কিন্তু গোলাপ গাছটির চিৎকার করে বলল–আরো জোরে, আরো জোরে? খুদে নাইটিংগেল! নতুবা, গোলাপ ফোঁটার আগেই সকাল হয়ে যাবে।
.
সুতরাং নাইটিংগেল আরো জোরে কাঁটার মুখে নিজের বুকটা চেপে ধরল, আর সেই সঙ্গে তার গান ডোরে থেকে জোরাল হয়ে উঠল।
প্রেমিকের চুম্বনে প্রেমিকার গণ্ডে যেমন লজ্জাবিধুর লাল আভা ছড়িয়ে পড়ে, গোলাপ ফুলের পাতার ওপরেও তেমনি মিষ্টি একটি লাল আভা ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু কাঁটাগুলি তখনও তার হৃদযের মধ্যে প্রবেশ করেনি। সেই জন্যে গোলাপের হৃদ্যটি তখনো সদাই রয়ে গেলঃ কারণ পাখিটির হৃদয়ের রক্ত না পেলে। গোলাপের হৃদয় রক্তবর্ণ ধারণ করবে না। একটা ভীষণ যন্ত্রণা তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল। সেই যন্ত্রণা যতই বাড়তে লাগল ততই তার গান তীব্র থেকে তীব্রতর হতে লাগল; কারণ তার গান ছিল প্রেমের, যে প্রেম মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে সার্থক। কবরখানার মধ্যে তো প্রেমের বিনাশ হয় না।
এবং প্রভাতের মতো সেই অপরূপ গোলাপটি রঙিন হয়ে উঠল।
কিন্তু নাইটিংগেলের কণ্ঠস্বর স্ক্রীণ থেকে হক্কীণতর হয়ে এল; ঝপট করতে লাগল তার খুদে পাখা দুটি চোখের ওপরে নেমে এল অন্ধকারের ছায়া। তার গান অস্পষ্ট হতে লাগল; মনে হল তার গলাটা যেন আটকে আসছে।
তারপরে সে আর একবার জোরে গান গেয়ে উঠল। সাদা চাঁদ সেই গান শুনলো:প্রভাতের কথা ভুলে গিয়ে আকাশের গায়ে অপেক্ষা করতে লাগল। লাল গোলাপ সেই গান শুনল; আনন্দের আতিশয্যে হিল্লোল লাগল তার গায়ে শীতার্ত প্রভাতের বাতাসে সে তার পাপডিগুলিকে দিল মেলে।
গোলাপ গাছ চিৎকার করে উঠল-দেখ, দেখ! গোলাপ ফোঁটা শেষ হল। কিন্তু নাইটিংগেল কোনো উত্তর দিল না। কারণ, লম্বা ঘাসের বনে, হৃদয়ে কাঁটা বিদ্ধ হয়ে সে মৃত অবস্থায় রইল পড়ে।
এবং দুপুরের দিকে ছাত্রটি তার জানালা খুলে বাইরে দিকে তাকাল। তারপরেই সে চিৎকার করে উঠল–কী ভাগ্য! এইতো এখানে একটা লাল গোলাপ! জীবনে এত সুন্দর লাল গোলাপ।
আর কখনো আমি দেখিনি। এটা এত সুন্দর যে মনে হচ্ছে এর একটি কোনো ল্যাটিন নাম রয়েচ্ছে। এই বলে ঝুঁকে পড়ে সে লাল গোলাপটি তুলে নিল। তারপরে মাথায় টুপিটা চড়িযে সেই গোলাপটি হাতে নিয়ে সে দৌড়ে গেল প্রফেসরের বাড়িতে।
প্রফেসরের কন্যা দরজার সামনে বসে নীল রঙের সিল্কের সুতো গুটাচ্ছিল তখন। তার বাচ্চা কুকুরটা শুয়েছিল তার পায়ের কাছে। ছাত্রটি চেঁচিয়েই বলল–তুমি বলেছিলে একটি লাল গোলাপ এনে দিলে তুমি আমার সঙ্গে নাচবে। এই সেই গোলাপ-তামাম দুনিয়ায় এর চেয়ে সুন্দর গোলাপ আর কোথাও তুমি পাবে না। এটি তুমি আজ আমার বুকের কাছে পরবে। আমরা যখন নাচবো তখন এটিই তোমাকে বলে দেবে আমি তোমাকে কত ভালবাসি।
ভ্রুকুটি করল মেয়েটি বলল–ভয় হচ্ছে আমার পোশাকের সঙ্গে এটি মানাবে না। আর তা ছাড়া চেম্বারলেন-এর ভাইপো আমাকে কয়েকটি আসল জহরৎ পাঠিয়েছেন। সবাই জানে জহরতের দাম ফুলের চেয়ে অনেক বেশি।
ছাত্রটি রাগ করে বলল–সত্যি বলতে কি বড়োই অকৃতজ্ঞ তুমি।
এই বলে ফুলটিকে সে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দিল। সেইখানে গাড়ির চাকার নীচে পড়ে সে মিশে গেল মাটির সঙ্গে।
মেয়েটি বলল–অকৃতজ্ঞ! তুমি বড়ো অভদ্র তো! তাছাড়া তুমি এমন কি একটা বস্তু? মাত্র একজন ছাত্র। চেম্বারলেন-এর ভাইপোর মুক্তোর যে জুতোর লেস রয়েছে আমার বিশ্বাস তোমার সেটুকু সম্পদও নেই।
এই কথা বলে সে চেয়ার ছেড়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল।
ফিরে যেতে যেতে ছাত্রটি বলতে লাগল–ভালোবাসাটা কী বাজে জিনিস! লজিকের যা দাম রয়েছে, এর দাম তার অর্ধেকও নয়, কারণ, এ কিছুই প্রমাণ করে না। এ এমন সব কথা বলে যা কোনো দিন ঘটে না; মানুষকে এ এমন সব জিনিস বিশ্বাস করায় যা কোনো দিনই সত্যি হয়ে ওঠে না। আসল কথাটা হল প্রেম জিনিসটাই অবাস্তব; আর এ জগতে যা বাস্তব নয় তা কোনো কাজের নয়। তার চেয়ে আবার আমি দর্শন আর অধিবিদ্যা শাস্ত্রই পড়তে শুরু করি।
এই বলে নিজের ঘরে গিয়ে ধুলোমলিন বিরাট একটা বই বার করে পড়তে শুরু করল।
পরমাশ্চর্য রকেট
The Remarkable Rocket
রাজপুত্রের বিয়ে হবে। চারপাশে আনন্দের বান ডেকেছে। রাজপুত্র তাঁর কনের জন্য সারাটা বছর অপেক্ষা করেছেন। অবশেষে রাজকন্যা উপস্থিত হয়েছেন। ইনি হচ্ছেন রাশিয়ান। রাজকন্যা। ছটি বল্লা-হরিণের টানা স্লেজ গাড়িতে চেপে ফিনল্যান্ড থেকে সারা পথটা তিনি এসেছেন। গাড়িটাকে বিরাট একটা সোনালি হাঁসের মতো করে সাজানো হয়েছিল; রাজকুমারী বসেছিলেন সেই হাঁসের দুটি ডানার মধ্যে। আরমিনের লোম দিয়ে তৈরি ঢিলে জামাটা তাঁর পা পর্যন্ত ছিল ঝোলানো। তাঁর মাথার উপরে ছিল রুপোর সুতো দিয়ে তৈরি করা ছোটো একটা টুপি বরফের প্রাসাদেই চিরকাল তিনি বাস করতেন বলেই রঙটাও তাঁর ওই বরফের মতোই যেতাভ হয়ে উঠেছিল। তাকে এতই বিবর্ণ দেখাচ্ছিল যে রাস্তা দিয়ে। আসার সময় মানুষরা সব অবাক হয়ে তাকিয়ে বলছিল-আরে, ইনি যে একটি শ্বেত গোলাপ দেখছি।’ এই বলে জানালা থেকে তাঁর ওপরে ফুল ছুঁড়ে দিয়েছিল।
দুর্গের প্রধান ফটকের কাছে তাঁকে স্বাগত জানানোর জন্য রাজকুমার অপেক্ষা করছিলেন। তিনি রাজকন্যার হাতে চুম্বন করে বললেন–তোমার ছবিটি বড়ো সুন্দর; কিন্তু তার চেয়েও সুন্দর তুমি।
