা পছন্দ করিনে সে সব বিষয়কে নিন্দা করে সেখানে আমরা অনেকগুলি প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলাম। তাতে কিছু লাভ হয়নি। এখন আমি গৃহকর্মে চললাম।
রকেট বলল–আমার জীবন কিন্তু জনসেবায় উৎসর্গীকৃত। আমার আত্মীয়-স্বজনরাও তাই–এমন কি তাদের মধ্যে সবচেয়ে যে দরিদ্র সে-ও। আমরা প্রকাশ্যে এসে দাঁড়ালেই সকলের দৃষ্টি আমাদের ওপরে গিয়ে পড়ে। আমি অবশ্য এখনো প্রকাশ্যে আবির্ভূত হয়নি। হলে একখানা দারুণ আলোড়ন পড়ে যাবো আর ঘর-সংসারের কাজ? ওর মধ্যে মাথা গলালেই বুড়িয়ে যায় মানুষ। উঁচু আদর্শ থেকে বিচ্যুত হতে হয়।
পাতিহাঁস বলল–উঁচ আদর্শই বটে। আর এই আদর্শের জন্য কত অনাহাবেই না থাকতে হয়েছে–এই বলে ‘কোযাক-কোয়াক’করে ডাকতে-ডাকতে সে মাঝ দরিযার দিকে সাঁতার কেটে বেরিয়ে গেল। রকেট প্রায় কেঁদে ফেলে আর কি। চেঁচাতে লাগল সে-ফিরে এস, ফিরে এস তোমাকে আজ একটা বড়ো আদর্শের কথা শোনাব।
আর বড়ো আদর্শ! সে তখন অনেক দূরে।
রকেট তখন নিজের মনে-মনেই বলল–যাকগে। ভালোই হয়েছে। ওর মনটা যে মধ্যবিত্ত সেদিক থেকে আমি নিশ্চিত।
এই বলে সে কাদার আর একটু নীচে ডুবে গোল; ভাবতে লাগল এ-দুনিয়ায় প্রতিভার নিঃসঙ্গতার কথা। ঠিক এমনি সময় কয়েকটা সাদা ঢিলে জামা পরে, একটা কেতলি আর কিছু জ্বালানি কাঠ নিযে কয়েকটা বাচ্চা ছেলে সেই দিকে ছুটে এল।
