একটি যুবক ভৃত্য তার প্রতিবেশীকে বলল–রাজকন্যা আগে শ্বেত গোলাপের মতো দেখতে ছিলেন; এখন তিনি দেখতে হয়েছেন রক্ত গোলাপের মতো। এই কথা শুনে উল্লসিত হয়ে উঠল সবাই।
পরের দিন লোকের মুখে কেবল ওই দুটি কথা–’শ্বেত গোলাপ, রক্ত গোলাপ, রক্ত গোলাপ, শ্বেত গোলাপ’ রাজা খুশি হয়ে ভৃত্যের মাইনে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিলেন। ভৃত্যটি কোনো মাইনে পেত না বলেই এই বেতন-বুদ্ধিতে তার কোনো ক্ষতি-বৃদ্ধি হল না; কিন্তু সবাই এটাকে পরম সম্মানের বস্তু বলে মন করল; রাজপুরীর গেজেটেও সেই সংবাদ প্রকাশিত হল।
তিন দিন পরে বিবাহ অনুষ্ঠিত হল। এটা অদ্ভুত একটি আনন্দোৎসব। ছোটো ছোটো মুক্তা। দিয়ে খচিত বেগুনে রঙের ভেলভেটের চাঁদোয়ার নীচে দিয়ে সদ্য বিবাহিত দম্পতি পরস্পর হাত ধরাধরি করে বেড়ালেন। তারপরে পাঁচদিন ধরে চলল স্টেট ব্যাংকোযেটা রাজকুমার আর রাজকুমারী গ্রেট হল-এর শিখরে বসে স্ফটিকের মতো স্বচ্ছ পেয়ালার একসঙ্গে মদ্যপান করলেন। কেবলমাত্র আসল প্রেমিক-প্রেমিকারাই এইরকমভাবে একই পাত্র থেকে মদ্য পান করার সৌভাগ্য রাখে। যারা তা নয় তাদের ঠোঁটের সপশে পাত্রটা বিবর্ণ হয়ে যায়।
সেই ছোট্ট চেহারার ভৃত্যটি বলল–এঁরা যে পরস্পরকে ভালোবাসেন সেই ভালোবাসা ওই স্ফটিকের মতোই স্বচ্ছ।
সেই শুনে মহারাজ আবার তার মাইনে দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিলেন।
সভাসদেরা আনন্দে উচ্ছ্বসিত হয়ে বলল–কী সম্মান! কী সম্মান!
ব্যাংকোয়েটের পরে শুরু হল ‘বল। দম্পতিদের সেখানে গোলাপ নৃত্য দেখানোর কথা। মহারাজ কথা দিলেন সেই নাচে তিনি বাঁশি বাজাবেন। বাজালেন তিনি খুবই জঘন্য; কিন্তু তিনি রাজা। সেকথা তাঁর মুখের ওপরে কে বলবে! সবাই তাই চিৎকার করে বলল–আহা-হা! চমৎকার!
এই কর্মসূচীর সমাপ্তি হচ্ছে বাজি দিযে। বিরাট আয়োজন হয়েছে তার। কাঁটায় কাঁটায় রাত্রি বারোটার সময় শুরু হবে এই বাড়ি ছোঁড়া। রাজকুমারী কোনো দিন আতশবাজির খেলা দেখেননি। তাই মহারাজ হুকুম দিলেন বিয়ের দিন আতশবাজিকর সব সময় উপস্থিত থাকবে।
রাজকুমারকে জিজ্ঞাসা করলেন রাজকুমারী–আতশবাজি কী?
যাকেই প্রশ্ন করা হোক, মহারাজ তার উত্তর দেবেনই। তিনি বললেন–ঠিক সুমেরুজ্যোতির মতো। তবে এটা হল একটু বেশি স্বাভাবিক। নক্ষত্রগুলি যখন ফুটে ওঠে তখন তাদের তুমি। দেখেছ। ব্যক্তিগতভাবে এইসব নক্ষত্রদের চেয়ে আমি আতশবাজিদের বেশি পছন্দ করি; কারণ তা আমার বাঁশি বাড়ানোর মতোই মধুর, তুমি নিশ্চয়ই তা দেখতে পাবে।
এইজন্যে রাজার উদ্যানের শেষ প্রান্তে বেশ বড়ো একটা মাচা বাঁধা হল। আর রাজা। আতশবাজির সব আয়োজন প্রস্তুত করে ফেললেন। সেই সময় বাড়িরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা শুরু করল।
বাচ্চা পটকাটা বলল–এই পৃথিবীটা সত্যিই বড়ো সুন্দর। ওই হলদে টিউলিপ ফুলগুলিকে দেখা বাহ! ওরা যদি সত্যিকারের ক্র্যাকার হত তাহলে কখনই এত সুন্দর হতে পারত না। আমি যে অনেক জায়গা ঘুরে বেডিযোদু, সেজন্যে আমি খুশি। বিদেশ মণই মনকে অদ্ভুত ভাবে উন্নত করে, আর নষ্ট করে দেয় যাবতীয় কুসংস্কার।
বড়ো রোমান ক্যানডাল বলল–ওরে মূর্খ পটকা, রাজার বাগানটা বিশ্ব নয়। বিরাট বিশ্ব হচ্ছে–এটাকে ঘুরে-ঘুরে দেখতে তোমার তিন দিন লাগবে।
বিষণ্ণ ক্যাথারিন হুইল বলল–যে-কোনো জায়গাই তোমার কাছে বিশ্ব।
এই হুইল প্রথম জীবনে একটা বাক্সের সঙ্গে জড়িত ছিল এবং হৃদযটা তার ভেঙে যাওয়ার জন্যে সে বেশ গর্বিত। সে বলল–কিন্তু আজকাল প্রেম এমন একটা প্রচলিত রীতিসম্মত নয়। কবিরাই একে জবাই করে ফেলেছে। তারা এই প্রেম নিয়ে এত কথা লিখেছে যে কেউ আর তা বিশ্বাস করতে চায় না। এবং আমি তাতে আশ্চর্যও হই না। সত্যিকার প্রেম দুঃখ পায় সে। কোনো প্রতিবাদ করতে চায় না। আমার একবার বেশ মনে রয়েছে…কিন্তু যাকগে। রোমান্স এখন আমার কাছে অতীতের বস্তু।
রোমান ক্যানডাল বলল–মূর্খ কোথাকার! রোমান্স কোনো দিন মরে না। চাঁদের মতো; চিরকাল ও বেঁচে থাকে।
কিন্তু ক্যাথারিন হুইল লিভের মতে অটুট; সে মাথা নেড়ে বলল–রোমান্স মৃত, মৃত, মৃত
যারা জানে একটা কথা বারবার বললে তা শেষ পর্যন্ত সত্যি হয়ে দাঁড়ায় এ হচ্ছে সেই জাতীয় বস্তু।
হঠাৎ একটা শুকনো তীক্ষ্ণ কাশির আওয়াজ হতেই সবাই সেই দিকে ঘুরে দাঁড়াল। কাশিটা। আসছিল একটা লম্বা উদ্ধ৩ রকেটের কাছ থেকে। রকেটটা একটা লম্বা ছুড়ির শেষ কোণে বাঁধা ছিল। দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে কোনো কিছু বলার আগে সব সময়েই সে কাশে।
সে বলল–আহেম, আহেম–শোন।
শোনার জন্যে সবাই তার দিকে ঘুরে তাকাল–একমাত্র হতভাগ্য ক্যাথারিন হুইল ছাড়া। সে বেচারা তখনো নিজের ঝোঁকে মাথা নেড়ে নেড়ে বলছে-রোমান্স মরে গিয়েচ্ছে, মরে গিয়েছে।
চেঁচিয় উঠল ক্র্যাকার—’অর্ডার! অর্ডার!’ তার মেজাজ অনেকটা রাজনীতিবিদদের মতো। স্থানীয় নির্বাচনে সে সব সময় বিশেষ অংশগ্রহণ করেছে। এই সব হেষ্কত্রে কি ধরনের পার্লামেন্টারি রীতি অনুসরণ করা যেতে পার তা সে জানে।
ক্যাথারিন হুইল ফিসফিস করে বলল—’মরে কাঠ হয়ে গিয়েছে।’ এই বলেই সে ঘুমানোর আয়োজন করল।
সবাই চুপচাপ হয়ে গেল। রকেট তৃতীয়বার কেশে শুরু করল তার বক্তৃতা। তার বক্তৃতা অন্যদের ওপরে কী রকম প্রভাব বিস্তার করছে তা জানার জন্যে কথার ফাঁকে ফাঁকে সে অন্য সকলের ঘাড়ের ওপর দিযে উচিযে দেখতে লাগল। আসল কথাটা হচ্ছে তার ধরনটি। সত্যিকারের অভিভাত।
